বিক্রির অপেক্ষায় রাজশাহীর ‘শান্ত বাবু’

প্রকাশিত: জুলাই ১০, ২০২১; সময়: ১১:৪১ am |

তারেক মাহমুদ : করোনা ও লকডাউনের বাধ্যবাধকতায় রাজশাহীতে শুরু হয়নি কোরবানির পশুর বাজার। যদিও লাখ খানেক পশু বিক্রির অপেক্ষায় খামারিরা। এমন প্রেক্ষাপটে বাজারে জনসমাগম ঠেকাতে অনলাইনে পশু বেঁচা কেনার নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থা করতে তৎপরতা শুরু করেছে স্থানীয় প্রশাসন।

এদিকে পুঠিয়ায় ৩০ মণ ওজনের ‘শান্ত বাবু’ নামের একটি ষাড় নিয়ে রাজশাহীতে চলছে জোর আলোচনা। খামারির প্রত্যাশা ১৬ লাখের অধিক হলে করবেন বিক্রি। স্বভাবের কারণে নাম ‘শান্ত বাবু’। বড় শখ করে রাজশাহী পুঠিয়ার কান্দ্রা গ্রামের আলিমুদ্দিন গত তিন বছর ধরে পেলেপুষে বড় করেছেন সাদা-কালো মিশ্রণের ফিজিয়ান জাতের এই ষাঁড়টি। নাম শান্ত বাবু হলেও, তার পেট শান্ত রাখাই দায়।

প্রতিদিনের খাবারের তালিকায় ১৫ কেজি থাকে- সবুজ ঘাস, খড়, ভুট্টা ভাঙা, ভুসি, সরিষার খৈল, ধানের কুড়া, পাঁকা বিভিন্ন ফল ও লবণ- পানি পরিমাণ মতো।’ এতে ব্যয় হাজারো টাকা।

করোনা ও বন্যার কারণে বাজার মন্দা থাকায় গেল কোরবানির ইদে শান্ত বাবুকে বিক্রি করতে পারেন নি আলিমুদ্দিন। এক বছরে ২২ মণ থেকে বেড়ে ৩০ মণ ওজন হওয়া শান্ত’কে তিনি বিক্রি করতে চান ১৬ লাখের উপরে। এদিকে কোরবানির ইদের আর মাত্র দুই সপ্তাহ বাকি। গত মঙ্গলবার রাজশাহী থেকে প্রতিবেদক যায় পুঠিয়ার কান্দ্রা গ্রামে।

পুঠিয়া উপজেলা শহর থেকে আড়াই কিলোমিটার দূরে কান্দ্রা গ্রাম। তাই আলিমুদ্দিনের বাড়িতে পৌঁছাতে বেগ পেতে হলো না। বাড়ির ভেতরে ঢুকতেই বাঁ দিকে শান্ত বাবুর ঘর। সেদিন ছিল খুব গরম। আলিমুদ্দিনের স্ত্রী ও ছেলের বউ সীমা খাতুন পাইপের পানি দিয়ে ষাঁড়টির গা ধুয়ে দিচ্ছিলেন। আর শান্ত বাবু আরাম করে দাঁড়িয়ে ছিল। আলিমুদ্দিন মাঠে তাজা ঘাস কাটতে গিয়েছিলেন। ঘাস কেটে বেলা ১২ টার পরে তিনি আসেলন।

আলিমুদ্দিন বললেন, ‘আমার এই পৈতৃক ভিটা ছাড়া দুই বিঘা আবাদি জমি আছে। শান্ত বাবুকে পোষার জন্য জমিটা বন্ধক দিয়েছিলাম গত বছর। বাড়ির গরুর বাছুর, এ আমার ভালোবাসার ধন। আমার কষ্ট হলেও গত ইদে বিক্রি না করে আরো একটি বছর পুষেছি।

এ বছর বিক্রি করতে না পারলে আরো কয়েক বছর পুষতে বাঁধা নেই। কারণ তাকে আমি বাড়ির একজন সদস্য মনে করি। ’ সম্পূর্ণ দেশি খাবার খাইয়ে মাত্র ৪০ মাসে ৩০ মণ ওজনের করে তুলেছেন গরুর মালিক কৃষক আলিমুদ্দিন। উচ্চতা ৬ ফুট, দৈর্ঘ্য সাড়ে ৯ ফুট। দাম চাইছেন ২০ লাখ। তার কমবেশি হলেও বিক্রি করা হবে ‘শান্ত বাবুকে’।

আলিমুদ্দিন বলেন, ‘২০১৮ সালের এপ্রিলে বাড়ির দেশি গাভি জন্ম দেয় ফ্রিজিয়ান জাতের ‘শান্ত বাবু’কে। সরকারিভাবে দেশি গরুতে বিজ প্রদান করে জন্ম নেওয়া গরুটি দেখতে দেখতে হয়ে উঠেছে বিশালাকৃতির।’

২০২০ সালে কোরবানিতে গরুটি বিক্রি করবো বলার তার পর থেকেই প্রতিদিন বাড়িতে মানুষ ভিড় জমায়। তবে করোনার মহামারিতে দাম না পাওয়ায় বিক্রি করতে পারিনি। এ বছর বিক্রি করার সিদ্ধান্ত আছে। কয়েকজন দাম-দর করছে, আবার কেউ কেউ শুধু ছবি তুলতে ভিড় করছেন। আমি ২০ লক্ষ টাকা দাম চাইছি’। প্রাণিসম্পদ সম্প্রসারণ কর্মকর্তারা সেদিন এসে তার ওজন নির্ধারণ করেছেন ৩০ মণ।

সম্পূর্ণ দেশি খাবারে ৪০ মাসে ৩০ মণ ওজন হয়েছে জানিয়ে কৃষক আলিমুদ্দিন বলেন, ‘আমার গরু বড় করতে কোনো মোটাতাজাকরণের হরমোন ওষুধ, ইনজেকশন দেইনি। প্রতিদিন গরুটি ১২ থেকে ১৪ কেজি খাবার খায়। তার ভাষ্য ‘প্রতিদিন খাবারের পেছনে এক হাজার টাকা খরচ হয়। তিন বছরে প্রায় সাড়ে চার লাখ টাকার বেশি খরচ করেছি’ বলেন তিনি।

শান্ত বাবুর দাম প্রত্যাশায় আলিমুদ্দিন বলেন, করোনা মহামারির কারণে ‘আমি এখনও গরু রাজশাহী হাটে তুলিনি। স্থানীয় ব্যবসায়ী ও ক্রেতারা বাড়িতে এসে দাম-দর করছেন। শুনছি- করোনার জন্য বাজার একটু কম। কয়েকদিন আগে ঢাকার এক ক্রেতা ১০ লাখ পর্যন্ত দাম করেছেন। আর ক’দিন দেখবো।

রাজশাহী জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ইসমাইল হক বলেন, ‘শান্ত বাবু’ নামের গরুটি ফ্রিজিয়ান জাতের। আমি আমাদের পুঠিয়া উপজেলার কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলেছি। তারা খামারির বাড়ি গিয়ে কথা বলেছে। তারা সম্পূর্ণ দেশিয় খাবার খাইয়ে প্রাকৃতিক উপায়ে লালন-পালন করেছে গরুটিকে। তথ্যানুযায়ী- এবারের কোরবানির হাটে রাজশাহীর জেলার সব থেকে বড় ৩০ মণ ওজনের গরু এখনও পর্যন্ত ‘শান্ত বাবু’।

এদিকে করোনা সংক্রমনের পরিস্থিতি বিবেচনায় এবার পশুর হাটে জনসমাগম ঠেকাতে অনলাইনে পশু কেনা বেচায় সাধারণকে উদ্ধুদ্ধ করতে উদ্যোগী হয়েছে প্রশাসন।

এ বিষয়ে পুঠিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নুরুল হাই মোহাম্মদ আনাছ জানান, পুঠিয়া উপজেলার খামারিদের গরু ছাগল এর তথ্য, ছবি, ভিডিও যাতে অনলাইনের নির্দিষ্ট প্লাটর্ফমে থাকে, সেটি নিশ্চিতে স্বেচ্ছাসেবকদের সাহায্য নিচ্ছে প্রশাসন। গরুর হাট বসনো হবে কিনা তা প্রশাসনের জেলা প্রশাসক নিশ্চিত করলে তারা জানাবেন। উল্লেখ্য’ এবছর রাজশাহীতে কোরবানির জন্য প্রস্তুত প্রায় ১ লাখ ২৫ হাজার গবাদি পশু।

 

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
উপরে