গ্রামোফোন রেকর্ডের জীবন্ত জাদুঘর রাজশাহীর ইকবাল মতিন

প্রকাশিত: এপ্রিল ৭, ২০২১; সময়: ২:৪৪ pm |

নিজস্ব প্রতিবেদক : রাজশাহীর ইকবাল মতিনের সংগ্রহে আছে বাংলা গানের প্রথম রেকর্ডসহ আট হাজার দুর্লভ গ্রামোফোন রেকর্ড ও নয়টি গ্রামোফোন যন্ত্র। এর মধ্যে দেড় হাজারের অধিক গ্রামোফোন রেকর্ডের বয়স ১০০ বছরের বেশি। সংগৃহিত নয়টি গ্রামোফোন যন্ত্রও ১০০ বছরের পুরনো।

তার রাজশাহী মহানগরীর সাগরপারড়ার নিজ বাড়িতেই তিনি গড়ে তুলেছেন গ্রামোফোন রেকর্ডের সংগ্রহশালা। শুধু রেকর্ড সংগ্রহ করেই থেমে থাকেননি তিনি। অনর্গল বলে যেতে পারেন তার ইতিহাস -ঐতিহ্য ও রেকর্ড ধারণ করার প্রেক্ষাপট। এইজন্য ইকবাল মতিনকে বলা হয় গ্রামোফোন রেকর্ডের জীবন্ত জাদুঘর। বর্তমানে তার সংগ্রহে রয়েছে উচাঙ্গ কণ্ঠ ও যন্ত্রসঙ্গীত, বাংলা গান, অভিনয়, বক্তৃতার দুর্লভ আট হাজার গ্রামোফোন রেকর্ড।সংগ্রহ করার পাশাপাশি এসব রেকর্ড সংরক্ষণ ও যত্ন নেওয়ার কাজটিও তিনি করে থাকেন।

ইকবাল মতিন জানান, খুব ছোটবেলা থেকেই তার গানের প্রতি ছিলো ঝোঁক। ছোটবেলা থেকেই বেহালা বাজাতেন তিনি।বেহালা বাজাতে গিয়েই বড় বড় ওস্তাদদের জীবনী পড়তে শুরু করেন তিনি।আর এসব পড়তে গিয়েই তিনি বড় বড় শিল্পীদের জীবনের অনেক মজার মজার তথ্য পান।শিল্পীদের জীবনী পড়তে গিয়েই তখন তার শোনবার ও সেসব সংগ্রহে রাখবার শখ তৈরি হয়।আর শখ থেকেই তার গ্রামোফোন রেকর্ডের প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়। তবে প্রখ্যাত সংগীতজ্ঞ ও সংগীতবোদ্ধা দিলীপ কুমার রায়ের লেখা ভ্রাম্যমাণের দিনপঞ্জিকা নামের একটি দুর্লভ গ্রন্থ পড়ে গ্রামোফোন রেকর্ড সংগ্রহে তার প্রবল আকর্ষণ তৈরি হয়।তার বয়স যখন মাত্র ১৩ বছর তখন নওগাঁর কাশিমপুরের জমিদার শরৎ কুমার মৈত্র তার গানের প্রতি দুর্নিবার আর্কষণ দেখে বইটি উপহার দেন তাকে। এই বই তাকে সেই সময়ের প্রখ্যাত শিল্পীদের দুর্লভ রেকর্ড ও এ-সংক্রান্ত ঐতিহাসিক তথ্যসমৃদ্ধ বইপুস্তক সংগ্রহের প্রতি নেশা ধরিয়ে দেয়।

তবে রেকর্ড সংগ্রহ এত সহজ ছিলো না।এইজন্য তাকে অনেক শ্রম-ঘাম ও সময় দিতে হয়েছে।ব্যয় করতে হয়েছে অর্থও। গড়ে তুলতে হয়েছে বিশ্বব্যাপী নেটওয়ার্ক।রেকর্ড সংগ্রহ একটা নেশার মতো হয়ে দাঁড়ায় তার।

ইকবাল মতিন জানান, ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, থাইল্যান্ডসহ নানা দেশ থেকে গ্রামোফোন রেকর্ড সংগ্রহ করেছেন তিনি। একটা নেটওয়ার্কই ছিলো, যাদের বলা ছিলো কোথাও কোনো পুরাতন কিছু পেলে যেন সঙ্গে সঙ্গে খবর দেওয়া হয়।রেকর্ড সংগ্রহের জন্য জমিদার বাড়িতেও ছুটে যেতে হয়েছে তাকে।

ইকবাল মতিনের কাছে ৭৮ (রেভুলেশন পার মিনিট) আরপিএম ৩ ইঞ্চি থেকে শুরু করে ১৬ ইঞ্চি পর্যন্ত নানা সাইজের গ্রামোফোন রেকর্ড আছে তার কাছে। ভারতবর্ষে ৭৮ আরপিএম গ্রামোফোন রেকর্ডে প্রথম গান ধারণ করা হয় ১৯০২ সালের ৮ নভেম্বর যা কলের গান নামে পরিচিত। তখন কলকাতায় রেকর্ড করে জার্মানির হ্যানোভার থেকে সেগুলো প্রিন্ট করে ১৯০৩ সালে এপ্রিল মাসে যা বাজারে আসে। সেই ১৯০৩ সাল থেকে শুরু করে ১৯৩০-এর দশক পর্যন্ত আট হাজার গ্রামোফোন রেকর্ড তিনি সংগ্রহ করেছেন। এর মধ্যে ১০০ বছরের পুরোনো, অর্থাৎ ১৯১২ সালের আগে ধারণকৃত রেকর্ডের সংখ্যা দেড় হাজারের বেশি। এসব সবই অক্ষত রয়েছে। এখনো গ্রামোফোনে রেকর্ড চাপিয়ে তাতে চাবি দিলেই শত বছর আগের সুর বেজে উঠে।

ইকবাল মতিনের সংগ্রহে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম, রজনীকান্ত সেন, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, অতুলপ্রসাদ সেনের স্বকণ্ঠে গাওয়া গানের রেকর্ডসহ রাজা পঞ্চম জর্জ, রাণী মেরী, রাজা অষ্টম এডওয়ার্ড, মহাত্ম গান্ধী, নেতাজি সুভাষ বসু ও লর্ড মাউন্ড ব্যাটনের ভাষণও রয়েছে। রয়েছে ১৮৭০, ৮০, ৯০ এর দশকের এবং ১৯০০ এর প্রথম দিকে রঙ্গমঞ্চে যেসব নাট্যশিল্পী অভিনয় করে মঞ্চ কাঁপাতেন তাদের মধ্যে যেমন অর্ধেন্দু, শেখর, মুস্তাফি, দানী বাবু, কুঞ্জলাল চক্রবর্তী, তারা সুন্দরী, কুসুমকুমারী, নরী সুন্দরী, নীহারবালা প্রভৃতি নাট্যশিল্পীদের নাটকের অভিনয়ের রেকর্ডও আছে।তাদের রেকর্ডগুলো ১৯০৩ থেকে ১৯১০ সালের মধ্যে করা হয়। ভারতবর্ষে ১৯০২ সালের ৮ নভেম্বর গ্রামোফোনে সর্বপ্রথম রেকর্ডকৃত কলকাতার ক্ল্যাসিক থিয়েটারের দুই নৃত্যশিল্পী শশীমুখী ও ফণীবালার গানও রয়েছে তার সংগৃহে।

আবার ১০০ আরপিএমর শ’খানেক প্যাথে রেকর্ডও আছে তার এই রেকর্ড বাজানোর একটি গ্রামোফোন যন্ত্রও আছে তার।এই মেশিন হ্যাঙ্গেরী থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে। প্যাথে রেকর্ড শুধুমাত্র বেলজিয়াম আর জার্মানীতে পাওয়া যেত। প্যাথে রেকর্ডে পিন ভেতর থেকে ঢুকে বাইরে আসে আর ডিস্ক রেকর্ডে বাইরে থেকে ভেতরে ঢুকে।

ইকবাল মতিন জানান, ১৮৭৭ সালে টমাস আলভা এডিসন ফোনোগ্রাফ নামের একটি যন্ত্র আবিষ্কার করেন। সেখানে সিলিন্ডার রেকর্ড বাজানো যেত।তারই ধারাবাহিকতায় ১৮৮৭ সালে বার্লিনার নামের একজন ডিস্ক রেকর্ড আবিষ্কার করেন।কারণ সিলিন্ডার রেকরর্ডের কম্প্রেসার টিক ছিলো না।পরে এডিসনও ডিস্ক রেকডেই ফিরে আসেন।তার কোম্পানি থেকে রেকর্ড বের করা হয়। সেই কোম্পানির ৯৯টি রেকর্ড আছে তার কাছে।

ইকবাল মতিন জানান, গ্রামোফোন রেকর্ড সেসময় শুধুমাত্র ইংল্যান্ড, জার্মানী, আমেরিকা ও ভারতেই বের হতো। ভারতে হতো কারণ সেসময় ইংরেজ দেশ শাসন করতো আর গ্রামোফোন রেকর্ড তৈরির কাঁচামাল সেলাক বা লাক্ষা বার্মাতে পাওয়া যেত।গ্রামোফোন রেকর্ডের ব্যবসার ক্ষেত্র হিসেবেও তারা ভারতকে তারা বেছে নিয়েছিলেন।সেইজন্য রেকর্ডগুলো ভারতে বের হতো।তবে তার কাছে ব্যতিক্রমি পিচ রেকর্ড, অ্যালুমিনিয়াম ও প্লাস্টিকের রেকর্ডও সংগ্রহে আছে।

রেকর্ড সংগ্রহ করার পাশাপাশি রেকর্ডগুলোর যত্নও নেন ইকবাল মতিন। তিনি জানান, শুধুমাত্র হাত থেকে পড়ে ভেঙে গেলেই রেকর্ডগুলো নষ্ট হয়। এছাড়া রেকর্ডগুলো নষ্ট হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। কারণ এগুলো ভিনাইল বা প্লাস্টিকের রেকর্ড না। তবে রেকর্ডে স্ক্র্যাচ বা দাগ পড়লে নষ্ট হয়ে যেতে পারে। তবে আমার ক্ষেত্রে তা কখনোই ঘটেনি। আর রেকর্ডের খাঁজে ময়লা পড়লেও তখন রেকর্ড না-ও বাজতে পারে। সেক্ষেত্রে শ্যাম্পু পানি দিয়ে রেকর্ড পরিষ্কার করতে হয়।

শুধু দুর্লভ রেকর্ড সংগ্রহ করাই ইকবাল মতিনের নেশা নয়; এই রেকর্ডগুলো কখন, কোথায়, কীভাবে করা হয়েছে, তার চমৎকার ইতিহাস মুখে মুখে বলে যেতে পারেন ইকবাল মতিন। তা থেকে সাল, তারিখ, শিল্পীর বয়স, বাপ-দাদার পরিচয় কিছুই বাদ যায় না। অবাক করা বিষয়, এসব বলতে এক সেকেন্ডের জন্যও তাঁকে স্মৃতি হাতড়াতে হয় না।তবে এই রেকর্ডগুলো সংরক্ষণ করার বিষয়ে চিন্তিত তিনি।তার অনুপস্থিতে রেকর্ডগুলো কীভাবে সংরক্ষিত হবে তা তার জানা নেই।

ইকবাল মতিন আক্ষেপ করে বলেন, আমি যদি রেকর্ডগুলো বিটিভি বা আর্কাইভকে সংরক্ষণের জন্য দিই তাহলে তারা তো তার মর্ম বুঝবে না।ফলে এসব কীভাবে সংরক্ষিত হবে তা জানা নেই।

রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়-রুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও সাবেক বিভাগীয় প্রধান ইকবাল মতিন একাধারে শৌখিন সংগীতশিল্পী, সমালোচক, গবেষক এবং অত্যন্ত জনপ্রিয় বেহালাবাদক। দেশে-বিদেশের বহু মঞ্চে বেহালা বাজিয়ে দর্শক-শ্রোতাদের প্রশংসাও কুড়িয়েছেন তিনি। রাজশাহী নগরের সাগরপাড়ার স্থায়ী বাসিন্দা ইকবাল মতিনের জন্ম ১৯৫৬ সালে। প্রকৌশল, ভূগোল, নদীবিজ্ঞান, ভূমিরূপবিদ্যা এবং সাধারণ জ্ঞানের ওপর তাঁর একক ও যৌথভাবে লেখা বেশ কয়েকটি বই বাংলাদেশ ও ভারত থেকে প্রকাশিত হয়েছে।

  • 117
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
উপরে