রাজশাহী বিভাগে একদিনে করোনায় ১৮ জনের মৃত্যু

প্রকাশিত: জুন ২৩, ২০২১; সময়: ৭:৩২ pm |

নিজস্ব প্রতিবেদক : রাজশাহীতে আরও এক সপ্তাহ বাড়ানো হয়েছে সর্বাত্মক লকডাউন। চলবে আগামী ৩০ জুন রাত ১২টা পর্যন্ত। বুধবার রাজশাহী জেলা প্রশাসক আব্দুল জলিল সংবাদ সম্মেলন করে লকডাউন বাড়ানোর ঘোষণা দেন।

বিকেল সাড়ে ৩টায় জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। সংবাদ সম্মেলনে জেলা প্রশাসক বলেন, মঙ্গলবার সিটি মেয়রসহ প্রশাসন ও স্বাস্থ্য দপ্তরের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের জরুরী বৈঠক করা হয়েছে। সেই বৈঠকে রাজশাহীর করোনা পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে লকডাউন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। একই সঙ্গে সিটি করপোরেশন এলাকায় লকডাউনের পাশাপাশি উপজেলা এলাকায় বিধিনিষেধ বাড়ানোরও সিদ্ধান্ত হয় যেন মানুষ অতি জরুরী প্রয়োজন ছাড়া এলাকার বাইরে যেতে না পারে।

জেলা প্রশাসক বলেন, লকডাউনে সকল ধরণের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, শপিংমহল, মার্কেট, দোকান, রেস্টুরেন্ট বন্ধ থাকবে। তবে ওষধ, কাঁচাবাজার, চিকিৎসা সেবা ও সাংবাদিকদের সংবাদ সংগ্রহের কাজ লকডাউনের আওতা মুক্ত থাকবে। এছাড়াও লকডাউনের সময় বাস, ট্রেনসহ কোন প্রকার যানবাহন রাজশাহী নগরে প্রবেশ করতে পারবে না এবং রাজশাহী মহানগর হতে বাইরে যেতে পারবে না। তবে আমসহ কৃষি ও খাদ্য সামগ্রীবাহী পরিবাহন চলাচল করবো। জনসমাবেশ হয় এমন সব ধরণের সামাজিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠান বন্ধ থাকবে।

গত ঈদের পর থেকে রাজশাহীতে করোনার সংক্রমণ ও মৃত্যু বাড়তে থাকলে গত ১১ জুন সিটি করপোরেশন এলাকায় এক সপ্তাহের লকডাউন ঘোষণা করা হয়। এর পর গত ১৬ জুন সেটি আরেক সপ্তাহ বাড়িয়ে ২৪ জুন মধ্য রাত পর্যন্ত করা হয়। বুধবার আরেক দফা বাড়িয়ে আগামী ৩০ জুন মধ্য রাত পর্যন্ত করা হলো।

এদিকে, রাজশাহী বিভাগে মঙ্গলবার ৮টা থেকে বুধবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় করোনায় রেকর্ড ১৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। এটি এখন পর্যন্ত বিভাগে এক দিনে সর্বোচ্চ মৃত্যুর ঘটনা। এর আগের দিন মারা গিয়েছিলেন ১১ জন। তার আগে ১৫ জুন সর্বোচ্চ ১৪ জনের মৃত্যু হয়েছিল।

এ ছাড়া গত ২৪ ঘণ্টায় বিভাগে ৪ হাজার ৬৮৫ জনের নমুনা পরীক্ষা করে ৮৪৭ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে। শনাক্তের হার ১৮ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ। বুধবার দুপুরে রাজশাহী বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পাঠানো সহকারী পরিচালক নাজমা আক্তার স্বাক্ষরিত প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানা গেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজশাহী বিভাগে গত ২৪ ঘণ্টায় মারা যাওয়া ১৮ জনের মধ্যে রাজশাহী জেলার রয়েছেন ৫ জন। এটি এ জেলায় এক দিনে সর্বোচ্চ মৃত্যুর রেকর্ড। এ ছাড়া নওগাঁ ও বগুড়া জেলায় মারা গেছেন চারজন করে, নাটোর ও জয়পুরহাটে মারা গেছেন দুজন করে এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জে একজন মারা গেছেন।

এ নিয়ে বিভাগে করোনায় মোট মৃত্যুর সংখ্যা ৭৬৮। এর মধ্যে বগুড়া জেলায় সর্বোচ্চ ৩৫৫ জন মারা গেছেন। এ ছাড়া রাজশাহী জেলায় ১৩১, চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৯৬, নওগাঁয় ৬৮, নাটোরে ৪৫, জয়পুরহাটে ২৩, সিরাজগঞ্জে ২৮ ও পাবনায় ২২ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে জুন মাসের ২৩ দিনেই বিভাগে মারা গেছেন ২১০ জন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, ২৪ ঘণ্টায় নতুন শনাক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে রাজশাহী জেলায় রয়েছেন সর্বোচ্চ ৩৫২ জন। এ ছাড়া চাঁপাইনবাবগঞ্জে ১১১, নওগাঁয় ৫৩, নাটোরে ১০২, জয়পুরহাটে ৪৮, বগুড়ায় ৬২, সিরাজগঞ্জে ৩১ ও পাবনায় ৮৮ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে।

বিভাগের নমুনা পরীক্ষাগুলো আরটি-পিসিআর, র‌্যাপিড অ্যান্টিজেন ও জিন এক্সপার্ট-এই তিন পদ্ধতিতে করা হয়েছে। এর আগের দিন ৩ হাজার ৯১৩ জনের নমুনা পরীক্ষা করে ৭৬৩ জনের করোনা শনাক্ত হয়। শনাক্তের হার ছিল ১৯ দশমিক ৫ শতাংশ। গত ২৪ ঘণ্টায় বিভাগে শনাক্ত রোগী বাড়লেও শনাক্তের হার কিছুটা কমেছে। নতুন শনাক্ত রোগী নিয়ে বিভাগে মোট করোনা রোগীর সংখ্যা ৪৯ হাজার ৬৬৬।

রাজশাহী বিভাগে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হন গত বছরের ১২ এপ্রিল। এরপর গত বছরের ২৯ জুন শনাক্ত রোগীর সংখ্যা ৫ হাজার ছাড়ায়। এরপর ২০ জুলাই ১০ হাজার, ৪ আগস্ট ১৫ হাজার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০ হাজার, চলতি বছরের ২০ জানুয়ারি ২৫ হাজার, ১৯ এপ্রিল ৩০ হাজার, ঈদের পর ১৫ মে ৩২ হাজার, ৩০ মে ৩৫ হাজার, ৯ জুন ৪০ হাজার, ১৭ জুন ৪৫ হাজার, ১৯ জুন ৪৬ হাজার, ২০ জুন ৪৭ হাজার, ২১ জুন ৪৮ হাজার এবং সবশেষ আজ রোগীর সংখ্যা ৪৯ হাজার ছাড়াল। এর মধ্যে চলতি মাসের প্রথম ২৩ দিনেই ১৪ হাজার ব্যক্তি শনাক্ত হয়েছেন।

গত ২৪ ঘণ্টায় বিভাগে করোনা থেকে সুস্থ হয়েছেন ২৫৫ জন। আগের দিন সুস্থ হয়েছিলেন ২৫৯ জন। এ নিয়ে বিভাগে সুস্থ হলেন ৩৬ হাজার ৯০ জন। বর্তমানে বিভাগের ৮ জেলায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন ৪ হাজার ৯৯২ জন। এর মধ্যে গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ভর্তি হয়েছেন ১৭০ জন। আগের দিন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন ৬০ জন। বিভাগে হাসপাতালের বাইরে বাড়িতে চিকিৎসা নিচ্ছেন ৮ হাজার ৫৮৪ জন।

বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক নাজমা আক্তার বলেন, এবার করোনায় দিনমজুর, খেটে খাওয়া মানুষ বেশি মারা যাচ্ছেন। এই শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে স্বাস্থ্যসচেতনতা কম, এমনকি অনেকে টিকার জন্য নিবন্ধন করতেও আগ্রহী হননি। সীমান্তবর্তী এলাকার গ্রামের মানুষই ভারতে বেশি যাতায়াত করেছেন। ফলে আক্রান্ত হওয়ার হারও তাঁদের মধ্যে বেশি। সঙ্গে মৃত্যুর হারও বেড়েছে।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
উপরে