রুপ-রসে, ঐতিহ্য আর নান্দনিকতায় অনন্য ‘লবঙ্গ’

প্রকাশিত: নভেম্বর ১৭, ২০২১; সময়: ১:৫৫ pm |

নিজস্ব প্রতিবেদক : চারিদিকে বাঁশের কারুকাজ। ছাদ ছনের। প্রতিটি কোণে কোণে বাঁশের নান্দনিকতা। সবমিলিয়ে কক্ষটিতে প্রবেশের পর চোখে ধরা পড়ে গ্রামীণ অবয়বের এক আভিজাত্য।

মনে পড়ে পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি বা বান্দবানের পাহাড়িদের জীবনযাপনের ঐতিহ্য। বাঁশ-বেত দিয়ে তৈরি কক্ষটি নান্দনিকতা ও শৈল্পিক নকশায় যেমন দৃষ্টিনন্দন, তেমনি নিচে বসার স্থানটিও তৈরী মোঘল রাজ দরবারের আদলে।

বলছিলাম লবঙ্গ চাইনিজ এন্ড ফাস্ট ফুড রেস্টুরেন্ট-এর কথা। রাজশাহী মহানগরীর সাগরপাড়া কল্পনা সিনেমা হল মোড়ে গত ২৮ সেপ্টেম্বর এক অনাড়াম্বর অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে যাত্রা শুরু করে লবঙ্গ। গতানুগতিক রেস্টুরেন্ট এর বাহিরে গিয়ে লবঙ্গ তার ভিন্নতার জন্য মাত্র এক মাসেই জনপ্রিয়তা পায় সর্বসাধারণের কাছে।

লবঙ্গের মোঘল রাজ দরবারের আদলে বানানো কক্ষটি যারা দেখেছেন তারাই প্রশংসায় পঞ্চমুখ। এই যেমন আসফিকা ইয়াসমিন। সাপ্তাহিক ছুটির দিন গত শুক্রবার বিকেলে বন্ধুদের নিয়ে এসেছিলেন কক্ষটিতে। সেখানে ঢুকতেই দেখার মত উচ্ছাস।

তিনি বলছিলেন, ‘রাজশাহীতে রেস্টুরেন্টে এমন আয়োজন নেই বললেই চলে। ইতিহাস, ঐতিহ্য, নান্দনিকতা সবকিছুর অন্যন্য মিশেল লবঙ্গ রেস্টুরেন্ট-এ।’

লবঙ্গ রেস্টুরেন্টে বাঁশের দুইতলা বাড়িসহ তিনটি ঘর নির্মাণ করা হয়েছে। মিঠা, পায়া, ভুদুমসহ আট ধরনের বাঁশ ব্যবহার করা হয়েছে। বাঁশগুলো বান্দরবন ও রাঙ্গামাটি থেকে আনা হয়েছে। এগুলো দীর্ঘ কয়েক বছর পর্যন্ত পোকা ও ঘুন ধরেনা। পাবর্ত্য অঞ্চলের এই ভুদুম বাঁশ অনান্য বাঁশের চেয়ে মোটা ও সরু লম্বা হয়ে থাকে। তাই ঘর তৈরিরে পর খুবই দৃষ্টিনন্দন হয়।

বাঁশের ঘরের সৌন্দর্য বাড়াতে এখানে নানান শোপিসের ব্যবহার করা হয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে ফুলদানি, টেবিল ল্যাম্প, ঝাঁড়বাতি, ওয়ালম্যাট, চাঁদসহ নানা পণ্য। এছাড়াও ফার্নিচারের মধ্যে রয়েছে বাঁশের সোফা, চেয়ার, টেবিল, সেলফসহ নানান পণ্য।

আর শুধু বাঁশের কক্ষই নয়,নগরীর কল্পনা হলের মোড়ে অবস্থিত লবঙ্গ রেস্টেুরেন্টের প্রতিটি কক্ষ ও সেমিনার রুমের রয়েছে আলাদা আলাদা বৈশিষ্ট্য। রেস্টুরেন্টে প্রবেশ পথ থেকে শুরু করে ধাপে ধাপে প্রতিটি পয়েন্টে সাজানো হয়েছে অসাধারণভাবে।

পরিবারের সাথে বেড়াতে আসা তানিয়া খাতুন জানান, রাজশাহী শহরে এমন একটি রেস্টুরেন্ট এক কথায় অসাধারণ। প্রবেশ পথ থেকে শুরু করে সব জায়গাগুলো সাজানো গোছানো। বাঁশের তৈরি দুইতলা ঘরটির কারুকাজ দারুণ। রেস্টুরেন্টের খাবার গুলোও গুণে-মানে অনেক ভালো।

লবঙ্গ চাইনিজ এন্ড ফাস্ট ফুডের সবধনের কারুকাজে দেশীয় ঐতিহ্য তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিটি জায়গায় রয়েছে নান্দনিকতা ও শৈল্পিক ছোঁয়া। শুধু তাই নয়, এখানে রয়েছে কিডস জোন, অ্যাকুরিয়ামসহ পরিবারের ছোট্ট সোনামনিদের জন্য খেলার ব্যবস্থা।

পরিবার নিয়ে বেড়াতে আসা আরেক মুরাদ হোসেন ও পুলোক কুমার জানান, পরিবারসহ বাচ্চাদের নিয়ে মাঝে মাঝে এখানে আসা হয়। এখানে বড়দের জন্য যেমন সুন্দর সময় কাটানো যায়, তেমনি বাচ্চাদের জন্যও খেলাধুলার নানান পণ্য রয়েছে। সেখানে বাচ্চারা অনেক আনন্দ করতে পারে।

অনার্স পড়ুয়া মুরাদ, ফরহাদ, সাব্বিরসহ কয়েকজন শিক্ষার্থী জানান, বন্ধুদের সাথে এই রেস্টুরেন্টে প্রায়ই আসা হয়। বাঁশের বাড়ি ও বিভিন্ন ধরনের ঐতিহ্যবাহী খাবার দেখলে মনে হয় যেন এক টুকরো রাঙ্গামাটি, বান্দরবান অথবা পার্বত্যঞ্চল।

বাংলা, চাইনীজ, ইন্ডিয়ান, থাই খাবারের পাশাপাশি সম্প্রতি লবঙ্গ রেস্টুরেন্ট যোগ করেছে সামুদ্রিক মাছ। এখানে এসে ভোজন রসিকরা মাছ দেখে অর্ডার করার পর খুব দ্রুত সময়ে সেটি পাচ্ছেন তাদের খাবারের পাতে।

ভোজন রসিকদের খাবার তৃপ্তি দেয়ার পাশাপাশি মানসিক প্রশান্তিতে রয়েছে মনোমুগ্ধকর অবকাঠামো। প্রতিষ্ঠানটির উদোক্তার উদ্দেশ্য যাপিত জীবনের কর্মব্যস্ততার পর নির্মল প্রশান্তি, বিনোদন, ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সাথে পরিচয় ঘটানো।

‘লবঙ্গ’ চাইনিজ এন্ড ফাস্ট ফুডের কর্ণধার, রাজশাহী মহানগর আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও বিশিষ্ট সমাজসেবক আজিজুল আলম বেন্টু জানান, ‘আমরা সাধারণত বদ্ধ ঘরে খেতে অভ্যস্ত। কিন্তু লবঙ্গে আমরা চেষ্টা করেছি ভিন্ন কিছু করার। যাতে করে এখানে এসে মানুষ যেন ভালো খাবারের পাশাপাশি মানসিক প্রশান্তি উপভোগ করতে পারে।’

মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে সুবিধাবঞ্চিত মানুষদের জন্য বিনামূল্যে খাবারের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে লবঙ্গে। এ বিষয়ে আজিজুল আলম বেন্টু জানান, বগুড়ার আকবরিয়া হোটেল প্রতিরাতে ছিন্নমূল মানুষকে খাওয়ায়। সেটি দেখে তিনি অনুপ্রাণিত হয়েছেন।

তিনি জানান, তাঁর রেস্তোরাঁয় বাংলা খাবার বিক্রি হয় না। তবে রেস্তোরাঁর লাভের অংশ থেকে শুধু অসহায় মানুষদের জন্যই আলাদা বাজার করে বাংলা খাবার রান্না হয়।

তিনি বলেন, মানবিকতা ও সমাজের কাছে দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে থাকি। একটি ক্ষুধার্ত মানুষকে এক বেলা এক মুঠ খাবার দিলেও সেটার মধ্যে আত্মতৃপ্তি আছে। সমাজের বিত্তবানদের এসকল ছিন্নমূল মানুষদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য আহবান জানান তিনি।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
উপরে