চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন হাসান আজিজুল হক

প্রকাশিত: নভেম্বর ১৬, ২০২১; সময়: ৪:১৬ pm |

খুর্শিদ রাজীব, রাবি : হেমন্তের শেষভাগে যখন কৃষকের ঘরে ফসল তোলার আনন্দ, তখনই বাংলা সংস্কৃতি-সাহিত্য জগতে নামল শোকের ছায়া। বাংলা সংস্কৃতির বটবৃক্ষ সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁকে স্মরণ করা হচ্ছিল উপমহাদেশ জুড়ে। এমনই দিনে তাঁরই পথ ধরে নশ^র পৃথিবী ছেড়ে অনন্ত যাত্রায় চললেন বাংলা কথাসাহিত্যের বরপুত্র হাসান আজিজুল হক। ১৫ নবেম্বর সোমবার রাত সোয়া ৯টায় রাজশাহী নগরীর বিহাস এলাকায় নিজ বাসভবনে শেষ নিঃশ^াস ত্যাগ করেন কিংবদন্তী এই লেখক। মৃত্যুকালে বয়স হয়েছিল ৮২ বছর।

পরিবার ও ঘণিষ্ঠজনেরা জানান, দীর্ঘদিন ধরে বার্ধক্যজনিত কারণে অসুস্থ ছিলেন তিনি। এর আগে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে গত ২০ এপ্রিল তাঁকে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে ঢাকায় নেয়া হয়েছিল। গত সোমবার হাসান আজিজুল হকের মৃত্যুর খবর চাউর হবার পর বাংলা সাহিত্যের বিশিষ্ট্য জনেরা ম্রিয়মাণ হয়ে পড়েন। সামাজিক মাধ্যমে শ্রদ্ধা, শোক ও স্মৃতিচারণ করতে থাকেন রাবি শিক্ষক-শিক্ষার্থীরাসহ দুই বাংলার কবি, লেখক, সংস্কৃতি কর্মীসহ বিশিষ্ট্যজনেরা। বরেণ্য এই লেখকের মৃত্যুতে শোক জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. আব্দুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মূখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার প্রাঙ্গণে সমাহিত করা হয় বরেণ্য এই লেখককে। এর আগে দুপুর ১২টায় বিশ^বিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য তাঁর মরদেহ নিয়ে আসা হয়।

এসময় বিশ^বিদ্যালয়ের উপাচার্য, উপ-উপাচার্যসহ প্রশাসনিক কর্মকর্তা-কর্মচারী, শিক্ষক-শিক্ষার্থী, রাসিক মেয়র, জেলা প্রশাসক, পুলিশ কর্মকর্তা, কবি-লেখক-নাট্যকার-বিশিষ্ট্য ব্যক্তিবর্গ, বিভিন্ন সংগঠন ও কর্মীরা লেখককে শেষযাত্রার শ্রদ্ধা জানান। পরে বাদ জোহর জানাযা শেষে কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের উত্তর প্রান্তে সমাহিত করা হয় তাকে।

একাডেমি পুরস্কারজয়ী বিশিষ্ট্য নাট্যজন অধ্যাপক মলয় কুমার ভৌমিক বলেন, হাসান আজিজুল হক ছিলেন আমাদের এক বটবৃক্ষ। তিনি যখন চলে যান তখন আমাদের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে যায়। এইরকম ছায়া দেবার মত মানুষের অভাব রয়েছে। তিনি কেবল একটি গল্প বা উপন্যাস লিখেই দায়িত্ব শেষ করেন নি। তিনি ছাত্রাবস্থা থেকেই অর্থাৎ মুক্তিযুদ্ধের আগে ও পরেও যত অশুভ শক্তি উত্থিত হয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে রাজপথে সক্রিয় ছিলেন, অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। তিনি শুধু একজন কথাসাহিত্যিকই নন, তিনি একাধারে একজন দাপুটে মঞ্চ অভিনেতা, পথ প্রদর্শক এবং অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে রাজনীতির মাঠে এক লড়াকু যোদ্ধা।

রাবি উপাচার্য অধ্যাপক গোলাম সাব্বির সাত্তার বলেন, স্যার বাংলা সাহিত্যের যে মাপের মানুষ ছিলেন, তাতে একটা অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে গেল। যখনই বাঙালী জাতীয়তাবাদ সংকটে পড়েছে তখনই আমরা স্যারের কাছে গিয়েছি, তাঁর উচকিত যে আহ্বান ছিল তা আমাদের পথ দেখাতো। আমরা যদি হাসান স্যারকে অনুধাবন করি, ধরণ করি তাহলে স্যার আমাদের কাছ থেকে হারিয়ে যাবেন না।

দুই বাংলায় বরেণ্য এই লেখক ১৯৩৯ সালের ২ ফেব্রুয়ারি বর্তমান ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৭৩ সাল থেকে টানা ৩১ বছর রাবির দর্শন বিভাগে অধ্যাপনা শেষে ২০০৪ সালে অবসর নেন। ষাটের দর্শক থেকে বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত থেকেছেন। এই সময়েই শুরু করেছিলেন লেখালেখি।

তার উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকর্মের মধ্যে রয়েছে ‘আত্মজা ও একটি করবী গাছ’, ‘নামহীন-গোত্রহীন’, ‘পাতালে-হাসপাতালে’, ‘আগুনপাখি’, ‘সাবিত্রী উপখ্যান’, ‘এই পুরাতন আখরগুলি’ প্রভৃতি। বর্ণাঢ্য এই সাহিত্যজীবনে আদমজী পুরস্কার, বাংলা একাডেমী পুরস্কার, একুশে পদক, স্বাধীনতা পুরস্কারসহ অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন তিনি।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
উপরে