দুর্গাপুরে ইউপি নির্বাচনে ‘নৌকা’ পেল জামায়াত নেতার ভাই!

প্রকাশিত: নভেম্বর ২৪, ২০২১; সময়: ৪:৫৩ pm |

নিজস্ব প্রতিবেদক, দুর্গাপুর : আজাহার আলী খান এক সময় ছিলেন উপজেলা যুবদলের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। চারদলীয় জোট সরকারের আমলে ছিলেন উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক। ছোট ভাই সেলিম রেজা খান পানানগর ইউনিয়ন জামায়াতের সাবেক সভাপতি ও উপজেলা জামায়াতের সদস্য। চারদলীয় জোট সরকারের আমলে বিএনপি দলীয় সাংসদ নাদিম মোস্তফার আশীর্বাদপুষ্ঠ এই নেতা ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিজের স্ত্রী ও ভাইদের নিয়ে দিয়েছেন চাকুরী। এলাকার আওয়ামী লীগ নেতাদের মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে চালিয়েছেন লুটপাট। কলা বাগানের গাছ কর্তন থেকে শুরু করে পুকুরের মাছ লুট কি করেননি এই আজাহার আলী খান।

সম্প্রতি, পানানগর উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান ফটকে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি বিকৃত করে আলোচনায় আসেন এই আজাহার আলী। অথচ তার হাতেই তুলে দেয়া হয়েছে আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীক। এবার দিয়ে দু’দফায় নৌকা প্রতীক পেলেন তিনি। অথচ ওই ইউনিয়ন থেকে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চেয়েছিলেন ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকসহ প্রায় হাফ ডজন নেতা। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ধারন করা আওয়ামী লীগের এসব ত্যাগী নেতাদের মূল্যায়ন করেননি আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী মহল ও মনোনয়ন বোর্ড। তাইতো আওয়ামী লীগের এসব নেতাদের চোখেমুখে এখন হতাশার ছাপ।

জানা গেছে, চতুর্থ দফা ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে রাজশাহীর দুর্গাপুর উপজেলার ৩নং পানানগর ইউনিয়নে চেয়ারম্যান পদে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চেয়েছিলেন ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আদম আলী, সাবেক সাধারণ সম্পাদক আজিজুল ইসলাম, উপজেলা আওয়ামী লীগের আইন বিষয়ক সম্পাদক এ্যাড. আব্দুর রহিম, ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সহ সভাপতি আবু হানিফ ও মোজাম্মেল হক সহ প্রায় হাফ ডজন নেতা। এদের সাথে চেয়ারম্যান পদে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চেয়েছিলেন আজাহার আলী খান। তবে আওয়ামী লীগের দীর্ঘদিন দিনের এসব ত্যাগি নেতাদের মূল্যায়ন না করে আজাহার আলীকেই মনোনয়ন দেয়া হয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আজাহার আলী রাজনৈতিক ভাবে উপজেলা যুবদলের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন। এছাড়া উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদকও ছিলেন তিনি। দলীয় প্রভাব কাজে লাগিয়ে নিজের স্ত্রী সহ পরিবারের স্বজনদের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে চাকুরী নিয়ে দিয়েছেন। ২০০৪ সালে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে পানানগর ইউনিয়নে চেয়ারম্যান পদে বিএনপির দলীয় সমর্থন পেয়েছিলেন খন্দকার কোরবান আলী। দলীয় সমর্থন না পেয়ে তৎকালীন সাংসদ নাদিম মোস্তফার উপরে বচসা করে আওয়ামী লীগে যোগদেন আজাহার আলী। ওই সময় নাদিম মোস্তফা আজাহার আলীকে নিয়ে মন্তব্য করেছিলেন ‘আজাহার আলী বাদে তার পরিবারের সবাইকে চাকুরী দেয়া হয়েছে। তাও আজাহারের মন ভরলো না’।

সম্প্রতি, পানানগর উচ্চ বিদ্যালয়ের মুল ফটকে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতি বিকৃত করে আলোচনায় আসেন আজাহার আলী। ওই এলাকার বীর মুক্তিযোদ্ধারা আজাহার আলীর এ ধরনের কর্মকান্ডে সে সময় ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

গত শনিবার গণভবনে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে জনপ্রতিনিধি মনোনয়ন বোর্ডের সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় চতুর্থ দফা ইউপি নির্বাচনে মনোনয়ন প্রত্যাশি প্রার্থীদের তালিকা যাচাই-বাছাই করে দলীয় প্রার্থীদের তালিকা অনুমোদন দেন দলের সভাপতি শেখ হাসিনা। রোববার সেই তালিকা গণমাধ্যমে পাঠান আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়ুয়া। ওই তালিকায় দেখা গেছে রাজশাহীর দুর্গাপুর উপজেলার ৩নং পানানগর ইউনিয়নে চেয়ারম্যান পদে ফের আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছেন আজাহার আলী খান। দলীয় মনোনয়ন হাতে পেয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কয়েকটি ছবিও আপলোড দেন আজাহার আলী।

ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আদম আলী বলেন, আজাহার আলী খান ছিলেন বিএনপির প্রভাবশালী নেতা। চারদলীয় জোট সরকারের আমলে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের অত্যাচার নির্যাতন কম করেননি। তার পাশবিক নির্যাতন থেকে বাদ যাননি শিশু ও নারীরা। অথচ আওয়ামী লীগের কিছু নেতা নিজেদের স্বার্থসিদ্ধি করতে আজাহার আলীকেই মনোনয়ন পাইয়ে দিতে সহযোগিতা করেছেন। যা আমাদের বা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের জন্য অপ্রত্যাশিত। জন্মের পর থেকে আওয়ামী লীগ করে বিএনপি নেতার পক্ষে ভোট চাইতে হবে এর চাইতে কষ্টের আর কিছু হতে পারেনা। আগামী ইউপি নির্বাচনে আজাহার আলীকে বয়কট করে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করার ঘোষণাও দেন আদম আলী।

ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আজিজুল ইসলাম অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগে কি নেতাকর্মীর সঙ্কট পড়েছে যে অন্যদল থেকে আসা হাইব্রিড নেতাদের মনোনয়ন দিতে হবে। আজাহার আলী চারদলীয় জোট সরকারের আমলে মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রহমানের মাধ্যমে ৩ লাখ টাকা চাঁদা চেয়েছিলেন। না হলে আওয়ামী লীগের কাউকে এলাকায় বাস করতে দিবেনা। ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে জমি দখল, পুকুরের মাছ লুট, কলা বাগান তছরুপ কি করেননি এই আজাহার আলী। অথচ তাকেই মনোনয়ন দেয়া হয়েছে। আমরা যারা আওয়ামী লীগ করি তাদের জন্য এটা অনেক কষ্টের বলেন আজিজুল ইসলাম।

আজিজুল অভিযোগ করেন, যে ব্যাক্তির ভাই এখনো জামায়াতের রাজনীতির সাথে সরাসরি যুক্ত। যার হাতে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে তার পক্ষে উপজেলা ও জেলার নেতারা কিভাবে মনোনয়নের জন্য সুপারিশ করেন। এর চাইতে রাজনীতি ছেড়ে বাদাম বিক্রি করাও ভালো।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে আজাহার আলী খান বলেন, এক সময় বিএনপি করেছি। এখন আওয়ামী লীগ করি। দল আমাকে মূল্যায়ন করে পরপর দু’বার মনোনয়ন দিয়েছেন। প্রথমবার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছি আশাকরি এবারও হব। রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে অনেকে অনেক কথা বলবে। তাতে আমার কিছু যায় আসেনা।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
উপরে