রাবির সেই ক্যান্টনম্যান্টের পাশে এখনো মিলছে তাজা বিস্ফোরক!

প্রকাশিত: মে ১, ২০২১; সময়: ১২:০৩ am |

নিজস্ব প্রতিবেদক : রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বধ্যভূমি এলাকার পাশের একটি পুকুর থেকে দুইটি মর্টার শেল, একটি রকেট লাঞ্চার ও একটি মাইন উদ্ধার করেছে পুলিশ। শুক্রবার সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের বধ্যভূমি এলাকার খনন কাজ চলা পুকুরে মর্টার শেল সদৃশ একটি বস্তু দেখতে পায় এক যুবক। পরে তিনি ফাঁড়িতে খবর দিয়ে পুলিশ গিয়ে এগুলো উদ্ধার করে পুকুরের পাশেই একটি ফাঁকা জায়গায় ঘেরাও করে রাখে।

এর আগে গত ২৭ এপ্রিল একই স্থান থেকে একটি মর্টার শেল উদ্ধার করা হয়। পরদিন সেনাবাহিনীর বোমা নিস্ক্রিয়কারী দল গিয়ে সেই মর্টার শেলটির বিস্ফোরণ ঘটিয়ে নিস্ক্রিয় করে। বিকট শব্দে সেটির বিস্ফোরণ ঘটে। এই বোমাগুলো স্বাধীনতার যুদ্ধের সময়কার বলে ধারণা করা হচ্ছে।

মুক্তিযুদ্ধের গবেষকদের দেয়া তথ্যমতে, স্বাধীনতার যুদ্ধের সময় প্রায় তিন শতাধিক মর্টার শেল ও রকেট লাঞ্চারসহ বিভিন্ন ধরণের বোমা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) শহীদ শামসুজ্জোহা হলের সামনের পুকুরে আশেপাশে ডোবা জায়গায় ফেলে চলে যায় পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী। সেগুলোই বর্তমানে পুকুর খননের সময় পাওয়া যাচ্ছে।

জানা গেছে, স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ের শহীদ শামসুজ্জোহা হল পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীরা দখল করে এটিকে ক্যান্টনম্যান্ট বানিয়েছিলো। জোহা হল থেকেই তারা রাজশাহী অঞ্চলের নিরীহ বাঙালিদের ওপর অত্যাচার, নিপীড়ন ও হত্যাযজ্ঞ চালাতো। এমনকি জোহা হলে নিরীহ রাজশাহীবাসীকে ধরে এনে নির্মম নির্যাতন করে হত্যা করতো।

এছাড়া এই অঞ্চলের কিশোরী ও নারীদেরকেও ধরে এনে সম্ভ্রম হানি করে বিভিন্নভাবে নির্যাতন চালাতো। যুদ্ধের পর পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীরা চলে যাওয়ার সময় জোহা হলের পাশের পুকুরে ব্যাংক থেকে লুণ্ঠিত টাকা-পয়সা এবং বেশ কিছু মর্টার শেল ও রকেট লঞ্চার ফেলে যায়।

রাজশাহীর প্রবীণ সাংবাদিক ও মুক্তিযুদ্ধের গবেষক আহমেদ শফিউদ্দিন বলেন, যুদ্ধের সময় পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী জোহা হলকে ক্যান্টনম্যান্ট বানিয়েছিলো। আত্মসমর্পণ করে চলে যাওয়ার সময় তারা গোলা-বারুদ (মর্টারশেল, রকেট লাঞ্চার) ও অস্ত্র জোহা হলের সামনের পুকুরে ফেলে রেখে যায়। এর সঙ্গে কিছু টাকা পয়সাও ছিল। স্বাধীনতাযুদ্ধের কয়েকমাস পরে এই পুকুরে জেলেরা জাল ফেলে এসব টাকা-পয়সা ও অস্ত্র, গোলাবারুদের কিছুটা উদ্ধার করেছিলো।

তিনি বলেন, ওই সময় পুকুর থেকে অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধারের ঘটনার সংবাদ আমি করেছিলাম। পরীবর্তীতে বদ্ধভূমি থেকে একটি মানুষের মাথার খুলি ও একটি রকেট লাঞ্চার আমার সংরক্ষণে রেখেছিলাম। পরবর্তীতে ১৯৭৮ সালে যখন শহীদ স্মৃতি সংগ্রহশালা হলো তখন আমি এগুলো সেখানে জমা দিই। যা এখনো সেখানে সংরক্ষিত রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, ‘পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীরা নাটোরে গিয়ে আত্মসমর্পণ করে। এর আগে বেশ তাড়াহুড়ো করেই রাজশাহী ত্যাগ করে। যাওয়ার সময় তারা কিন্তু সব অস্ত্র নিয়ে যেতে পারেনি। শুধু মেশিনগান, রিভলবারসহ বড় বড় অস্ত্রগুলো নিয়ে যায়। কিন্তু মর্টারশেল ও রকেট লাঞ্চার তারা জোহা হলের সামনের পুকুর ও এর আশেপাশের নিচু জায়গায় ফেলে চলে যায়।

আমার ধারণা, প্রায় তিন শতাধিক মর্টাল শেল ও রকেট লাঞ্চার তারা ফেলে যায়। স্বাধীনতার যুদ্ধের পর রাবির এসব পুকুর খনন করা হয়নি বা এগুলো উদ্ধারের জন্য কোনো তৎপরতা চালানো হয়নি। সম্প্রতি এসব পুকুর খননের কাজ শুরু হওয়ায় এই মর্টার শেল ও রকেট লাঞ্চারগুলো মাটির নিচে থেকে আস্তে আস্তে উদ্ধার হচ্ছে।

রাবির প্রক্টর অধ্যাপক ড. মো. লুৎফর রহমান বলেন, ‘পুকুরে বা বিশ^বিদ্যালয় এলাকায় হয়তো এসব মর্টারশেল বা রকেট লাঞ্চার আরও রয়েছে। এগুলোর দ্বারা মানুষ যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সেজন্য এর স্থায়ী একটি সমাধানের জন্য আমি আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে মৌখিকভাবে জানিয়েছি। তারা লিখিতভাবে সামরিক বাহিনীর সংশ্লিষ্ট শাখায় একটি দরখাস্ত দিতে বলেছেন। আমরা সেটি দিবো।

তিনি আরও বলেন, উদ্ধার হওয়ার মর্টারশেল ও রকেট লাঞ্চারটি ঘেরাও করে পুলিশি পাহারায় রাখা হয়েছে। পূর্বের মতো বগুড়া থেকে সেনাবাহিনীর বোমা ডিসপোজাল ইউনিট এসে এগুলো নিষ্ক্রিয়করণে কাজ করবে।

মতিহার থানার ওসি সিদ্দিকুর রহমান বলেন, আমরা সেনাবাহিনীর বোমা ডিসপোজাল ইউনিটকে বিষয়টি জানিয়েছি। শনিবার তারা ঘটনাস্থলে এসে এগুলো নিষ্ক্রিয়করণে কাজ করবে।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
উপরে