রাবিতে ফলগাছে স্থানীয়দের দখল, শিক্ষার্থীরা খেতে গেলে হুমকি!

প্রকাশিত: মে ২৪, ২০২১; সময়: ৭:৩৫ pm |

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক, রাবি : রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি) ক্যাম্পাসে অসংখ্য প্রজাতির গাছে সারা বছরই কোনো না কোনো ফল ধরে। করোনায় বন্ধ ক্যাম্পাসে চলতি মৌসুমে প্রশাসন কোনো গাছের লিজ না দিলেও স্থানীয়রা এসে দলীয় পরিচয় দিয়ে গাছ দখল করে রেখেছে। কখনও উপাচার্য (রুটিন দায়িত্বে) আনন্দ কুমার সাহা আবার কখনও স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের নাম ভাঙ্গিয়ে তারা গাছ দখল করেছেন। শিক্ষার্থীরা ফল পাড়তে গেলে দিচ্ছেন হুমকি-ধামকি।

সোমবার দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ হবিবুর রহমান হলের সামনে একটি গাছ থেকে আম পাড়ার সময় দুই স্থানীয় যুবক এসে শিক্ষার্থীদের হুমকি দেয়।

প্রত্যক্ষদর্শী ও শিক্ষার্থীরা জানান, সোমবার সকালে বিশ^বিদ্যালয়ের হবিবুর হলের সামনে একটি গাছে আম পড়তে যান চার শিক্ষার্থী। এসময় আনারুল নামের এক বহিরাগত এসে ধমক দিয়ে আম পাড়া বন্ধ করতে বলেন।

শিক্ষার্থীরা জানতে চাইলে বলেন, প্রোভিসি আনন্দ কুমার সাহা লিজ দিয়েছেন। লিজ দেয়া হয়নি জানিয়ে শিক্ষার্থীরা প্রতিবাদ করলে আনারুল জানায় মেহেরচন্ডির আওয়ামীলীগ নেতা কালু ও বাবু এই গাছগুলো দলীয়ভাবে ভাগ করে দেয়। কিছুক্ষণ পর আরিফ নামের আরেক বহিরাগত এসে বন্ধ ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীরা কেন এসেছে তা জানতে চাইলে শিক্ষার্থীরা প্রতিবাদ করে। এক পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের হুমকি দেয় আরিফ নামের স্থানীয় ওই যুবক।

আরিফ জানায়, এই গাছের আম পাড়তে এলে ছাত্রলীগ সভাপতি গোলাম কিবরিয়া ও সম্পাদক ফয়সাল আহমেদ রুনুকে তারা তাড়িয়ে দিয়েছেন। হবিবুর হলের সামনের ওই গাছে আম পাড়া নিয়ে তারা বিশ^বিদ্যালয়ের ছাত্রলীগের সঙ্গে ঝামেলা করে। তিনি দাবি করেন, আম পাড়া নিয়ে প্রশাসনকে জানানো হলে উল্টো শিক্ষার্থীদেরই সমস্যা করবে প্রশাসন। আরিফ নামের ওই যুবক শিক্ষার্থীদের হুমকি দিয়ে বলে, আম পড়তে গেলে ভেবেচিন্তে যেতে, নাহলে সমস্যা হবে।

শিক্ষার্থীদের এই সংক্রান্ত একটি কথপোকথনের রেকর্ড প্রতিবেদকের হাতে রয়েছে। রেকর্ডটিতে শোনা যায়, আনারুল নামের এক স্থানীয় এসে প্রথমে শিক্ষার্থীদের আম পাড়তে নিষেধ করেন। তিনি দাবি করেন, আনন্দ কুমার সাহা এই গাছ তাদের লিজ দিয়েছেন। ক্যাম্পাসের কোনো গাছ লিজ হয়নি তা শিক্ষার্থীরা জানালে তিনি বলেন, এগুলো দলীয় ভাবে হয়েছে। মেহেরচন্ডির নেতা কালু দিয়েছেন। গাছ লিজ নিয়েছে বঙ্গমাতার সভাপতি বাবু। তিনি বলেন, এই এলাকায় আম পাড়া নিয়ে বিশ^বিদ্যালয় ছাত্রলীগের সঙ্গে তাদের ঝামেলা হয়েছে।

কিছুক্ষণ পর আরিফ নামের স্থানীয় এক যুবক শিক্ষার্থীদের চড়াও হয়ে বলেন, ‘আম যে পাড়ছেন, কার অনুমতি নিয়ে পাইড়ছেন? ক্যাম্পাস খোলা নাকি যে আম পাইড়ছেন? এটা নিয়ে যে ছাত্রলীগের সাথে ঝামেলা হইছে জানেন না? আনন্দ কুমার সাহা’র সঙ্গে এর আগে ক্যাম্পাস ছাত্রলীগকে এখান থেকে তাড়া হইয়েছে? হুঠ করে ক্যাম্পাসে এসে আম গাছে ওঠা তো ঠিক না। লিজ হয়নি তো কি হইছে? ক্যাম্পাস তো খোলা নাই আপনাদের?’

এসময় হবিবুর হলের এক আবাসিক শিক্ষার্থী তাকে জানান, এই গাছের আম হবিবুর ও জিয়া হলের ছাত্ররা পেড়ে খায়? এতে তিনি উত্তেজিত হয়ে বলেন, ‘আপনি যে হলেই থাকেন, আপনাদের ছাত্রলীগের কিবরিয়া-মিবরিয়া সবাইকে উল্টা দেয়া হইছে মিয়া, আর আপনি হলের কথা বুইললে হবে? বাংলা কথা বুঝেন না!’

শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্য করে আরিফ বলেন, ‘এই সাইডের (হবিবুর-জিয়া হল এলাকার) আম খাইতে হলে প্রশাসনকে বুইলে খাইতে হবে। নাহলে সমস্যা হবে। এখন এগুলো খাচ্ছেন খান, এখন যদি সিনের বাইরে আসি তাহলে কিন্তু আপনাদের সমস্যা হবে। আপনারা ক্যাম্পাসের স্টুডেন্ট, আপনাদের কি ক্যাম্পাসে থাকতে বুইলছে আপনাদের টিচাররা? আপনার আশপাশের দোকানদার গার্ডকে বুইললেই তো জানতে পারতেন সেদিন কিবরিয়া-রুনু কেউ দাঁড়াইতে পারে নি। আর আপনি স্টুডেন্টের পরিচয় দিছেন!’

এই সময় পাশ থেকে আনারুল বলে ওঠেন, ‘আপনাকে আমি কি বুইললাম, এগুলা দলীয় ভাবে ভাগ করে দেওয়া হইসে।’ আরিফ আবার বলে ওঠেন, ‘এই দিকের যত গাছ আছে, এখানে আম নামাতে গেলে ভাইবে চিন্তে যাইয়েন। ক্যাম্পাস যখন খোলা ছিল তখনকার হিসাব আলাদা। আপনি এখন ক্যাম্পাসের প্রশাসনকে ফোন দিয়ে বুলেন যে আপনি স্টুডেন্ট আম নামাতে এসেছেন, তখন দেখেন তারা কি বলেন। আপনারা আপনাদের ছাত্র উপদেষ্টাক ফোন দেন, প্রোভিসিক ফোন দেন, ফোন দিয়ে বুলেন যে স্যার আমি ক্যাম্পাসের স্টুডেন্ট আমি আম নামাইছি বহিরাগতরা এসে বাধা দিছে, দেখেন তখন স্যার আপনাক কী করে।’

নাম প্রকাশ না করার স্বার্থে স্থানীয় এক ছাত্রলীগ নেতা জানান, মেহেরচন্ডির বাসিন্দা কালু নামের ব্যক্তিটি স্থানীয়দের ত্রাস। তিনি স্থানীয় আওয়ামীলীগের রাজনীতিতে জড়িত, বিএনপি আমলের তার বাড়ি পুড়িয়ে দেয়া হয়েছিল। এরপর থেকে তিনি নগর আওয়ামীলীগ সভাপতি ও রাসিক মেয়র এএইচএম খায়েরুজ্জামান লিটনের নাম ভাঙ্গিয়ে চাঁদাবাজিসহ নানা অপকর্ম করে বেড়ায়। এলাকার লোকজন তার ব্যাপারে অতিষ্ঠ এবং প্রতিবাদ করারও সাহস নেই। বাবু নামের অন্য ব্যক্তিটি স্থানীয় আওয়ামীলীগের সঙ্গে জড়িত এবং কালুর ঘণিষ্ঠ।

প্রক্টর অধ্যাপক লুৎফর রহমান বলেন, আমি কৃষি বিভাগে খোঁজ নিয়ে জেনেছি ক্যাম্পাসের কোনো গাছ লিজ হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী-কর্মচারীরা এসব গাছের ফল পেড়ে খাবে। বহিরাগতদের এখানে কোনো এখতিয়ার নেই। শিক্ষার্থীরা চাইলে যেকোনো গাছের ফল পেড়ে খাবে। ফল পাড়তে কেউ বাধা দিলে আমাকে জানালে আমি তৎক্ষণাৎ ব্যবস্থা নিবো।

এই ব্যাপারে জানতে চাইলে উপাচার্য (রুটিন দায়িত্বে) আনন্দ কুমার সাহা বলেন, এবার গাছে ফল কম হয়েছে। তাই কোনো গাছ এবার লিজ দেয়া হয়নি। যেগুলো ফল আছে তা ক্যাম্পাসের শিক্ষার্থী-গার্ড-কর্মচারিরা খাবে। কিন্তু বহিরাগত যারা দখল করে আছে তারা এটা গায়ের জোরে দখল করে আছে। যারা আমার নাম ভাঙ্গিয়ে এসব করছে তারা অনৈতিক কাজ করছে। আমি কোনো ছাত্রলীগ-আওয়ামীলীগ কাউকে গাছ লিজ দেইনি। আমি এসব শুনে অতিষ্ঠ।

এর আগে ক্যাম্পাসের ফল পাড়া নিয়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে স্থানীয়দের সংঘর্ষ বাধে। এই সময় কানন নামের এক শিক্ষার্থী ও বিশ^বিদ্যালয় ছাত্রলীগ নেতা গুরুতর আহত হন। এই ঘটনায় পাল্টাপাল্টি মামলা দায়ের হয়। এছাড়া প্রায়শই ফল পাড়া নিয়ে স্থানীয়দের হাতে শিক্ষার্থীদের লাঞ্ছনা ও নির্যাতনের শিকার হবার খবর পাওয়া যায়।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
উপরে