ছাত্রলীগের ৩য় শ্রেণির চাকরি পাওয়া যৌক্তিক : আব্দুস সোবহান

প্রকাশিত: মে ৮, ২০২১; সময়: ৮:৫৬ pm |

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক, রাবি : রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) সদ্য বিদায়ী উপাচার্য এম আব্দুস সোবহান ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের তৃতীয় শ্রেণির পদে চাকরি পাওয়াটা যৌক্তিক বলে মনে করেন। শনিবার দুপুরে বিদায় বেলায় তার দেয়া নিয়োগ তদন্ত করতে গঠিত কমিটির তলবে ক্যাম্পাসে এলে গণমাধ্যমকর্মীদের সামনে তিনি এই মন্তব্য করেন।

এম আব্দুস সোবহান বলেছেন, দীর্ঘসময় রাবিতে কোনো নিয়োগ না হওয়ায় আমরা নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু করেছিলাম। কিন্তু গত বছর ডিসেম্বরে নিষেধাজ্ঞা আসে। আমি মানবিক কারণে ছাত্রলীগকে চাকরি দিয়েছি। তাদের যে জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে তাতে আমি মনে করি তারা চাকরিটা ডিজার্ভ করে। তারা অনার্স মাস্টার্স পাশ করে একটা তৃতীয় শ্রেণির চাকরি পাবে এটা আমি মনে করি খুব যৌক্তিক।

দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগের সত্যতা পাওয়া শিক্ষামন্ত্রণালয়ের দেয়া নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে গত ৬ মে অবৈধভাবে বিশাল নিয়োগ দিয়ে সমালোচনার জন্ম দিয়েছেন রাবির সদ্য বিদায়ী এই উপাচার্য। নিয়োগে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীসহ শিক্ষকদের স্বজন, উপাচার্যের ঘণিষ্ঠ সাংবাদিক, নাপিত, রাধুনিসহ ১৩৭ জনকে শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী পদ দেয়া হয়।

অভিযোগ রয়েছে, ছাত্রলীগের নাম ভাঙ্গিয়ে এম আব্দুস সোবহান বিশাল নিয়োগ বাণিজ্য করেছেন। নিয়োগ পাওয়াদের তালিকা ঘেঁটে বিশ^বিদ্যালয়সহ বিভিন্ন ইউনিটের ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের মধ্যে ৪৩ জনের নাম খুঁজে পাওয়া যায়। তাদের অনেকের শিক্ষক হবার যোগ্যতা থাকলেও অধিকাংশই পেয়েছেন তৃতীয় শ্রেণির পদ।

শনিবার গণমাধ্যমকর্মীরা তাকে বিষয়টি জানালে জবাবে এম আব্দুস সোবহান বলেন, কথাটা সত্য নয়। ছাত্রলীগের নেতা হওয়া আর ছাত্রলীগের কর্মী হওয়া, সবাই তো আর এক রকম না। ছাত্রলীগ নেতা, ছাত্রলীগ কর্মী, আওয়ামী পরিবারের সন্তান, তারা সবাই একই গোষ্ঠী।

ইতোমধ্যে এই নিয়োগকে অবৈধ ঘোষণা করে শিক্ষামন্ত্রণালয় একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। শনিবার থেকে সেই কমিটি তদন্ত শুরু করেছে। তদন্ত চলাকালীন নিয়োগ প্রাপ্তরা যোগদান করতে পারবে না এই মর্মে তদন্ত কমিটির আদেশে আদিষ্ট হয়ে রেজিস্ট্রার নিয়োগ স্থগিত রাখতে বিশ^বিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগে চিঠি পাঠায়। এর আগে আব্দুস সোবহানের বিরুদ্ধে আনীত দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগের সত্যতা পাওয়ায় গত ডিসেম্বর বিশ^বিদ্যালয়ে সবধরণের নিয়োগে স্থগিতাদেশ জারি করে শিক্ষামন্ত্রণালয়।

সরকারি নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে তিনি বলেন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় অ্যাক্টের ১২ (৫) ধারায় বলা আছে উপাচার্য নিজ ক্ষমতা বলে নিয়োগ দিতে পারবে। সেই ধারায় আমি নিয়োগ দিয়েছি। সুতরাং এখানে আইনের ব্যাত্যয় হয়নি। সরকারি যে নিষেধাজ্ঞা এসেছে, সেটা আসার আগে তো সেই আইনটা (বিশ^বিদ্যালয়ের অ্যাক্ট) বাতিল করা উচিৎ।

এর আগে ৫৪৪ জনের যখন নিয়োগ হয় তখন এম আব্দুস সোবহান সবচেয়ে বেশি প্রতিবাদ জানিয়ে বলেছেন যে এই ধরণের নিয়োগ দেয়া যাবে না। বিষয়টি গণমাধ্যমকর্মীরা স্মরণ করালে এম আব্দুস সোবহান বলেন, আমি মনে করি সেই রাতে এক সঙ্গে ৫৪৪ জনকে নিয়োগ দিয়েছে। সেটার ওপর কি কোনো নিষাধাজ্ঞা এসেছে? সেটার কি কোনো তদন্ত কমিটি হয়েছে? তা তো হয় নি। তাহলে এখন শুধু মাত্র ছাত্রলীগকে চাকরি দেয়ার কারণে তদন্ত করতে হবে? আমি তো এটা ব্যক্তি স্বার্থে করিনি। ব্যক্তিস্বার্থে করলে বলতাম যে অনৈতিক কাজ হয়েছে। এটাকে আমি অনৈতিক বলিনা, অবৈধও বলি না।

এদিকে এই নিয়োগকে শিক্ষামন্ত্রণালয়ের অবৈধ ঘোষণা করা এবং তদন্ত কমিটির আদেশে বিশ্ববিদ্যালয় রেজিস্ট্রার নিয়োগপ্রাপ্তদের যোগদানে স্থগিতাদেশ জারি করে। এই অবস্থায় চাকরি টিকবে কি টিকবে না এই শঙ্কায় আছেন সদ্য নিয়োগপ্রাপ্তরা।

এই বিষয়ে সংবাদিকরা জানতে চাইলে এম আব্দুস সোবহান বলেন, এটা আমি বলতে পারবো না, এর সিদ্ধান্ত করা নিবে তাও জানি না। এর আগে ৫৪৪ জনের এডহকে নিয়োগ হয়েছে, তারা তো এখনও টিকে আছে। সুতরাং এটা না টিকার কী কারণ আছে? আমি মনে করি এটা যৌক্তিক এবং আমি এটা নিজ দায়িত্বে দিয়েছি। এটার সঙ্গে কেউ জড়িত নয়, কেউ আমাকে চাকরি দিতে বলেনি।

সরকারি নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে গত ৬ মে বিদায়কালে ১৩৭ জন অস্থায়ী ভিত্তিতে বিভিন্ন পদে বিশাল নিয়োগ দেন এম আব্দুস সোবহান। এই নিয়োগকে কেন্দ্র করে এদিন চাকরী পাওয়া রাবি ছাত্রলীগের সংগে সংঘর্ষে জড়ায় চাকরী না পাওয়া মহানগর ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ লাঠিচার্জ করে। এই ঘটনায় ৫ জনের আহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়। এদিন দুপুর ২টায় এম আব্দুস সোবহান ক্যাম্পাস ছেড়ে চলে যাবার পর উপাচার্য ভবনে সদ্য নিয়োগ পাওয়ারা ভীড় করতে থাকেন। এসময় তাদের নিজ নিজ কর্মস্থলে যোগ দেবার জন্যে উপাচার্যের আদেশনামায় স্বাক্ষর করতে দেখা যায়।

জানা যায়, নিয়োগপত্রে স্বাক্ষর করতে অস্বীকৃতি জানানোয় রেজিস্ট্রার আবদুস সালামকে অব্যাহতি দেন উপাচার্য। তার স্থলে পরিষদ সেকশনের সহকারী রেজিস্ট্রার মামুন-উর-রশিদ অথবা উপ-রেজিস্ট্রার ইউসুফ আলীকে ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রারের দায়িত্ব দিয়ে এই নিয়োগ সম্পন্ন করেছেন। এর পরেই বিকেলে এই নিয়োগকে অবৈধ ঘোষণা করে চার সদস্যের একটি তদন্ত দল গঠণ করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। ইউজিসির সদস্য অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ আলমগীরকে আহ্বায়ক, ইউজিসি সদস্য অধ্যাপক ড. মো. আবু তাহের ও ড. মো. জাকির হোসেন আখন্দকে কমিটির সদস্য এবং ইউজিসির পরিচালক মো. জামিনুর রহমানকে সদস্য-সচিব করে এই তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিকে সাত কার্যদিবসের মধ্যে নিয়োগে জড়িতদের চিহ্নিত করে সুপারিশসহ প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয় মন্ত্রণালয়ের উপসচিব শামিমা বেগম স্বাক্ষরিত এই আদেশে।

শনিবার ক্যাম্পাসে আসেন তদন্ত কমিটির সদস্যরা। দুপুরে প্রশাসন ভবনে কমিটির আহ্বায়ক ইউজিসির সদস্য অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ আলমগীর গণমাধ্যমকর্মীদের জানান, যে পরিস্থিতি উদ্ভুত হয়েছে তার পরিপ্রেক্ষিতে শিক্ষামন্ত্রণালয় একটি তদন্ত কমিটি করেছে। সেই কমিটির সদস্য হিসেবে আমরা এখানে তদন্ত করতে এসেছি। এখানে এসে আমরা সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলেছি, বিভিন্ন নথিপত্র দেখেছি। আশা করি, নির্ধারিত সময়ের ভেতর তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে পারব।

এদিকে এই নিয়োগের নিন্দা জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও মূল্যবোধে বিশ্বাসী প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজের আহ্বায়ক কমিটি। শনিবার এক বিবৃতিতে এই নিয়োগের প্রতিবাদ জানানোর পাশাপাশি জড়িতদের শাস্তিও দাবি করেছেন তারা।

  • 190
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
উপরে