রাজশাহীতে ইটভাটার বিষে সর্বনাশ আম-কলাসহ ফসলের

প্রকাশিত: এপ্রিল ২৯, ২০২২; সময়: ২:৫৩ pm |

নিজস্ব প্রতিবেদক : গাছেই পচে পড়ে যাচ্ছে আম। আর কলাগাছে পাতা পুড়ে কালো হয়ে যাচ্ছে। গমের শিষ হয়েছিল, কিন্তু কালচে রং ধরে ফলন ভালো হয়নি। পাতা পুড়ে গেছে ধানের। রাজশাহীর বিভিন্ন উপজেলায় ইটভাটা থেকে নির্গত বিষাক্ত ধোঁয়া ও চেম্বারের বিষাক্ত গ্যাসে কৃষকদের ফসলের এমন ক্ষতির চিত্র দেখা গেছে।

রাজশাহী পরিবেশ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, জেলায় মোট ১২৫টি ইটভাটা রয়েছে। এর মধ্যে মাত্র ২৬টির কাগজপত্র হালনাগাদ করা ছিল। বাকিগুলোকে অন্য কোথাও সরিয়ে নেয়ার জন্য চিঠি দেয়া হয়েছে। আর এই ২৬টিকেও আরও কিছু শর্ত দিয়ে চিঠি দেয়া হয়েছে। শর্ত পূরণে ব্যর্থ ইটভাটাগুলোতে অভিযান চলছে।

জেলার বাগমারা উপজেলার মাড়িয়া ইউনিয়নের মাড়িয়া গ্রামে একটি ইটভাটার আশপাশের জমির ফসল ও গাছপাড়া পুড়ে গেছে বিষাক্ত গ্যাস ও ধোঁয়ায়। সেখানে রয়েছে চ.ক.ই. নামের একটি ইটভাটা। ফসলি জমির ওপর স্থাপিত এই ভাটার চারপাশে রয়েছে কৃষকের ধানের জমি ও ঘরবাড়ি, আম, কাঁঠাল, লিচু, নারিকেল গাছসহ বিভিন্ন ফলের গাছ। ইটভাটার কালো ধোঁয়ায় গাছের ফল পচন ধরেছে। পুড়ে গেছে ধান ও গাছপালা।

জানা গেছে, পুঠিয়া উপজেলার দীঘলকান্দি গ্রামে গড়ে উঠেছে একটি ইটভাটা। আম ও কলাবাগান এবং গমখেত থেকে ইটভাটাটি মাত্র আধা কিলোমিটার দূরে। ইটভাটার বিষাক্ত ধোঁয়ায় ওই এলাকায় ৬৪টি আমগাছ এবং ৪টি কলাবাগানের সাড়ে ৫০০ কলার ঝাড়ের ক্ষতি হয়েছে। আমগাছগুলো ৬ লাখ টাকায় বিক্রি হওয়ার কথা ছিল। আর কলাগাছের ক্ষতি ৪০ হাজার টাকার বেশি হবে বলে চাষিরা জানান।

ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন-২০১৩-এর ৮ ধারায় বলা হয়েছে, কৃষিজমি, আবাসিক এলাকা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ন্যূনতম এক কিলোমিটারের মধ্যে ইটভাটা স্থাপন করা যাবে না। দীঘলকান্দি গ্রামের ইটভাটায় মানা হয়নি সেই নিয়ম।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক উদ্ভিদবিজ্ঞানী এম মনজুর হোসেন বলেন, ইটভাটায় কয়লা পোড়ানোর কারণে ছাইয়ের কণা বের হয়ে গাছের পাতার ওপরে পড়ে আস্তরণ তৈরি করে। একে কার্বন শুট বলে। এতে সালোকসংশ্লেষণ বন্ধ হয়ে গাছের পাতা মারা যায়।

আবার বৃষ্টি হলে তা পানির সঙ্গে মিশে কার্বলিক অ্যাসিড তৈরি করে। তাতেও গাছের পাতা মারা যায়। কার্বলিক অ্যাসিড আমের গায়ে পড়ে নিচের দিকে ফোটার মতো জমে থাকে। পরে সেখান থেকে পচন শুরু হয়। এভাবেই ইটভাটা থেকে নির্গত কার্বন ডাই-অক্সাইড ও সালফার ডাই-অক্সাইড ফসলের ক্ষতি করে।

ইটভাটাটির মালিকের নাম ছৈমুদ্দিন। তার বাড়ি ও ইটভাটা পুঠিয়ার দীঘলকান্দি গ্রামে। ভাটার নাম এসবিএফ সুপার ব্রিকস ফিল্ড-১। এ ছাড়া পাশের বানেশ্বর-চারঘাট সড়কের পাশে শিশাতলায় তাঁর এসবিএফ সুপার ব্রিকস ফিল্ড-২ নামে আরেকটি ভাটা রয়েছে।

এই ইটভাটার ক্ষতিকর প্রভাবে ফসলসহ স্থানীয় দীঘলকান্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের শ্বাসকষ্ট এবং স্থানীয় লোকজনের নানা ধরনের স্বাস্থ্যহানির আশঙ্কায় এলাকাবাসী রাজশাহী ফল গবেষণা কেন্দ্রের পরিচালকের কাছে আবেদন জানিয়েছেন। ভুক্তভোগী চাষিরাও পুঠিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। তারপরও এ বিষয়ে কোনো সুরাহা হয়নি।

রাজশাহী ফল গবেষণা কেন্দ্রের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা খন্দকার হাবিবুল আলম ও মো. হাসান ওয়ালি উল্লাহ আমগুলো পরীক্ষা করে দেখছেন। তাঁরা বললেন, ইটাভাটার বিষাক্ত ধোঁয়ার কারণেই আমের এই ক্ষতি হয়েছে। বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা খন্দকার হাবিবুল আলম কালো পাতাগুলো দেখিয়ে বললেন, এগুলো ইটভাটার ধোঁয়ার কারণে হয়েছে। এই গাছগুলো এখন নষ্ট হয়ে যাবে।

ভাটার মালিকের ছেলে শাহাবুদ্দিনের দাবি, তাদের ভাটার পরিবেশগত ছাড়পত্র আছে। ভাটার দক্ষিণ পাশের আমের তো কোনো ক্ষতি হয়নি। এটাকে কী বলবেন? শুধু ভাটার কারণেই কি ক্ষতি হচ্ছে?

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
উপে