পবায় হরিয়ানে পুকুরখননের মহোৎসব

প্রকাশিত: এপ্রিল ১৮, ২০২২; সময়: ৯:২০ pm |

নিজস্ব প্রতিবেদক : রাজশাহী জেলার পবা উপজেলা এখন পুকুরখনন সিন্ডিকেটের অভয়ারান্য। উপজেলায় আবারো জোরে-শোরে শুরু হয়েছে অপরিকল্পিত পুকুরখনন। তবে পুকুরখনন সিন্ডিকেটের সদস্যরা পরিকল্পিতভাবেই ম্যানেজের মাধ্যমে চালিয়ে যাচ্ছে এই খননযজ্ঞ। পুকুরে যাদের ক্ষতি হচ্ছে তাদের আবেদনে কোন পদক্ষেপ নিচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে প্রশাসনের বিরুদ্ধে।

পবা উপজেলার অনেক মাঠেই তিন ফসলি জমিতে শুরু হয়েছে সংস্কারের নামে মাটি বিক্রির জন্য পুকুরখনন। চোর-পুলিশ খেলায় বিভিন্ন কারণে হেরে যাচ্ছে পুলিশসহ প্রশাসন। স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসন এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধি (ইউপি চেয়ারম্যান, উপজেলা চেয়ারম্যান, সংসদ সদস্য) এবং আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দের নাম ভাঙ্গিয়ে চলছে এই পুকুরখননের মহোৎসব। পুকুরখনন সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম দেখে মনে হচ্ছে পুরো উপজেলা যেন অভিভাবক শূন্য হয়ে পড়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ভূক্তভোগি বলেন, উপজেলার পারিলা ইউনিয়নের কৃষি জমির অর্ধেকই এখন অপরিকল্পিত পুকুর। বর্তমানে শুরু হয়েছে পাশের ইউনিয়ন হরিয়ানে। তবে খনন সিন্ডিকেটের সদস্যরা একই। এরা অবিনশ্বর। এদের মৃত্যু নাই। শুধু রূপান্তর হচ্ছে। এদের শক্তি অনেক। অদৃশ্য ম্যানেজের ফলে পুলিশ প্রশাসন, প্রশাসন, জনপ্রতিনিধিসহ সকলেই নীরব ভূমিকা পালন করছে। আর প্রশাসনের কর্তা ব্যক্তিরা মনে করছেন ক’দিন আছি। জনগণের ক্ষতি হলেও টু-পাইস কামনো যাচ্ছে। বেশী ক্ষতি হলে বা অভিযোগ হলে বড়জোর অবস্থানের পরিবর্তন হবে। বদলি হয়ে অন্যত্র যেতে হবে। এর বেশী কিছু না। কেননা খননবন্ধে অভিযোগ দিলেও একটি পুকুর খনন বন্ধ হয়েছে দেখাতে পারবেন না। ফলে পুকুরখননকারিরাই উৎসাহিত হচ্ছে।

কয়েকদিন আগে পুকুরখননবন্ধে প্রায় সাত দপ্তরে আবেদন করেছেন সোমায়রা আকতার নামের এক ভুক্তভোগি। তিনি আবেদনে উল্লেখ করেন পবা উপজেলার কাটাখালি থানার কুখন্ডি মৌজায় ২৮৪৪ ও ২৯২২ দাগে প্রায় ২০ বিঘা উচু ভিটা জমিতে পুকুরখনন হচ্ছে। আর ভাটাতে মাটি বিক্রির জন্যই এই খনন হচ্ছে। খনন করছেন কিসমত কুখন্ডি গ্রামের জোনাব আলীর ছেলে হানিফ মোহাম্মদ পলাশ, কুখন্ডি সোনারপাড়া গ্রামের সেফাতুল্লাহ’র ছেলে ও আওয়ামী লীগ পবা উপজেলা সাবেক সহসভাপতি ফসিউল আলম ভাদু ও কুখন্ডি গ্রামের রফিকুল ইসলাম রফিক।

সোমবার দুপুরে সরোজমিন দেখা যায়, জোরে-শোরে চলছে খনন কাজ। তিনটি এস্কেভেটর মেশিনে প্রায় ৪০টি টাক্টরে মাটি তুলে দিচ্ছে। সেই মাটি চলে যাচ্ছে আশে-পাশের ১০টি ইটভাটায়। এরমধ্যে নাজাল হোসেনের এমএসবি ও হানিফের ইটভাটা রয়েছে। রাস্তা-ঘাটের বেহাল দশা। এখানে যে কোনদিন পাকা রাস্তা ছিল ধুলার আস্তরে তা বলার উপায় নেই। ধুলায় বুঝা যাচ্ছে না রাস্তার পাশের বাড়ি-ঘরগুলোতে কোন রঙ ছিল। ওই এলাকার হাসিনা বেগম বলেন ইটভাটা ও পুকুরখননের ধুলায় দরজা জানালা খুলে রাখার সুযোগ নেই। জামা-কাপড় থেকে শুরু করে খাদ্য দ্রব্যই নষ্ট হচ্ছে। জানা গেছে, ফসিউল আলম ভাদু গতবছরও পুকুরখনন করেছেন। এছাড়াও পারিলার ভবানীপুরেও দেদারসে চলছে পুকুরখনন।

আবেদনকারি আশংকা করছেন পুকুরখনন সম্পন্ন হলে পুকুররের পাশের জমিগুলো বর্ষার পানিতে ওই পুকুরে ধ্বসে যাবে। এতে তাদের পুকুর বড় হইবে কিন্তু ভুক্তভোগিরা কিছুই পাবে না। এছাড়াও জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হবে। ঘরবাড়ি বিনষ্ট হবে এবং বহু ক্ষেত ডুবে ফসলের ক্ষতি হবে। যা আর্থিকভাবে ক্ষতি হতে থাকবে। গতবছরের মত এবারের পারিলা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক নবীবুর রহমানের ছত্রছায়ায় এসব পুকুরখনন হচ্ছে বলে একটি বিশ্বস্তসুত্রে জানা গেছে।

এদিকে পুকুর খনন বন্ধে উপজেলা ও জেলা প্রশাসনে আবেদন দিয়েও ফলাফল শূণ্যই থেকে যাচ্ছে। প্রেক্ষিতে একদিকে আবেদনকারিরা পড়ছে বিপাকে এবং অন্যদিকে খননকারিরা হচ্ছে উৎসাহিত। পুকুরখননে জেলায় কমেছে খাদ্য উৎপাদন, হুমকিতে পড়েছে পরিবেশ। গত পাঁচ বছরে বাণিজ্যিক মাছের খামার বেড়েছে বহুগুণ। কমেছে চারণভূমি, সংকট বেড়েছে পশু খাদ্যের। কৃষি জমি কমেছে প্রায় হাজার হেক্টর (প্রায় ৭৫ হাজার বিঘা)। বর্ষায় জলাবদ্ধতায় ব্যাহত চাষাবাদ।

শুধু পবা উপজেলার কুখন্ডি ও পারিলাতেই নয়। উপজেলার প্রতিটি ইউনিয়নেই চলছে অবৈধ পুকুরখনন। বর্তমানে এই উপজেলায় পুকুরখননবন্ধে কোন পদক্ষেপ নেই বললেই চলে। প্রেক্ষিতে পুকুরখনন সিন্ডিকেটের সদস্যরা জোরে-শোরে চালিয়ে যাচ্ছে পুকুরখনন।

এদিকে রাজনৈতিক জবাবদিহিতা ও প্রশাসনের হস্তক্ষেপ ছাড়া এই অপরিকল্পিত পুকুরখনন কখনোই সম্ভব নয়। এছাড়াও জনসচেতনতা বৃদ্ধি খুবই জরুরী হয়ে পড়েছে। পুকুর খননে মাছের লাভের চেয়ে অনেক বেশী ক্ষতি হচ্ছে কৃষিজীবী ও পরিবেশের। প্রশাসন, জনপ্রতিনিধিদের মদদেই অপরিকল্পিত পুকুর খননের মহোৎসব চলছে বলে জানিয়েছেন সচেতনমহল, পরিবেশবাদি ও ভুক্তভোগিরা।

শুধুমাত্র অপরিকল্পিত পুকুরখননের জন্যই পবা উপজেলার বিভিন্ন ফসলের মাঠে দেখা দিয়েছে জমির প্রকৃতি পরিবর্তন, দীর্ঘ মেয়াদি জলাবদ্ধতা, পুকুরখননে মাটি বহনে গ্রামীণ রাস্তা নষ্ট, ফসল উৎপাদন ব্যাহত, বিলের পানি বেরুনোর নালা (খাল, ড্রেনেজ) ব্যবস্থা না থাকায় গ্রামের বাড়ি-ঘরে জলাবদ্ধতা, কৃষিজীবীদের মধ্যে বেকারত্ব বৃদ্ধি, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্ঠনী নষ্ট, কৃষিকাজ না থাকায় যুব সমাজ মাদকে আসক্ত হচ্ছে এবং সর্বপুরি নগরীতে ভাসমান শ্রমিক বাড়ছে। অপরিকল্পিত পুকুরখননের ফলে এসব না সূচক ও নেতিবাচক প্রভাব দেখেও অজানা কারণে নিশ্চুপ আছে প্রশাসন ও রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ। সচেতনমহল, পরিবেশবাদি ও ভুক্তভোগিরা পরোক্ষ ও প্রত্যেক্ষভাবেই দোষারোপ করে আসছে তাদের।

জানা গেছে, মৎস্য খামারিরা সাধারণত ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষিদের জমি বছর মেয়াদি লিজ নিচ্ছেন কাউকে জমি বিক্রি করতে বাধ্যও করছেন। তাছাড়া জলাবদ্ধতার কারণে চাষাবাদ না হওয়ায় চাষিরাও জমি লিজ অথবা বিক্রি করছেন। পুকুর খনন করে পানি নিষ্কাশনের কোনো ব্যবস্থা রাখছেন না খামারিরা। ফলে বর্ষায় জলাবদ্ধতায় ব্যাহত হচ্ছে চাষাবাদ। কৃষকরা বলছেন, ফসলি জমি কেটে আসলে পুকুর হচ্ছে না, বরং ঘের হচ্ছে। মাত্র চার থেকে পাঁচ ফুট খনন করা হচ্ছে। কিন্তু পুকুর করতে হলে অন্তত ১৫ থেকে ২০ ফুট গভীর করে খনন করতে হয়। কিন্তু খামারে খনন হচ্ছে মাত্র ৫-৮ ফুট। ক্ষুদ্র চাষিরা অনেক সময় প্রভাবশালীদের ভয়ে, সাময়িক বেশী লাভের আশায় এবং শ্রম থেকে রেহাই পেতে পুকুর খনন করতে দিচ্ছে। কিন্তু প্রশাসন এই অপরিকল্পিত পুকুর খনন রোধে বরাবরই জেগে জেগে ঘুমাচ্ছেন। যা এ অঞ্চলে ভবিষ্যতে কৃষিতে এক ভয়াবহ পরিস্থিতি অপেক্ষা করছে।

বর্তমানে উপজেলার যে ইউনিয়নেই পুকুরখনন হচ্ছে-তা আওয়ামী লীগ নেতাসহ ইউপি চেয়ারম্যানের ছত্রছায়াই হচ্ছে। রাজশাহী জেলা যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মাসুম আল রশীদ সাংবাদিকদের জানান, যথাযথ আইনি পদক্ষেপের অভাবে প্রতিবছর দারুশা এলাকার বড়বিলসহ আশেপাশের বিলে অসংখ্য অবৈধ পুকুর খনন হচ্ছে। ফলে কৃষি জমি, বড়বিলের জীব বৈচিত্র্য ও রাস্তাঘাট নষ্ট হচ্ছে। এর মধ্যে মিনারুল ও তার ঘনিষ্ঠরা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত থেকে সর্বাধিক পুকুর খনন করে থাকে এবং ভয়ভীতি প্রদর্শনসহ মানুষকে জিম্মি করে জমি নিয়ে পুকুর খননের অনেক অভিযোগ রয়েছে। তারা টাকার বিনিময়ে প্রশাসনের কিছু অসাধু কর্মচারী ও নেতাকে ম্যানেজ করে দীর্ঘদিন যাবৎ অবৈধভাবে পুকুর খনন করছে। বেপরোওয়া অবৈধ কর্মকান্ড বন্ধে কার্যকর আইনি পদক্ষেপ গ্রহণে প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করছেন। তিনি বলেন, বর্তমানে দারুশা পশ্চিমপাড়া মিনারুল-আব্দুল আজিজের জমির পাশে পুকুর কাটলেও পাড় দেননি। এতে বর্ষায় আব্দুল আজিজের পুকুরে ধ্বসে পড়বে।

এব্যাপারে পবা উপজেলা নির্বাহী অফিসার লসমী চাকমা বলেন, অবৈধ পুকুর খননের বিরুদ্ধে অভিযান চলমান রয়েছে। ইতিমধ্যে কয়েকজনকে জরিমানাও করা হয়েছে। হরিয়ানের ওই পুকুরখননবন্ধে কাটাখালী থানা পুলিশকে অবহিত করা হয়েছে। তবে বর্তমানে উপজেলা সহকারি কমিশনার ভূমি না থাকার জন্য কিছুটা অসুবিধায় রয়েছি। এরপরেও সাধ্যমত পুকুরখননবন্ধে যথাসাধ্য চেষ্টা করে যাচ্ছি।

 

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
উপে