রাজশাহীতে কিস্তি আদায়ে এনজিও কর্মিদের হানা, বিপাকে চালকরা

প্রকাশিত: মে ৪, ২০২১; সময়: ৩:২৮ pm |

নিজস্ব প্রতিবেদক : রাজশাহীতে কিস্তি নিয়ে অনেক মানুষ কিনেছেন রিকশা বা অটোরিকশা। আবার কেউ কেউ নতুন করে কিনেছেন রিকশা-অটোরিকশার ব্যাটারি। প্রতি সপ্তাহে কিংবা মাসে তাঁদের কিস্তি দিতে হয়। এখন ‘সর্বাত্মক লকডাউন’ পরিস্থিতিতে রাজশাহীর এই রিকশা-অটোরিকশার চালকেরা কিস্তি দেয়া নিয়ে পড়েছেন চরম বেকায়দায়। তাদের সাথে সাথে বিভিন্ন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও পড়েছেন বেকায়দায়। লকডাউনে আয় কমায় অনেকে কিস্তি দিতে পারছেন না। এ নিয়ে নগরীর বিভিন্ন ওয়ার্ডে এনজিও’র লোকেরা বাড়িতে বাড়িয়ে এসে হাঙ্গামা করছে।

এদিকে গতবছর লকডাউনের সময় বেসরকারি সংস্থার (এনজিও) ঋণের কিস্তি আদায় নিয়ে নিষেধাজ্ঞা জারি করে নিয়ন্ত্রক সংস্থা মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি। কিন্তু এবার এক সপ্তাহের লকডাউন বেড়ে ১৬ মে পর্যন্ত হলেও এখন পর্যন্ত এনজিও’র কিস্তি শিথিল করা হয়নি। ফলে লকডাউনেও কিস্তি দিতে হচ্ছে। তবে জেলা প্রশাসন বলছে, জোর করে কিস্তি আদায় করতে এনজিওগুলোকে বারণ করা হয়েছে।

আর রিকশা-অটোরিকশা চালকেরা বলছেন, তাঁদের কিস্তি দিতেই হচ্ছে। তাই কিস্তির টাকা জোগাড় করতে এই লকডাউনের মধ্যেও রিকশা-অটোরিকশা নিয়ে নগরীর রাস্তায় বের হতে হচ্ছে। রাস্তায় এসে অবশ্য তাঁরা পড়েছেন পুলিশের বাঁধার মুখে। কখনও কখনও পুলিশ তাঁদের রিকশার চাকার বাতাস ছেড়ে দিয়েছে। যাত্রী নামিয়ে দেয়া হয়েছে। তারপরও বেকায়দায় পড়া চালকেরা শহরের রাস্তায় থাকছেন। তাঁরা বলছেন, খুব প্রয়োজনেই তাঁরা বের হয়েছেন। তবে কয়েকদিন থেকে যাত্রী নামিয়ে দেওয়া ও চাকার হাওয়া ছাড়ছে না পুলিশ।

গত মঙ্গলবার থেকে রোববার (২ মে) নগরীর বিভিন্ন পয়েন্টে কথা হয় অন্তত ১৫ জন রিকশা-অটোরিকশার চালকের সঙ্গে। তারা জানান, দু’একজন ছাড়া তাঁদের প্রত্যেকের কিস্তি আছে। বেশিরভাগই ঋণ নিয়েছেন বিভিন্ন এনজিও থেকে। চড়া সুদে কেউ কেউ ঋণ নিয়েছেন দাদন ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে। এই লকডাউনের মধ্যেও তাঁদের কিস্তি দিতে হচ্ছে। আর এ জন্যই তাঁরা রাস্তায় বের হচ্ছেন। কড়া লকডাউনে মোড়ে মোড়ে পুলিশ থাকার কারণে তাঁরা গলিপথ দিয়ে রিকশা-অটোরিকশা চালিয়েছেন। গত বুধবার সকালে নগরীর রেলগেট এলাকায় রিকশা নিয়ে বসে ছিলেন হাবিবুর রহমান (৩৭)।

তিনি জানালেন, নগরীর বিলশিমলা এলাকায় তাঁর বাড়ি। শহরে চিকন চাকার রিকশা চলাচল নিষিদ্ধ করা হলে একটি এনজিও থেকে ৫০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে তিনি মোটা চাকার রিকশা কেনেন। প্রতিসপ্তাহের রোববার তাঁকে কিস্তি দিতে হয়। গত রোববার দিয়েছেন। কিস্তি ঠিকই দিতে হচ্ছে।

হাবিবুর বলেন, এই লকডাউনে রাস্তায় বের হলে বিপদ, না বের হলে আরও বিপদ। এনজিও’র লোকেরা বাড়িতে এসে হাঙ্গামা করবে। তাই বাধ্য হয়েই রিকশা নিয়ে বের হচ্ছেন। রাজশাহী মহানগরীর পথেঘাটে অবশ্য এখন মানুষের চলাচল কম। লকডাউনের ভেতর রিকশায় যাত্রী বেশি পাওয়া যায় রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে।

গত মঙ্গলবার রাতে হাসপাতালের সামনে বসে ছিলেন শাহীন আলী (২৪)। তিনি জানালেন, তাঁর গ্রামের বাড়ি রাজশাহীর চারঘাট উপজেলায়। স্ত্রীকে নিয়ে তিনি থাকেন নগরীর সাধুর মোড় এলাকায়। পারিবারিক প্রয়োজনে তিনি দুটি এনজিও থেকে ২০ হাজার টাকা করে ঋণ নিয়েছেন। একটির কিস্তি দেয়া লাগে সপ্তাহে ৫০০ টাকা। অন্যটির কিস্তি মাসে দুই হাজার টাকা। লকডাউনের ভেতর তিনি ৫০০ টাকার কিস্তি দিয়েছেন। সামনে ৬ তারিখ মাসিক কিস্তি লাগবে। অটোরিকশার চালক মনির হোসেন (৫৫) জানালেন, স্ত্রী জাহানারা বেগমের চোখের অস্ত্রোপচারের জন্য তিনি ৫০ হাজার টাকা ঋণ নিয়েছিলেন। সপ্তাহে তাঁকে দেড় হাজার টাকা কিস্তি দিতে হয়।

মনির বলেন, গত বুধবার বাড়ি থেকে এনজিও মাস্টার কিস্তি নিয়ে গেছে। বলেছিলাম- লকডাউনের ভেতর কিস্তি দিব না। কিন্তু মাস্টার বলেছে- কিস্তি দিতেই হবে। মনির জানান, অটোরিকশা চালিয়ে আগে তিনি প্রতিদিন ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা আয় করতেন। এখন ৪০০ থেকে ৫০০ টাকায় নেমে এসেছে। এই দিয়েই সংসার চালাচ্ছেন, কিস্তিও চালাচ্ছেন।

মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটির উপপরিচালক (প্রশাসন শাখা) আবু বকার সিদ্দিক বলেন, গতবছর লকডাউনের সময় আমরা এনজিও’র কিস্তি আদায়ে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে সার্কুলার দিয়েছিলাম। এবার দেয়া হয়নি। এবার লকডাউনের ব্যাপারে সরকার যে প্রজ্ঞাপন দিয়েছে তাতে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখার কথা বলা হয়েছে। সে জন্য মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি পক্ষ থেকে আলাদা সার্কুলার দেয়া হয়নি। তাছাড়া স্থানীয়ভাবেই প্রশাসন বিষয়টা দেখতে পারে।

রাজশাহীর জেলা প্রশাসক আবদুল জলিল বলেন, এবার লকডাউনে কিস্তি আদায় করা যাবে না এ রকম কোনো সরকারি নির্দেশনা দেখিনি। তবে বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে আমরা স্থানীয়ভাবেই সকল এনজিওকে বলে দিয়েছি- লকডাউনের ভেতর জোর করে কিস্তি আদায় করা যাবে না। কেউ যদি স্বেচ্ছায় দেয় তাহলে সেটা নেয়া যাবে। কোনো এনজিও যদি জোর করে আর ভুক্তভোগী যদি আমাদের কাছে অভিযোগ করেন, তাহলে ওই এনজিও’র বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানান তিনি।

  • 1.1K
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
উপরে