রাজশাহীতে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বাড়ছে কেন?

প্রকাশিত: মে ৩১, ২০২১; সময়: ৩:০১ pm |

নিজস্ব প্রতিবেদক : চাঁপাইনবাবগঞ্জের পর এখন রাজশাহী জেলায় করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ও মৃত্যু দ্রুত বাড়ছে। লকডাউন সত্ত্বেও চাপাইনবাবগঞ্জের মানুষের রাজশাহীতে যাতায়াত,ভারতীয় ধরনের কারণে কমিউনিটি ট্রান্সমিশন, রাজশাহীতে আমের বাজারে স্বাস্থ্যবিধি না মানা এবং সার্বিক ভাবে সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যবিধি মানতে অনীহার কারণে রাজশাহীতে সংক্রমণ দ্রুত বাড়ছে।

তবে রাজশাহীতে কোভিড মোকাবেলায় প্রস্তুতি যথেষ্ট নয়। এখনই রাজশাহীসহ সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে কঠোর লকডাউন না দিলে পরিস্থিতি ভয়াবহ হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

গত ২৪ ঘণ্টায় (রোববার সকাল ৮টা পর্যন্ত) রাজশাহীতে করোনাভাইরাস পজিটিভ শনাক্তের হার ছিল ৩৭ শতাংশ। একদিন আগে শনিবার যা ছিলো ২২ শতাংশ। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গত ২৪ ঘণ্টায় করোনা ও করোনার উপসর্গ নিয়ে ১২ জন মারা গেছেন, যা এখন পর্যন্ত জেলায় একদিনে সর্বোচ্চ মৃত্যু।

রাজশাহী জেলার কোভিড রোগীদের জন্য শুধু একটি হাসপাতাল রয়েছে। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কোভিড রোগীদের জন্য ২১৭টি জেনারেল বেড ও ১৫টি আইসিইউ বেড রয়েছে। রোববার (৩০ মে) রাজশাহী মেডিকেল কলেজে জেনারেল বেডে রোগী ছিলো ২০৪ জন ও আইসিউতে ১৫ জন। উপজেলা হাসপাতালগুলোতে কোভিড রোগীদের জন্য ১০০ বেড থাকলেও সেন্ট্রাল অক্সিজেন লাইন ও আইসিইউ নেই। তাই সেসব হাসপাতাল থেকেও রোগীরা রাজশাহী মেডিকেলে যায়।

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. শামীম ইয়াজদানী জানান, “প্রতিদিন যেভাবে রোগীর সংখ্যা লাফ দিয়ে বাড়ছে, তাতে দুই-একদিনের মধ্যেই শয্যার তুলনায় রোগী বেড়ে যাবে। বর্তমানে আইসিইউয়ের একটি বেডের জন্য ২৬ জন রোগী অপেক্ষায় রয়েছে। আরো দুটি আইসিইউ বেড বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। তবে যে হারে রোগী বাড়ছে, তাতে ৫০টি আইসিইউ বেড বাড়ালেও রোগী পরিস্থিতি মোকাবেলা করা কঠিন হবে।”

ডা. শামীম ইয়াজদানী বলেন, “সংক্রমণ বাড়লেও সীমান্তবর্তী জেলা হওয়ায় রাজশাহীর প্রতি গুরুত্ব কম দেওয়া হচ্ছে। এখনই রাজশাহীতে কঠোর লকডাউন দেওয়া প্রয়োজন। নাহলে পরিস্থিতি মোকাবেলা করা আমাদের জন্য কঠিন হয়ে যাবে। আমাদের কোভিড রোগীর পাশাপাশি নন-কোভিড রোগীদেরও চিকিৎসা সেবা দিতে হয়। এই মুহূর্তে আমাদের চিকিৎসকদের কাজের চাপ অনেক বেড়ে গেছে। রোগী আরো বাড়লে শয্যা সংকটের পাশাপাশি চিকি’সকদের ওপর প্রেসার আরো বাড়বে।”

এক সপ্তাহ আগেও রাজশাহী মেডিকেল কলেজে ভর্তি রোগীর মধ্যে চাপাইনবাবগঞ্জের রোগী ছিলো ৫০ শতাংশের বেশি। এখন রাজশাহীর রোগীও দ্রুত বাড়ছে।

রাজশাহী মেডিকেল কলেজের তথ্য বলছে, রোববার হাসপাতালে ভর্তি ২০৪ জন কোভিড রোগীর মধ্যে ৯৩ জন চাপাইনবাবগঞ্জের ও ৮৪ জন রাজশাহীর রোগী, বাকীরা পাশ্ববর্তী বিভিন্ন জেলার।

এব্যাপারে বাংলাদেশ সোসাইটি অব অ্যানেস্থিওলজিস্ট- এর মহাসচিব ও জুনিয়র কনসালটেন্ট এবং রাজশাহীর ক্রিটিক্যাল কেয়ার অ্যান্ড পেইন ইউনিটের চিকিৎসক খিজির হোসেন বলেন, “আমাদের হাসপাতালে কোভিড আক্রান্ত সন্দেহ করা হচ্ছে এমন রোগীর সংখ্যা ও মৃত্যু বেড়েছে। রাজশাহীর বানেশ্বরে বড় আমের হাট বসে। সেখানে স্বাস্থ্যবিধি না মেনেই বিপুল মানুষের সমাগম হয়। ভারতীয় ধরনের কমিউনিটি ট্রান্সমিশনের কারণেও রোগী বাড়তে পারে।”

এদিকে রোগী বাড়লেও রাজশাহীতে দিনে মাত্র ২০০টি স্যাম্পল টেস্ট করা হয়। লক্ষণ বা উপসর্গ ছাড়া কেউই করোনা টেস্ট করে না। তাই উপসর্গহীন রোগীরাও সংক্রমণ ছড়াচ্ছে বলে মনে করেন চিকিৎসকেরা।

করোনাভাইরাসের প্রথম ঢেউয়ে রাজশাহীতে সর্বোচ্চ কোভিড রোগী ছিলো ৯৮ জন। দ্বিতীয় ঢেউ চলাকালে এর আগে সর্বোচ্চ রোগী ছিলো ১৩৬ জন। আগে থেকে রোগী কম থাকায় মানুষের মধ্যে করোনা নিয়ে ভয় কমে যায়।

ডা. শামীম ইয়াজদানী বলেন, আগে সপ্তাহে দুই-তিনজন রোগী কোভিডে মারা যেতো, তাই মানুষের মধ্যে করোনার ভয়ও কম ছিলে। কিন্তু, গত ৫ দিনেই মারা গেছেন ৫০ জন। তারপরও স্বাস্থ্যবিধি মানতে অনীহা।

রাজশাহীর সিভিল সার্জন ডা. কাইউম তালুকদার বলেন, “উপজেলা পর্যায়ে টেস্ট আরো বাড়ানো হবে। অন্য জেলা থেকে রোগীরা রাজশাহীতে না আসলে, রাজশাহী মেডিকেলের ওপর চাপ কমতো। নাটোর, নওগাঁ, চাপাইনবাবগঞ্জের রোগীরাও রাজশাহী মেডিকেলে চিকিৎসা নেয়, তাই চাপ বাড়ছে। সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের লোকজন স্বাস্থ্যবিধি মানাতে কাজ করছে, কিন্তু মানুষ কথা শোনে না।”

এদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহামারি ও জনস্বাস্থ্য বিষয়ক কমিটি করোনাভাইরাস সংক্রমণ বাড়তে থাকায় দেশের আরও সাত জেলায় লকডাউন জারির সুপারিশ করেছে। জেলাগুলো হলো- রাজশাহী, নাটোর, নওগাঁ, সাতক্ষীরা, খুলনা, কুষ্টিয়া ও যশোর।

কমিটির সদস্য ডা. আবু জামিল ফয়সাল বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, “গত শনিবার সন্ধ্যার এই বৈঠকে এ সুপারিশ করা হয়। আমরা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কেবিনেট বিভাগের মাধ্যমে সুপারিশটি করেছি।”

তবে নতুন কোন জেলা লকডাউনের বিষয়ে এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক প্রফেসর খুরশীদ আলম।

জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন রোববার সাংবাদিকদেরকে বলেন, “সীমান্তবর্তী জেলাগুলোর উপর আমরা বিশেষ নজর রেখেছি, যদি সেখানে আমাদের নিয়ন্ত্রণ করতে হয়, ওই জায়গাগুলোতে চলাফেরার উপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে পারব। বিষয়গুলো আমরা পর্যবেক্ষণ করছি। আপাতত স্পষ্ট করে কিছু বলা যাচ্ছে না। পরিস্থিতি বুঝে আমরা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করব।” সূত্র-দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
উপরে