রাজশাহীতে ‘অমায়িক’ ছিল কুষ্টিয়ার দুর্ধর্ষ খুনি রওশন

প্রকাশিত: আগস্ট ২৪, ২০২১; সময়: ১০:১৬ pm |

পদ্মাটাইমস ডেস্ক : মহল্লায় দুই দশকের বেশি সময় ধরে বাস করেছেন। কিন্তু কখনো কারও সঙ্গে বিরোধ হয়নি। এলাকার লোকজনের ভাষ্য, লোকটি ‘অমায়িক ভালো’ মানুষ। অথচ তিনিই একজন দুর্ধর্ষ খুনি।

মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) নেতা কাজী আরেফ আহমেদসহ একসঙ্গে পাঁচজনকে ব্রাশফায়ারে হত্যার ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি তিনি। এ ছাড়া আরও কয়েকটি হত্যায় প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ করেছিলেন তিনি। ডাকাতিরও মামলা রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।

এই ব্যক্তির নাম রওশন। গত বুধবার রাতে রাজশাহী মহানগরীর ভাড়ালীপাড়া থেকে র‌্যাব তাঁকে গ্রেপ্তার করে। রাজশাহীতে তিনি ‘আলী’ নামে পরিচিত। আর জাতীয় পরিচয়পত্র করেছিলেন ‘উদয় মণ্ডল’ নামে।

১৯৯৯ সালে কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে একটি সভা চলাকালে প্রকাশ্যে ব্রাশফায়ার করে কাজী আরেফসহ পাঁচ নেতাকে হত্যার পর আত্মগোপন করেন রওশন। মুখের দাঁড়ি কেটে ফেলে ভাড়ালীপাড়ায় ভাড়া বাসায় থাকতে শুরু করেন তিনি। এরপর কেটে যায় ২২ বছর। এরই মধ্যে রাজশাহীতে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন তিনি। করেছেন দুটি বাড়ি।

ভাড়ালীপাড়া মহল্লায় রওশনের দোতলা বাড়ি। এটি নগরীর ১৭ নম্বর ওয়ার্ডে। আরেকটি তিনতলা বাড়ি একই ওয়ার্ডের ডাঙ্গিপাড়ায়। ভাড়ালীপাড়ার বাড়িটিতেই ছেলে আমির হামজা, মেয়ে দুলালি খাতুন ও স্ত্রী ফাতেমা খাতুনকে নিয়ে থাকতেন রওশন। গত শুক্রবার (২০ আগস্ট) বিকেলে বাড়িটি তালাবদ্ধ দেখা গেছে। ডাঙ্গিপাড়ার বাড়িতে গিয়েও তাঁর পরিবারের কাউকে পাওয়া যায়নি।

ভাড়ালীপাড়ার প্রতিবেশী মো. সুমন বলেন, ‘আলী যে রওশন, সেটা আমরা আজই জানলাম। আমরা তো অবাকই হচ্ছি। এ রকম একটা ‘অমায়িক ভালো’ মানুষের অতীত এমন তা ভাবতেই পারছি না।’

ভাড়ালীপাড়ার গলিতে ঢোকার মুখেই রুহুল আমিনের মুদি দোকান। তাঁর সঙ্গে চলাচল ছিল রওশনের। রুহুল আমিন বলেন, এই এলাকায় আলীর কোন খারাপ রিপোর্ট নাই। কেউ বলতে পারবে না। সব সময় মাথা নিচু করে চলতো।

তাঁর কথায় সাঁয় মিলিয়ে শাজাহান আলী নামে আরেক ব্যক্তি বললেন, ‘খুবই ঠান্ডা মানুষ। কারও সাথে গাঢ়ভাবে মিশত না।’

এলাকার লোকজন জানান, দুই দশক আগে ভাড়ালীপাড়ায় এসে জার্জিস নামে এক ব্যক্তির বাড়িতে ভাড়া থাকতে শুরু করেন রওশন। তখন রওশন গাভি গরু কেনাবেচার ব্যবসা শুরু করেন। কিছুদিন পর এলাকার একটি খাস জমিতে বাড়ি করেন। ১৫ বছর আগে ৮ কাঠা জমি কিনে একটি টিনশেড বাড়ি করেন।

বছর দশেক আগে গরু কেনাবেচা ছেড়ে জমির দালালিতে ঢুকে পড়েন রওশন। আর এতেই ঘুরে যায় ভাগ্য। টিনশেডের বাড়ির পাশে করেন দোতলা বাড়ি। তখন নিচতলায় রওশনের ভাই মামুন এসে থাকতে শুরু করেন। আর দোতলায় থাকেন রওশন।

তিন বছর আগে ডাঙ্গিপাড়ায় সাত কাঠার আরেকটি প্লট কেনেন রওশন। সেখানে এখন তিনতলা বাড়ি। ডাঙ্গিপাড়া একটি নতুন আবাসিক এলাকা। আমবাগানে ঘেরা এলাকাটি খুবই নির্জন। হাতেগোনা কয়েকটি বাড়ি হয়েছে। আশপাশের সব জমি প্লট আকারে বিক্রি করেছেন রওশন। শুক্রবার বিকেলে ওই বাড়িটিতে গিয়ে এশাদুল ইসলাম ওরফে বাণিজ্য নামের এক ব্যক্তিকে পাওয়া গেল। এশাদুল পরিবার নিয়ে এ বাড়িতেই থাকেন। এশাদুল বললেন, আলী খুবই ‘দয়াবান’ মানুষ।

তিনি জানান, বিপদে পড়ে নিজের বাড়ি বিক্রি করে দিয়েছেন। তারপর ডাঙ্গিপাড়ায় আলীর বাড়ির পাশেই তাঁর কাছ থেকে এক কাঠা মাটি নিয়েছেন। কিন্তু টাকার অভাবে বাড়ি করতে পারেননি। যত দিন বাড়ি না হচ্ছে, তত দিন নিজের বাড়িতে থাকতে দিয়েছেন আলী।

এশাদুল বলেন, ‘আমরাও কিছু জানতাম না। এমনিতে তো সে খুব ভালো মানুষ। কেউ শালা বললে দুলাভাই বলে চলে এসেছে। তাই জমির মতো জটিল ব্যবসা করলেও কারও সাথে কোনো দিন ঝামেলা হয়নি। কোনো দিন থানা-পুলিশও হয়নি। এই প্রথম র‌্যাব তাঁকে নিয়ে গেল।’

স্থানীয়রা জানান, আমির হামজা নামের এক দলিল লেখকের মাধ্যমে জমির দালালিতে ঢোকেন রওশন। এখন বড়বনগ্রাম এলাকার শালেক ও কৃষ্টগঞ্জের আবদুর রাজ্জাকের সঙ্গে এই ব্যবসা করতেন। তাঁরা জমির মালিককে অল্প কিছু টাকা দিয়ে জমি নিতেন। তারপর ক্রেতা ঠিক করতেন।

ক্রেতার নামে জমির রেজিস্ট্রি করার দিন মালিককে বাকি টাকা দেওয়া হতো। আর তখন জমির মূল্যের একটা অংশ তাঁরা তিনজন কেটে নিতেন। এভাবে টাকার কুমির হয়েছেন রওশন। তাঁর একেকটি বাড়ির মূল্য কোটি টাকার ওপরে। এলাকার লোকজন জানেন, তানোর উপজেলার দিকে নিজের নামে আরও অনেক জমি কিনেছেন রওশন।

১৭ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর শাহাদত আলী বলেন, ‘ছদ্মবেশে থাকার জন্য সে দাঁড়ি কেটে ফেলেছিল। মাথায় সব সময় ক্যাপ দিয়ে থাকত। যদ্দুর জানি লোকটা জামায়াত-শিবির ঘেঁষা। গোপন মিটিংয়ে থাকত। জামায়াত-শিবিরকে টাকা দিত। শিবির ক্যাডার জসিমের সাথে তাঁর খুব ভাব।’

শাহমখদুম থানার ওসি সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘ভাড়ালীপাড়ায় জসিম নামে শিবিরের এক বড় নেতা আছে। তাঁর নামে থানায় তিনটা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা আছে। তাই পলাতক। তবে জসিমের সাথে রওশনের কেমন সম্পর্ক সেটা জানি না।’

ওসি জানান, তাঁর এলাকার জামায়াত-শিবিরের নেতা কর্মীদের ২০১৩ সালের একটা তালিকা আছে। সেই তালিকায় আলীর নাম নেই।

এমন দুর্ধর্ষ খুনি এলাকায় পরিচয় লুকিয়ে এত দিন থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে ওসি বলেন, ‘এখন নতুন কেউ এলে তাঁর গ্রামের ঠিকানা নিয়ে খোঁজ নেওয়া হয়। ২২ বছর আগে সেটা হতো না। রওশন তো এলাকায় ‘আলী’ হিসেবে একরকম স্থায়ী হয়ে গিয়েছিল। তাই তাঁর সম্পর্কে আলাদা করে খোঁজ নেওয়া হয়নি।’

রওশনকে গ্রেপ্তারের পর র‌্যাব জানিয়েছে, রওশনের ফাঁসির দণ্ড থাকার বিষয়টি শুধু তাঁর স্ত্রী জানতেন। ছেলে-মেয়েরাও জানত না। উত্তম মণ্ডল নামে তাঁর জাতীয় পরিচয়পত্র আছে। সেটি গাজীপুরের ঠিকানায় করা।

জাতীয় পরিচয়পত্রে উদয় মণ্ডল নাম দেখে কেউ জানতে চাইলে রওশন বলতেন, উত্তম মণ্ডল তাঁর আসল নাম। আর ডাকনাম আলী। জানাতেন, তাঁর জন্মস্থান গাজীপুর। প্রকৃতপক্ষে তাঁর জন্মস্থান মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার ভবানীপুর গ্রামে।

উল্লেখ্য, কুষ্টিয়ায় জাসদের পাঁচ নেতাকে হত্যার মামলায় ২০১৬ সালে তিন আসামির ফাঁসি কার্যকর হয়েছে। আর ফাঁসির দণ্ড মাথায় নিয়ে পলাতক ছিলেন রওশন। এ মামলায় গ্রেপ্তারের পর জামিন নিয়ে পালিয়েছিলেন তিনি। গাংনীর কাজীপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বাকী ও স্কুলশিক্ষক আমজাদ হত্যাকাণ্ডেও অংশ নিয়েছিলেন তিনি। গাংনী থানায় তাঁর বিরুদ্ধে একটি ডাকাতিরও মামলা আছে। সূত্র- আজকের পত্রিকা

  • 190
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
উপরে