রাজশাহীতে রুক্ষ প্রকৃতি বিতৃষ্ণ মন

প্রকাশিত: এপ্রিল ১৫, ২০২১; সময়: ১১:১৯ pm |

আসাদুজ্জামান নূর : পবিত্র রমজানের রোজা রেখেছেন সজিবুল ইসলাম হৃদয়। রমজান এলেই মনের মাঝে বাড়তি উৎসাহ-উদ্দীপনা কাজ করে। সেহেরি, ইফতার, নামাজসহ রমজানের রীতিনীতি পালনে প্রাণবন্ত থাকেন বাইশ বসন্তের এই যুবক। কিন্তু এ বছর সেই উচ্ছ্বাস যেন প্রকৃতিতে মিলিয়ে গেছে। রাজশাহীর প্রকৃতির রুক্ষতায় ম্লান হয়ে গেছে রমজানের আনন্দ।

হৃদয় জানান, বাড়ি সিরাজগঞ্জ হলেও লেখাপড়ার সুবাদে রাজশাহী নগরীতে থাকেন। প্রতিবছরই আগ্রহ ও নিষ্ঠার সাথে রোজা পালন করেন। কিন্তু এবছর রাজশাহীতে বহমান তীব্র তাপমাত্রায় তার কর্মদ্যোমে ভাটা পড়েছে। কোন কিছুতেই যেন মন বসছে না।

হৃদয় বলেন, এর আগেও গরমের মধ্যে রোজা পালন করেছি। কিন্তু মন এত চঞ্চল ছিল না। মনের মধ্যে একটা কথাই বারবার ঘুরপাক খাচ্ছে- ভাল লাগছে না। সত্যিই কিছুই ভাল লাগছে না। শারীরিক কোন ক্লান্তি নেই। তবুও প্রকৃতির শুষ্কতায় শান্তি পাচ্ছি না। মনে হচ্ছে কোথাও প্রশান্তি নেই।

রাজশাহীতে চলমান দাবদাহে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠেছে। হৃদয়ের মতই আবহাওয়া প্রতিকূলতায় ভূগছেন সাধারণ মানুষ। কথা হয় নগরীর উপশহর মোড়ের বাসিন্দা মো. রিপন আলীর সঙ্গে। তিনি বলেন, আবহাওয়ার সাথে শরীর মনে হচ্ছে মানিয়ে নিতে পারছে না। গরমের সাথে সাথে এক ধরণের ক্লান্তি ও বিষন্নতা যেন প্রকৃতিতেই ছড়িয়ে আছে। ফলে কোন কিছুতেই মন বসছেনা। ইবাদত-বন্দেগীতেও মন বসছে না।

রাজশাহী আবহাওয়া অফিসের সিনিয়র অবজার্ভার এস.এম রেজওয়ানুল জানান, বুধবার রাজশাহীতে সর্বোচ্চ তাপামাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে। এদিন তাপমাত্রার পারদ ৪০ ছুঁইছুঁই ছিল। ওই সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ৩৯ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এছাড়া ধারাবাহিকভাবে বেশ চড়া তাপমাত্রা বিরাজ করছে রাজশাহীতে।

রাজশাহী আবহাওয়া অফিসসূত্রে জানা গেছে, রাজশাহীতে গত বৃহস্পতিবার ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস, বুধবার ৩৯ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস, মঙ্গলবার ৩৯ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস, সোমবার ৩৬ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস, রোববার ৩৮ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস, শনিবার ৩৭ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস ও শুক্রবার ৩৫ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়।
তীব্র এ তাপমাত্রায় বিবর্ণ হয়ে উঠেছে রাজশাহীর সবুজ প্রকৃতি! রুক্ষ আবহাওয়ায় গাছের পাতাও যেন নড়ছে না। দাবদাহে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠেছে। একটু বৃষ্টি ও শীতল হাওয়ার পরশ পেতে সাধারণ মানুষ যেন ব্যাকুল হয়ে উঠে উঠেছে। কিন্তু বৃষ্টির দেখা নেই।

আবহাওয়া অফিস বলছে, এটি মাঝারি তাপপ্রবাহ। ফলে বৃষ্টির জন্য হাহাকার পড়ে গেছে রাজশাহীতে। কয়েক দিনের টানা দাবদাহে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জনজীবন। অসহনীয় গরমে হাঁসফাঁস করছে প্রাণীকূল। সারাদিন আগুন ঝরা রোদ আর প্রচণ্ড গরমে স্থবিরতা নেমে এসেছে কর্মজীবনেও। বাসা, অফিস কিংবা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান সবখানেই যেন গরম আর গরম। একটু স্বস্তি মিলছে না কোথাও।

মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, রুক্ষ আবহাওয়া মানুষের অস্বস্তির কারন হয়ে দাঁড়াতে পারে। রাজশাহী কলেজের মনোবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক ও কাউন্সেলিং সাইকোলজিস্ট মো. আজমত আলী বলেন, রুক্ষ আবহাওয়া মানুষের মনে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করতে পারে। আবহাওয়ার সঙ্গে মানুষের মনস্ক্রিয়ার একটা সুক্ষ্ম যোগসূত্র রয়েছে। চলমান আবহাওয়া মানুষকে অস্থির ও চঞ্চল করতে সক্ষম।

এদিকে, তীব্র দাবদাহের কারণে করোনার মধ্যে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে বেড়েছে ডায়রিয়াসহ নানা রোগ-বালাইয়ে আক্রান্ত রোগীদের সংখ্যা। গরমজনিত কারনে অতিরিক্ত রোগীর চিকিৎসা দিতেও হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসকরা।

হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. সাইফুল ফেরদৌস জানান, রাজশাহীর তাপমাত্রা কেবলই বাড়ছে। এতে করোনার মধ্যে ঘরে ঘরে আবার ডায়রিয়া, হিটস্ট্রোক, হিস্টিরিয়া, জ্বর, সর্দি-কাশিসহ বিভিন্ন উপসর্গে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। এসব রোগে বৃদ্ধ ও শিশুরাই বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। পাশাপাশি উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্তদের দুর্ভোগ বেড়েছে এ তীব্র গরমে।

চলমান আবহাওয়ায় করনীয় বিষয়ে তিনি বলেন, এই সময় বৃদ্ধ ও শিশুদের রোদে না বের হয়ে ঠান্ডা পরিবেশের মধ্যে থাকা শ্রেয়। এছাড়াও বিশুদ্ধ পানি, ডাব ও দেশি ফলমূল বেশি খাওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
উপরে