মৃত্যুকালেও পাশে স্বজন পেলেন না আফসার

প্রকাশিত: জুলাই ৫, ২০২১; সময়: ১১:৪৭ pm |

নিজস্ব প্রতিবেদক : অসুস্থ হয়ে চার দিন ধরে নিজের বাসার বারান্দায় পড়েছিলেন ‘স্বজনহীন’ আফসার উদ্দিন। খবর পেয়ে উদ্ধার করতে গেলে তিনি বলেছিলেন, ‘আমাকে বিরক্ত করবেন না।’ আফসারকে তবু ‘বিরক্ত’ করেছিল রাজশাহী জেলা প্রশাসন। তাঁকে সুস্থ করে তুলতে ভর্তি করা হয়েছিল হাসপাতালে। এর ১০ দিন পর সোমবার সকাল সোয়া নয়টায় তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। এখন আর কেউ তাঁকে বিরক্ত করবে না।

রাজশাহী নগরের সাগরপাড়া মহল্লায় নিজ বাসায় ‘স্বজনহীন’ ৭০ বছর বয়সী আফসার উদ্দিন মানবেতর অবস্থায় ৪ দিন একাই পড়েছিলেন। প্রতিবেশীরা করোনা সন্দেহে তাঁর কাছ যেতে পারছিলেন না। এই চার দিন তিনি এক জায়গায় পড়ে থেকেই পায়খানা-প্রস্রাব করেছেন। গত ২৫ জুন বিকেলে প্রথম আলোর অনলাইন সংস্করণে ‘স্বজনহীন আফসার চার দিন ধরে একাই বাড়িতে পড়ে আছেন’ শিরোনামে একটি খবর প্রকাশিত হয়। এরপর রাজশাহী জেলা প্রশাসক মো. আবদুল জলিল তাঁকে উদ্ধারের উদ্যোগ নেন।

ওই দিন রাতেই পরিত্যক্ত অবস্থা থেকে উদ্ধার করে কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনের স্বেচ্ছাসেবীদের মাধ্যমে তাঁকে পবা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। এরপর পরীক্ষায় তাঁর করোনা পজিটিভ ধরা পড়ে। এরপর থেকে আফসার সেখানেই চিকিৎসাধীন ছিলেন।

পবা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা রাবেয়া বশরী জানান, তাঁর জন্য সারাক্ষণ একজন স্বজনের প্রয়োজন ছিল। হাসপাতালে ভর্তির তিন-চার দিন পর তাঁর ভাগনে পরিচয়ে একজন লোক আসেন। তিনি দুপুরের দিকে দূরে দাঁড়িয়ে একটু দেখে চলে যেতেন। তিনি কিছু ওষুধও কিনে দিয়েছিলেন, কিন্তু তাঁর শুশ্রূষার জন্য সারাক্ষণ একজন স্বজনের প্রয়োজন ছিল। তাঁকে বলা হয়েছিল কিন্তু তিনি থাকতে পারেননি। তিনি হয়তো দুঃসম্পর্কের আত্মীয়। দেখতে এসেছিলেন।

রাবেয়া বশরী বলেন, আফসার উদ্দিন নাক থেকে অক্সিজেনের নল সরিয়ে ফেলতেন। হাসপাতালের কর্মচারী দিয়ে এটা সারাক্ষণ পাহারা দেওয়ার সর্বাত্মক চেষ্টা করেছেন। তবে রাতের বেলায় একান্ত আপনজন কেউ না থাকলে এটা হয় না।

কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনের রাজশাহী বিভাগীয় পরিচালক কায়সার পারভেজ জানান, তাঁরা আফসার উদ্দিনের লাশ দাফনের সব প্রস্তুতি নিয়েছেন।

রাজশাহীর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মুহাম্মদ শরিফুল হক বলেন, তাঁরা মানবিক কারণে মানুষটিকে উদ্ধার করে চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছেন। তা ছাড়া ওই অবস্থায় পড়ে থাকলে সেদিনই মারা যেতেন, না হলে অনেক কষ্ট পেতেন। জীবিত থেকে তাঁকে পোকামাকড়ের সঙ্গে কাটাতে হতো।

আফসার উদ্দিনের কোনো স্বজন না থাকলেও তাঁর একতলা একটি বাড়ি রয়েছে। বাড়িটির ছাদ ঐতিহ্যবাহী কড়ি-বর্গা দিয়ে তৈরি। উঠানে পুরোনো একটি পামগাছসহ আরও নানা গাছ রয়েছে।

আফসার উদ্দিনের একান্ত প্রতিবেশী শেখ মো. রেজাউর রহমান জানান, অসুস্থ হওয়ার আগপর্যন্ত আফসার উদ্দিন প্রতিদিন মসজিদে নামাজ পড়তে যেতেন। চার দিন থেকে মসজিদে না দেখে তাঁরা বাসায় উঁকি দিয়ে তাঁকে বারান্দায় পড়ে থাকতে দেখেন। সে সময় পর্যন্ত তাঁর কোনো স্বজন খোঁজ নিতে আসেননি। এখন বাড়িটার দখল নিতে কোনো স্বজন আসেন কি না, সেটাই দেখার বিষয়।

তাঁকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়ার সময় রাজশাহীর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মুহাম্মদ শরিফুল হক বাসাটির দিকে নজর রাখার দায়িত্ব দিয়েছিলেন নগরের বোয়ালিয়া থানায় কর্তব্যরত পুলিশের উপপরিদর্শক মিজানুর রহমানকে। সূত্র- প্রথম আলো

  • 125
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
উপরে