বাগমারায় ঋণ-দাদনের জালে জড়িয়ে বাড়ি ছাড়া অসহায় মানুষ

প্রকাশিত: মে ১১, ২০২২; সময়: ১২:৪৩ pm |

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক, বাগমারা : রাজশাহীর বাগমারায় অবৈধ সমিতির ব্যাপক দৌরাত্মে অসহায় সাধারণ মানুষ। অবৈধ সমিতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সরকারের বিভিন্ন উর্ধ্বতন মহলে একাধিক অভিযোগ দাখিল করেছেন চকমহববতপুর গ্রামের আব্দুল হান্নান নামের এক ব্যক্তি। ব্যবস্থা না নেওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এলাকার সচেতন মানুষ।

বাগমারার দক্ষিণ দৌলতপুরের দরিদ্র কৃষক আক্কাছ আলীর ছেলে আমিনুল ইসলাম (২৫) ও একই উপজেলার গনিপুর গ্রামের আতাউর রহমানের ছেলে হাবিবুর রহমান (১৯)। সংসারের অনটন ঘোচাতে দারস্থ হয়েছিলেন ‘আশার আলো’ নামে একটি অনুনোমোদিত সমবায় সমিতির কাছে। এক লাক টাকার ঋণ নিয়েছিলেন তারা। সপ্তাহে দিতে হতো দুই হাজার টাকার কিস্তি।

সাপ্তাহিক সেই কিস্তি দিতে না পারলে জরিমানা দিতে হতো দ্বিগুন অর্থাৎ চার হাজার টাকা। এভাবে কোনো মতে কয়েক সপ্তাহ চলার পর সমিতির চাপে দিশেহারা হয়ে গনিপুর গ্রামের হাবিবুর রহমান গত ২০২১ সালের ১১ নভেম্বর গলাই ফঁাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন। একই ঘটনায় গত ১৩ মার্চ ২০২২ সালের দক্ষিণ দৌলতপুর গ্রামের দরিদ্র কৃষক আমিনুল ইসলাম গলায় ফাঁস নিয়ে আত্মহত্যা করেন।

কেবল দৌলতুপরের ওই কৃষক নন, বাগমারা উপজেলায় ঋন-দাদনের জালে জড়িয়ে গিয়ে দিশেহারা হয়ে দুইজন আত্মহত্যা করলেও এলাকা ছাড়া হয়েছেন একাধিক পরিবার। এছাড়া স্থানীয়ভাবে প্রতিষ্ঠিত সমিতির প্রভাবশালীদের আমবিক নির্যাতন ও চাপে বাড়ি ছাড়া হয়েছেন অন্তত আট থেকে দশটি পরিবার।

বিষয়টি নিয়ে ইতিমধ্যেই স্থানীয় পর্যায়ে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হলেও সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষ নিরব ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। এমনকি গত ২১ মার্চ পোড়াকয়া গ্রামের আব্দুল হান্নান নামে এক ব্যক্তি একই ধরণের অভিযোগ করেন রাজশাহীর জেলা প্রশাসকের কাছে। ডিসি সেখান থেকে বাগমারা উপজেলা প্রশাসনকে বিষয়টি খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিলেও এখনো সেভাবে নড়েচড়েও বসেননি দায়িত্বশীলরা।

কেবলমাত্র উপজেলা সমবায় অফিস থেকে মাঠে অবৈধ ওইসব সমিতি বা এনজিও’র বিষয়ে খোঁজ খবর নিলেও কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি বলে একটি প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি এখনো। এলাকার লোকজন ও ওইসব পালিয়ে থাকা পরিবারের সদস্যরা অভিযোগ করার পাশাপাশি দাদন ব্যবসা বন্ধের দাবি জানিয়েছেন।

ভূক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, উপজেলার গনিপুর ইউনিয়নের দক্ষিণ দৌলতপুরে স্থানীয় আবদুর রাজ্জাক নামের এক কলেজ শিক্ষকের নেতৃত্বে কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি ‘আশার আলো সমবায় সমিতি’র নাম দিয়ে দাদন ব্যবসা শুরু করেন। এজন্য কিছু কর্মী নিয়োগ দিয়ে তাঁদের মাধ্যমে স্থানীয় লোকজনদের চড়াও সুদে ঋণ দেন। সাপ্তাহিক ও মাসিক হিসাবে ঋণ গ্রহিতাদের কাছ থেকে কিস্তি আদায় করা হয় কর্মীদের মাধ্যমে। তাঁদের সমিতি দক্ষিণ দৌলতপুর গ্রাম ছাড়াও আশপাশের আরো কয়েকটি গ্রামে কার্যক্রম শুরু করেছেন।

খুদে ব্যবসায়ী, কৃষক ও স্বল্প বেতনে চাকরি করা লোকজনদের মধ্যে ঋণ দিয়ে থাকেন। এজন্য তাঁদের কাছ থেকে স্বাক্ষর করা ফাঁকা ব্যাংক হিসাবের চেক ও ননজুডিসিয়াল স্ট্যাম্প সংগ্রহ করেন।

অনেকে সময় মত ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে না পেরে হুমকীর মুখে রয়েছেন বলে তাঁরা জানিয়েছেন। আক্কেলপুর গ্রামের আয়েন উদ্দিনের স্ত্রী আঞ্জুয়ারা, গনিপুর গ্রামের আবদুল করিম, মাসুদ রানাসহ অনেকে এলাকা ঢাকায় গার্মেন্সে কাজ করছেন। তাঁদের ভাষ্য যে পরিমান ঋণ নিয়েছিলেন এর তিনগুন টাকা পরিশোধের পরেও মূল টাকা শেষ হয়নি। তাঁদের অব্যাহত চাপ দেওয়াতে পালিয়ে আছেন।

স্থানীয় গ্রামবাসী জামাল উদ্দিন, আসলাম আলী, দুলাল হোসেন, সিরাজ উদ্দিন অভিযোগ করে বলেন, সুদের বেড়াজালে গ্রামের লোকজন এখন নিঃস্ব হওয়ার পথে। তাঁরা প্রথমে নিজেদের সমিতিকে সরকার থেকে অনুমোদন পাওয়া বলে প্রচার করে। পরে গত জানুয়ারি মাসে তাঁরা লিখিত ভাবে বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ করলে তদন্তে তাঁদের থলের বিড়াল বের হয়ে আসে। তদন্ত শুরু হলে তাঁরা সমিতির কার্যক্রম বন্ধ রাখে। তবে কিছুদিন পর আবার শুরু করেছে বলে এলাকার সাধারন মানুষ জানিয়েছেন। তাঁরা সমিতির নামে এসব দাদন ব্যবসা বন্ধের দাবি জানিয়েছেন।

এই বিষয়ে অভিযুক্ত সমিতির পরিচালক কলেজ শিক্ষক আবদুর রাজ্জাক নিবন্ধন বা অনুমোদন না থাকার বিষয়টি স্বীকার করে মুঠোফোনে এই প্রতিবেদককে বলেন, নিজেদের মধ্যে তাঁরা সমিতির কার্যক্রম চালাচ্ছেন। কেবলমাত্র সদস্যদের মধ্যে ঋণ দেওয়া হয় বলে দাবি করেন। কী পরিমান সুদ নেওয়া হয় তা তিনি বলতে চাননি।

উপজেলা সমবায় দপ্তরের সহকারী পরিদর্শক মাইনুল ইসলাম বলেন, সমিতিটি উপজেলা বা মন্ত্রণালয় থেকে অনুমোদন বা নিবন্ধন গ্রহণ করেনি। ওই নামের কোনো সমিতিকে নিবন্ধন দেওয়া হয়নি। সমিতির বিরুদ্ধে সুদের ব্যবসা চালানোর অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে। তাঁদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া সুপারিশ করে কর্তৃপক্ষের কাছে প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারুক সুফিয়ান বলেন, সমিতির লোকজনকে কাগজপত্র নিয়ে আসতে বলা হয়েছে। এখনো তারা আসেনি। অল্প সময়ের মধ্যেই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে তিনি জানিয়েছেন।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
উপে