বিয়ের ২৭ দিনের মাথায় স্ত্রীর হাতে স্বামী খুন

প্রকাশিত: এপ্রিল ১৫, ২০২১; সময়: ১১:৩২ pm |

নিজস্ব প্রতিবেদক : কিশোরী বধুর হাতে বিয়ের ২৭ দিনের মাথায় স্বামী হারুনুর রশিদ (১৮) খুন হয়েছে। মঙ্গলবার (১৩ এপ্রিল) দিবাগত রাতে রাজশাহীর মোহনপুর উপজেলার বিষহরা গ্রামে এ ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় পুলিশ মেয়েটিকে গ্রেপ্তার করেছে। তাঁর বিরুদ্ধে থানায় একটি হত্যা মামলা হয়েছে। নিহত যুবকের হারুনুর রশিদ ওই গ্রামের বয়জুল মণ্ডলের ছেলে।

স্বামীকে হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার গৃহবধূ বাবার বাড়ি একই উপজেলার ভীমনগর পালশা গ্রামে। স্থানীয় একটি মাদ্রাসায় অষ্টম শ্রেণিতে পড়াশোনা করত মেয়েটি।

ঘটনা সূত্রে জানান গেছে, গত ২৮ দিন আগে পারিবারিকভাবেই তাঁদের হারুনুর রশিদের সাথে বিয়ে বাল্য বিয়ে হয় ভীমনগর পালশা গ্রামে মাদ্রাসায় অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী নববধূর। এর ২৭ দিনের মাথায় খুন হয়েছেন তার স্বাস্ত্রীর হাতে হারুনুর। তাঁর কিশোরী বধূ স্বীকার করেছে যে, সে তাঁর স্বামীকে হত্যা করেছে। গত ১৯ মার্চ হারুনের সাথে তাঁর বিয়ে দেয়া হয়। বয়স কম বলে হারুনের গ্রামে ওই কিশোরীর খালার বাড়িতে বিয়ের আয়োজন করা হয়। স্থানীয় একজন কাজী বিয়ে পড়ান।

মোহনপুর থানায় পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, নিহত হারুনের লাশ পুলিশ ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠানোর ব্যবস্থা করছে থানা পুলিশ। থানার একটি কক্ষে বসিয়ে রাখা হয়েছিল খিটখিটে শারীরিক গঠনের মেয়েটিকে। পুলিশ তাঁর সঙ্গে কথা বলতে দেয়নি। তবে এই খুনের বিষয়ে মেয়েটি পুলিশকে স্বীকারোক্তি দিয়েছে বলে জানিয়েছেন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তৌহিদুর রহমান।

গ্রেপ্তারকৃত নববধূর বরাত দিয়ে ওসি জানান, এই বয়সে বিয়েতে তাঁর মত ছিল না। জোর করেই তাঁর বিয়ে দেয়া হয়। বিয়ের পর স্বামীর যৌন চাহিদা পূরণ করতে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ছিল সে। মঙ্গলবার রাতেও স্বামী তাঁর সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করতে চান। তখন মেয়েটি জানায়, তাঁর পিরিয়ড চলছে। কিন্তু স্বামী ছিলেন নাছোড়বান্দা। শারীরিক সম্পর্কে সম্মতি না দেয়ায় তিনি স্ত্রীর গায়ে হাত তোলেন। একপর্যায়ে মেয়েটি বলে- সে রাজি। কিন্তু সে যেভাবে চাইবে সেভাবে হবে। তাঁর স্বামীও রাজি হন। তখন মেয়েটি তাঁর স্বামীর দুই হাত বেঁধে ফেলে। এরপর পাটের রশি গলায় পেঁচিয়ে ধরে। আর এতেই দ্রুত তাঁর স্বামীর মৃত্যু হয়।

তিনি জানালেন, তাঁরও বাল্য বিয়ে হয়েছিল। এখন তাঁর বয়স হতে পারে ৩০ বা ৩১ বছর। তাঁর দুই মেয়ে। ১৪ বছরের বড় মেয়েটির বিয়ে দেয়া হয়েছিল। ছোট মেয়েটির বয়স তিন বছর।

গ্রেপ্তারকৃত নববধূর বাবা বলেন, করোনার কারণে মেয়েটা বাড়িতেই বসে ছিল। তাই তাঁর খালা বিয়ে লাগালেন। ছেলেটা ভাল, বাবার একমাত্র ছেলে। জায়গাজমি আছে, ঘরবাড়িও ভাল। এসব দেখে মেয়ে ভাল থাকবে ভেবে তিনি বিয়ে দিতে রাজি হন। বয়স কম বলে মেয়ের খালার বাড়িতে গিয়েই বিয়ের আয়োজন করা হয়। তাঁর মেয়ে খুন করতে পারে, এটা তিনি বিশ্বাস করতে পারছেন না। তবে মেয়েটির বাবা স্বীকার করেন, এই বয়সে মেয়ের বিয়ে দেয়াটাই ঠিক হয়নি। এখন বুঝতে পারছেন।

তিনি জানান, ১৯ মার্চ বিয়ের দিন তাঁর মেয়েকে শ্বশুরবাড়ি নিয়ে যাওয়া হয়। পরদিন শুধু মেয়েকে তাঁদের বাড়ি আনা হয়। এরপর হারুন তাঁর স্ত্রীকে নিয়ে গিয়েছিলেন। তখন শ্বশুরবাড়িতে মেয়েটি সাতদিন ছিল। এরপর গত শনিবার মেয়ে-জামাইকে ভীমনগরে আনা হয়। পরদিনই স্ত্রীকে নিয়ে বাড়ি যেতে চেয়েছিলেন হারুন। জোর করেই মেয়েটি আরও একদিন বাবার বাড়িতে থাকে। সোমবার বিকালে সে স্বামীর সঙ্গে শ্বশুরবাড়ি যায়। মঙ্গলবার সেহরির সময় মেয়েটির বাবার বাড়ির লোকজন হারুনের মৃত্যুর খবর পান। এরপরই তাঁরা হারুনের বাড়ি গিয়ে দেখেন, তাঁদের মেয়ে হারুনকে খুন করেছে বলে অভিযোগ তোলা হচ্ছে।

রাজশাহী কলেজের স্নাতক শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী সুমাইয়া বলেন, রাত ১টার দিকে তাঁর ভাইকে হত্যার ঘটনা ঘটেছে। রাত ৩টা পর্যন্ত হারুনের স্ত্রী লাশের সঙ্গেই ছিল। ৩টার দিকে সে শ্বাশুড়ির সঙ্গে সেহরি রান্না করতে আসে। রান্না শেষ হলে সে একাই খেতে বসে। তখন তাঁর শ্বাশুড়ি ছেলেকে ডাকতে বলেন। কিন্তু মেয়েটি যায়নি। তখন হারুনের মা তাঁকে ডাকতে যান। গিয়ে দেখেন, গরমের মধ্যে হারুনের শরীর কম্বল দিয়ে ঢাকা। কম্বল সরিয়ে দেখেন, হারুনের কোন সাড়াশব্দ নেই। এ সময় তাঁকে দ্রুত উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেয়া হয়। তখন চিকিৎসক জানান, অনেক আগেই তাঁর মৃত্যু হয়েছে। এরপর লাশ বাড়ি নেয়া হয়।

সুমাইয়া জানান, রাতে চিকিৎসক মৃত্যুর কারণ বুঝতে পারেননি। চিকিৎসক বলেছিলেন, হরুন স্ট্রোক করেছেন। কিন্তু বাড়ি আসার পর লাশের গলায় চিহ্ন দেখা যায়। এ সময় তাঁর স্ত্রী বলে, হারুন গলায় ফাঁস দিয়েছিল। কিন্তু এত বড় দেহ সে একা কীভাবে নামালো, কাউকে ডাকেনি কেন- এসব প্রশ্নের মুখে সে স্বীকার করে যে, গলায় পাটের দড়ি পেঁচিয়ে সে হত্যা করেছে। সুমাইয়া দাবি করেন, আগের দিনই মেয়েটি হাতের বালা আর নাকফুল খুলে ফেলেছিল। বাড়ি যাওয়ার জন্য ব্যাগও গুছিয়ে রেখেছিল। হত্যার বিষয় স্বীকার করায় পুলিশ তাকে থানায় নিয়ে যায়।

নিহত হারুনের ভগ্নিপতি কামাল হোসেন প্রামানিক বললেন, মেয়ের বয়স তো ছিল কম। আগেই এই বিয়ে দিতে নিষেধ করেছিলাম। কেউ তো শোনেনি। শিক্ষা না হলে কেউ শেখে না। এই তো একটা শিক্ষা হয়ে গেল! এখন যদি এই পরিণতি দেখে গ্রামের সবাই শিক্ষা নেয়!

মোহনপুর থানার ওসি তৌহিদুর রহমান বলেন, স্বামীর হাতে যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েই এ হত্যাকাণ্ড। মেয়েটির চেয়ে ছেলের শারীরিক গঠন দ্বিগুণ। তারপরও সে স্বামীকে হত্যা করতে পেরেছে বলে স্বীকারোক্তি দিয়েছে। বিকালে আদালতে তোলা হলে সে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দীও দিয়েছে। পরে আদালত তাঁকে কারাগারে পাঠিয়েছেন। এর আগে নিহত হারুনের বাবা মেয়েটির বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করেন বলেও জানান পুলিশের এই কর্মকর্তা।

  • 238
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
উপরে