উচ্চ সংক্রমণের ঝুঁকিপূর্ণূ জেলার মধ্যে রাজশাহী ১৭

প্রকাশিত: এপ্রিল ৩, ২০২১; সময়: ১০:২৫ am |

তারেক মাহমুদ : প্রতিদিনই বাড়ছে করোনাভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা। দেশের ৩১টি জেলা করোনাভাইরাসের উচ্চ সংক্রমণের ঝুঁকিতে এখন রাজশাহী ১৭ নম্বর ঝুঁকিতে রয়েছে বলে জানিয়েছে রাজশাহী সিভিল সার্জন ও স্বাস্থ্য পরিচালক অফিস। ৩১ জেলায় সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়েছে। এক সপ্তাহ সংক্রমণের উচ্চ ঝুঁঁকিতে থাকা জেলা গুলোর মধ্যে রাজশাহীর রাজশাহী জেলা, বগুড়া জেলা, নওগাঁ ও নাটোর রয়েছে। তবে সবচেয়ে বেশি ঝুঁঁকিতে রয়েছে রাজশাহী বগুড়া জেলা। কারণ হিসিবে বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন এই দুই জেলায় বিভিন্ন কলকারখানা ও সরকারি বে-সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থাকায় দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ প্রতিনিয়ত যাতায়াত করছে। এছাড়াও ইন্ডিয়ায় বিভিন্ন কাজে এই দুই জেলার মানুষ বেশি যাচ্ছে। এছাড়াও স্বাস্থ্যবিধি মানতে অসচেতন থাকায় এভাবেই সংক্রামণ দ্রুত ছড়িয়েছে। সকল জেলায় এক সপ্তাহে নমুনা পরীক্ষা করে যত শনাক্ত হয় সেই শনাক্তের হার অনুযায়ী তালিকা তৈরি করা হয়েছে।

এদিকে করোনার প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে সচেতনতামূলক কর্মসূচি পালন করেছেন রাজশাহী জেলা প্রশাসন ও মেট্রোপলিটন পুলিশসহ (আরএমপি) পুলিশের সব ইউনিটের সদস্যরা। মাঠে দাঁড়িয়ে হাসিমুখে মাস্ক বিতরণ করতে দেখা গেছে তাদের। এরমধ্যে গত প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে করোনার প্রাদুর্ভাব বেড়ে যাওয়ায় বিদ্যমান পরিস্থিতি বিবেচনায় গত সোমবার নতুন করে ১৮ দফা নির্দেশনা দিয়েছে সরকার। আবার মহামারী করোনার সংক্রমণ ও মৃত্যু বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ১২ দফা সুপারিশ করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। সরকারের এমন নির্দেশনার পর করোনাভাইরাসের প্রতিরোধে আবারও মাঠে নেমেছে পুলিশ ও জেলা প্রশাসন। করোনা ঠেকানোর নতুন নতুন পরিকল্পনায় কাজ করছে তারা।

রাজশাহী জেলাতে শুধু রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেই করোনার সকল কার্যক্রম চলছে। আর উপজেলা গুলোতে উপসর্গ নিয়ে রোগীদের চিকিৎসা চলছে। করোনা ইউনিটের জন্য ২৯ ও ৩০ নম্বর ওয়ার্ডের পর নতুন করে ২৫ ও ২৭ নম্বর ওয়ার্ড যুক্ত করা হয়েছে। এখন হাসপাতালের চারটি ওয়ার্ড, ১০ টি কেবিন ও ১০ টি আইসিইউ প্রস্তুত রয়েছে। করোনার নমুনা হাসপাতালে দেওয়ার পর তা মেডিকেল কলেজ ল্যাবে পরীক্ষা করা হচ্ছে। গত দুই সপ্তাহ আগে যেখানে নমুনা পরীক্ষা করাতো ৮০ জনের নিচে। আর করোনা রোগী ও উপসর্গ মিলে মোট ১৫ থেকে ১৭ ভর্তি ছিলো। এখন ৩০০ জনের মতো নমুনা সংগ্রহ করা হচ্ছে। আর নতুন ভাবে করোনা শসাক্ত ও উপসর্গ মিলে ৭০ জনের অধিক রোগীর চিকিৎসা চলছে।

গত বৃহস্পতিবার করোনা রোগী ও উপসর্গ নিয়ে ভর্তি ছিলো ৬৮ জন। গতকাল শুক্রবার ৬০ জন। রোগী বাড়ার সাথে সাথে হাসপাতালের অন্য ওয়ার্ড গুলো এখন করোনা রোগীদের সেবার জন্য নেওয়া হচ্ছে। তাই নরমাল অপারেশন ও ছোট ছোট সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে মানুষ। করোনার প্রথম অবস্থায় হাসপাতালে মোট রোগী ছিলো ১০০ জনের অধিক। করোনার দ্বিতীয় সময়ে সর্বচ্চ রোগী ছিলো ৫৮ জন ও বর্তমানে তৃতীয় ধাক্কায় শনাক্ত রোগী থাকছে ৪০ জনের মতো। তবে এই সংখ্যা আরো বাড়বে বলে জানাচ্ছে বিশেষজ্ঞরা।

গত কয়েকদিন থেকে রামেক হাসপাতালে ১০ টি আইসিইউ ও ১০ টি কেবিনের রোগী পরিপূর্ণ হয়ে গেছে। নতুন করে যুক্ত করা হয়েছে ২৫ ও ২৭ নম্বর ওয়ার্ড। সংক্রামণ বাড়লে আরো কয়েকটি ওয়ার্ড নেওয়া হবে। এদিকে রাজশাহী বিভাগে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে আরও দুইজনের মৃত্যু হয়েছে। বৃহস্পতিবার বিভাগের নাটোর ও বগুড়ায় একজন করে এ দুইজনের মৃত্যু হয়। শুক্রবার বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয়ের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, বিভাগের আট জেলায় এ পর্যন্ত ৪১৩ জনের মৃত্যু হলো করোনায়। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ২৬৪ জনের মৃত্যু হয়েছে বগুড়ায়। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৫৬ জনের মৃত্যু হয়েছে রাজশাহীতে। এছাড়া চাঁপাইনবাবগঞ্জে ১৪ জন, নওগাঁয় ২৬ জন, নাটোরে ১৪জন, জয়পুরহাটে ১০ জন, সিরাজগঞ্জে ১৮ জন এবং পাবনায় ১১ জনের মৃত্যু হয়েছে। বৃহস্পতিবার বিভাগে নতুন ৯৯ জন করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছেন । এ দিন সুস্থ হয়েছেন ১৫ জন। বিভাগে এখন মোট আক্রান্তের সংখ্যা ২৭ হাজার ছয়জন। এদের মধ্যে ২৪ হাজার ৮০৫ জন সুস্থ হয়েছেন। বিভাগে এ পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন তিন হাজার ১১৪ জন কোভিড-১৯ রোগী।

রাজশাহী সিভিল সার্জন কাইয়ুম তালুকদার জানান, রাজশাহীতে ঢাকা ও বিভিন্ন জেলা থেকে মানুষ আসছে। ইন্ডিয়া থেকেও মানুষ বিভিন্ন কাজে সেরে রাজশাহীতে আসছে। তারা আইসোলেশন মানছে না। আর স্বাস্থ্যবিধি মানতে অনীহা থাকায় সংক্রামণ বেশি হয়েছে। গত দুই সপ্তাহ আগেও জেলায় শনাক্তের সংখ্যা কম ছিলো। কিন্তু এখন শনাক্তের সংখ্যা বেড়েছে। গতকাল জেলায় মোট ২১ জন শনাক্ত হয়েছে।
তিনি বলেন,‘আমরা মানুষকে সচেতন করছি। ভাম্রমান আদালত পরিচালনা করছি, বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠান এখন না করার জন্য বলা হয়েছে। যানবহনে অর্দ্ধেক যাত্রী নিয়ে চলাচলের জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এখন টেস্টের সংখ্যা বেড়েছে। উপজেলা গুলোতে ১০ টি করে বেড করা হয়েছে। আইসোলেশন কর্ণার , ওয়ার্ড কর্ণার করা হয়েছে হাসপাতালে।

বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক হাবিবুল আহসান জানান, রাজশাহী বিভাগের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বগুড়া ও রাজশাহীতে শনাক্তের সংখ্যা। কারণ এই দুই জেলা বড় শহর বাইরের মানুষের যাতায়াত বেশি। বিভিন্ন কলকারখানা ও সরকারি বে-সরকারি প্রতিষ্ঠান এখানে আছে। গত মাসেই টেস্ট ও শনাক্তের সংখ্যা কম ছিলো। কিন্তু এখন প্রতিদিন ৬ শ থেকে ৭ শ জনের মতো পরীক্ষা করছে। এর মধ্যে ১০০ জনের উপরে শনাক্ত হচ্ছে। চিকিৎসার জন্য এখন পর্যন্ত রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেই সকল কার্যক্রম চলছে।

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. সাইফুল ফেরদৌস জানান, আমাদের সেন্টাল অক্্িরজেন স্পালাই এটা দ্বিগুন করা হয়েছে। ২৫ ও ২৭ নম্বর ওয়ার্ড চালু করা হয়েছে। চিকিৎসকরা আক্রান্ত হলে ২৭ নম্বর ওয়ার্ডে রাখা হবে আর নার্সরা আক্রান্ত হলে ২৫ নম্বর ওয়ার্ডে রাখা হবে। আমাদের সরঞ্জম রয়েছে। চিকিৎসক ও নার্সদের আবারো নতুন করে রোস্টার করা হয়েছে। তিনি বলেন, চিকিৎসকসহ সকল স্বাস্থ্যকর্মীদের স্যাম্পল কালেকশন করেছি। আমরা প্রতিদিন রিপোর্ট পেয়ে যাচ্ছি। প্রথমবারের চেয়ে এখন বেশি চ্যালেঞ্জ হয়ে যাচ্ছে। কারণ করোনার প্রথমে হাসপাতালে রোগী ছিলো ৫ শতাধিক কিন্তু এখন রোগী থাকছে ছিলো ২ থেকে আড়াই হাজার। করোনা ও অন্য সকল বিভাগের রোগীদের এক সাথে সেবা দিতে হচ্ছে এটা অনেক চ্যালেঞ্জ। আইসিইউ ও কেবিনে কোন জায়গা নেই।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
উপরে