ব্যবস্থা আছে, সচেতনতা নেই

প্রকাশিত: মার্চ ৪, ২০২১; সময়: ৫:৪২ pm |

তানভীর অর্ণব, রাবি : রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি)। মূল ফটক পেরিয়েই যেখানে হাতছানি দেয় গগনশিরীষে মোড়ানো প্যারিস রোড। উন্মুক্ত চারুকলা প্রাঙ্গণ কিংবা ৭১’র স্মৃতি জাগানিয়া বধ্যভূমি। শ্রদ্ধাঞ্জলির ফুলে ফুলে শোভিত হয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে সাদা শহীদ মিনার। তবে গৌরব, ঐতিহ্য ও সৌন্দর্যে শোভিত বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসটিতে জায়গাভেদে এমন সব অসুন্দর দৃষ্টিগোচর হয় যা সকল সৌন্দর্যবোধকে ম্লান করে দেয়।

যেমন প্যারিস রোড ধরে সামনে এগিয়ে জুবেরী ভবনের সামনে পুকুরটির কথাই ধরা যাক। ২০১৯ সালের ৩ মে ‘সাত পুকুর গবেষণা প্রকল্প’ উদ্বোধনের পর মনোরম পরিবেশ গড়ে তোলার লক্ষ্যে পুকুরের চারপাশে পর্যায়ক্রমে ডাস্টবিন, বেঞ্চ, শেড ও দৃষ্টিনন্দন আলোকবাতি স্থাপন করা হয়। ২ জানুয়ারি থেকে হল বন্ধ রেখে পরীক্ষা গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয়া হলেও এর আগে থেকেই অনেক শিক্ষার্থী ক্যাম্পাসে অবস্থান করছিলেন। পাশাপাশি ক্যাম্পাসে বহিরাগত প্রবেশে নিষেধাজ্ঞাও তুলে দেওয়া হয়।

এতে করে পুকুর পাড়সহ ক্যাম্পাসের বিভিন্ন স্থানে পিকনিক, পার্টি ও জন্মদিন উদযাপিত হয়ে আসছে। এসকল অনুষ্ঠান সংলগ্ন স্থানে ডাস্টবিন থাকার পরও সেগুলো ব্যবহার করছেন না কেউ। ডাস্টবিনের আশপাশেই যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা পড়ে থাকতে দেখা যায়। এমনকি পুকুরের মধ্যেও ফেলা হচ্ছে প্লাস্টিকের প্লেট, গ্লাস, চিপসের প্যাকেটসহ অপচনশীল সব আবর্জনা।

এছাড়াও সরেজমিনে ক্যাম্পাসের বিভিন্ন ভবন ও হল ঘুরে দেখা যায়, ডাস্টবিন থাকার পরও ময়লা একপাশে স্তূপ করে রাখা হচ্ছে। ঠিকমত ময়লা অপসারণ না করায় ডাস্টবিন থেকে ময়লা উপচে পড়ে আছে। এ অবস্থার জন্য সবার সচেতনতার অভাবকেই দায়ী করছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা।

প্রকৌশল দপ্তর সূত্রে জানা যায়, নতুন-পুরাতন মিলিয়ে ক্যাম্পাসে বর্তমানে শতাধিক ডাস্টবিন আছে। ২০১৮ সালে ১০টি বড় ও ২৫টি ছোট ডাস্টবিন নির্মাণে ব্যয় হয় ৮ লাখ ২৫ হাজার টাকা। ২০১৯ সালে শুধু বড় আকারের ২০ টি ডাস্টবিন নির্মাণ করা হয়। যেখানে ব্যয় হয় ১৪ লাখ ৭০ হাজার টাকা। আর ২০২০ সাল থেকে ২০টি বড় ও ১২টি ছোট ডাস্টবিনের নির্মাণ প্রক্রিয়া চলমান।

বিকেলে বন্ধুদের সাথে জুবেরী ভবনের সামনে পুকুর পাড়ে বসে ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের শিক্ষার্থী মুহিব। তিনি বলেন, কোন অসুন্দরই তো আসলে সুন্দর লাগে না। পুকুরগুলি পরিষ্কার করে শাপলা বা পদ্ম ফুলের চাষ করলে দেখতে সুন্দর লাগবে ও সহজে কেউ পুকুরে আবর্জনা ফেলবে না। পাশাপাশি আরো কিছু ডাস্টবিন ও এ সংক্রান্ত সাইনবোর্ড স্থাপন করলে সবার মাঝে সচেতনতা ফিরবে বলে আমি মনে করি।

অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী মো. ফরহাদ বলেন, ক্যাম্পাসের প্রতি ভালোবাসা থেকে আমাদের দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে। শুধু প্রশাসনকে দোষারোপ করলে হবে না, আমাদেরকেও সচেতন হতে হবে। তবে প্রশাসন যেভাবে ক্যাম্পাসের সৌন্দর্য বর্ধনে কাজ করছে, তেমনি এগুলো দেখভালের জন্য আরো লোকবলের প্রয়োজন।

স্টুয়ার্ড শাখার সহকারি রেজিস্ট্রার সরদার মো. সোহরাব হোসেন বলেন, ক্যাম্পাসে ময়লা-আবর্জনা ফেলা হচ্ছে, কিন্তু সেটা দিনের দিনই পরিষ্কার করা হয়। তাছাড়া আমাদের লোকবলের সংকটও আছে। এত বড় ক্যাম্পাসের পরিচ্ছন্নতার দায়িত্ব নিতে হলে কমপক্ষে ৫০ জন প্রয়োজন, যেখানে আছেন মাত্র ২০ জন। তাদের মধ্যেও অনেকে আবার বিভিন্ন দপ্তর ও বিভাগের কাজের সাথে জড়িত। প্রশাসন যথাযথ ব্যবস্থা নিলে ক্যাম্পাস পরিচ্ছন্ন রাখার কাজটি আরো সুন্দরভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ে যারা বিচরণ করেন তারা সবাই শিক্ষিত। তাদের সচেতনতা বোধ আমাদের কাজকে আরো সহজ করে তুলবে। এটিও সবার ভাবা উচিত।

এদিকে গত বছরের ২২ মার্চ করোনা সংক্রমণ প্রতিরোধ ও ক্যাম্পাস পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার স্বার্থে বিভিন্ন স্থানের ভাসমান দোকানগুলো উচ্ছেদ করে প্রশাসন। তবে সম্প্রতি প্রশাসনের অনুমতি না নিয়েই টুকিটাকি চত্বরসহ বেশ কয়েকটি স্থানে আবারও জাঁকিয়ে বসেছে তারা। এতে করে ক্যাম্পাসের সৌন্দর্য যেমন নষ্ট হচ্ছে তেমনি দোকানের বর্জ্য অপসারণেও উদাসীনতা প্রদর্শন করছেন দোকানিরা।

এ ব্যাপারে প্রক্টর অধ্যাপক লুৎফর রহমান বলেন, এসব অননুমোদিত দোকান উচ্ছেদে আবারো অভিযান চালাবে প্রশাসন। অচিরেই একটি কমিটি গঠন করা হবে। ক্যাম্পাসের সৌন্দর্য রক্ষা ও শিক্ষার্থীদের কল্যাণের কথা বিবেচনা করে কোথায় দোকান স্থাপন করলে ভালো হবে এ কমিটি সে বিষয়ে কাজ করবে।

সার্বিক বিষয়ে উপ-উপাচার্য অধ্যাপক আনন্দ কুমার সাহা বলেন, শিক্ষার্থীদের সচেতনতাই বড় শক্তি। ক্যাম্পাস আমাদের সবার। বাইরে থেকে যারা আসছেন, তারাও অজ্ঞতাবশত ক্যাম্পাস নোংরা করছে। আমি দেখেছি একটা বাচ্চাও চিপস খেয়ে তার বাবাকে জিজ্ঞেস করছে প্যাকেট কোথায় ফেলবে। প্রাপ্তবয়স্করা তাহলে কেন এমন দায়িত্বশীল আচরণ করবে না। আমরা বিশেষ স্থানগুলোতে ডাস্টবিন ব্যবহারের নির্দেশাবলী সম্বলিত সাইনবোর্ড স্থাপন করবো যা সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করবে ও ডাস্টবিন ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ করবে।

  • 18
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
উপরে