একই বাতি ১৩ লাখে বেশী কিনে বিতর্কে শাহ মখদুম

প্রকাশিত: এপ্রিল ১, ২০২১; সময়: ৩:২৩ pm |

নিজস্ব প্রতিবেদক : রাজশাহী মহানগরীর সড়কগুলো ধীরে ধীরে ফোরলেন করা হচ্ছে। কিন্তু প্রশস্থ সড়কে শুধুমাত্র সোডিয়াম বাল্ব বা সনাতন পোলের বাল্বের আলো দিয়ে আলোকায়ন সম্ভব হচ্ছিল না। তাই এই সড়কগুলোতে প্রয়োজনীয় আলোকায়নের জন্য ‘হাই মাস্ট’ পোল স্থাপন করা হয় ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে। একটি প্রকল্পের অধীনে রাজশাহী সিটি করপোরেশনের (রাসিক) উদ্যোগে মহানগর এলাকার জনগুরুত্বপূর্ণ ১৬টি স্থানে পর্যায়ক্রমে এই সুউচ্চ বিদ্যুৎ লাইট বসানো হয়।

এর প্রতিটি পোলের উচ্চতা ৫৬ ফিট। একেকটি পোলে ২০টি করে এলইডি লাইট রয়েছে। এর ফলে চারপাশে ন্যূনতম আধা কিলোমিটার এলাকাজুড়ে এই পোলের লাইট আলোকায়িত করছে। কিন্তু স্থাপনের পর বাজার মূল্যের চেয়ে বেশি দামে `হাই মাস্ট’ পোল কেনার অভিযোগ ‍ওঠে রাসিকের বিরুদ্ধে। পরে এজন্য তদন্ত কমিটিও গঠন করে দেন রাসিক মেয়র।

পরে সেই কমিটি রিপোর্ট দাখিল করেন। এখন যেখানে রাসিকের বিরুদ্ধেই বেশি দরে ‘হাই মাস্ট’ পোল স্থাপনের অভিযোগ উঠেছিল। সেখানে এবার রাসিকের চেয়েও বেশি দামে একই ‘হাই মাস্ট’ পোল কিনে নতুনভাবে বিতর্কে পড়েছেন রাজশাহীর শাহ মখদুম (রহ.) বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ।

একটি পোল স্থাপন করতে রাসিক খরচ করেছে ৩২ লাখ ৫০ হাজার টাকা। সেখানে রাজশাহীর শাহ মখদুম বিমানবন্দর খরচ করেছে ৪৫ লাখ ৭০ হাজার ২ টাকা। অর্থাৎ প্রতিটি ‘হাই মাস্ট’ পোলে রাসিকের চেয়েও ১৩ লাখ টাকা বেশি খরচ দেখিয়েছে শাহ মখদুম বিমানবন্দর।

প্রশ্ন উঠেছে-যেখানে ৩২ লাখ ৫০ হাজার টাকার দরপত্রকে বাজার দরের তুলনায় ‘অস্বাভাবিক’ উল্লেখ করে কোটি টাকা দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে, সেখানে শাহ মখদুম বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের ১৩ লাখ টাকা বেশি খরচ হয় কীভাবে? বিষয়টি জানাজানির পর এখন নড়েচড়ে বসেছে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ।

রাসিকের মেয়র এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটনের উদ্যোগে মহানগরীর ১৬টি স্থানে এই সুউচ্চ বিদ্যুৎ লাইট বসানো হয়েছে। বিগত ২০১৯ সালের ১৫ ডিসেম্বর শহীদ এ এইচ এম কামারুজ্জামান চত্বরে প্রথম দুইটি এই সুউচ্চ লাইট উদ্বোধন করেন মেয়র। এরপর জনগুরুত্বপূর্ণ মোট ১৬টি স্থানে এই সুউচ্চ বিদ্যুৎ লাইট বসানো হয়।

এরপরই লাইট স্থাপন নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। ‘অস্বাভাবিক’ দরপত্রের অভিযোগটি আমলে নিয়ে ৫ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে দেন মেয়র এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটন। ওই কমিটির দেওয়া প্রতিবেদনে একই লাইট স্থাপন করতে গিয়ে রাসিক ও শাহ মখদুম বিমানবন্দর দরপত্রে ১৩ লাখ টাকার বিস্তর ফারাকের এই বিষয়টি উঠে আসে।

এর মধ্যে একটি অভিযোগ ছিলো, রাসিকের বিদ্যুৎ বিভাগ দেশের কোনো বিভাগ বা অফিসের রেট স্কেজিউল অনুসরণ করেনি। এছাড়া হাই ‘মাস্ট লাইট’ স্থাপনে কোনো কোম্পানির একক দর অথবা বাজার দরও অনুসরণ করেনি। ঠিকাদারের চাহিদা অনুযায়ী কাজটির প্রাক্কলন করেছে। বাজার দর ও রেট স্কেজিউলের দরের চেয়ে অফিসিয়াল প্রাক্কলন অনেক বেশি।

এ ঘটনায় গত বছরের ২৩ সেপ্টেম্বর বিষয়টি তদন্তের জন্য সিটি মেয়রের নির্দেশে ৫ সদস্যে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির আহ্বায়ক করা হয়- রাসিকের সেই সময়ের প্রধান প্রকৌশলী খায়রুল বাশারকে। এছাড়া নেসকোর রাজশাহীর নির্বাহী প্রকৌশলী মাহমুদুল হাসান, রাজশাহীর গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী কামরুজ্জামান, রুয়েটের তড়িৎকৌশল বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মামুনুর রশিদ এবং রাসিকের বিএওর সদস্য সচিব শফিকুল ইসলাম খানকে ওই তদন্ত কমিটির সদস্য করা হয়। পরে সেই কমিটি তাদের প্রতিবেদন দাখিল করেন।

তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, ‘দরপত্র সংক্রান্ত নথি পর্যালোচনায় দেখা গেছে- পিডব্লিউডি (গণপূর্ত অধিদফতর), এলজিইডি (স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতর) বা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের রেট স্কেজিউল বইয়ে ‘হাই মাস্ট’ পোলের রেট নেই’।

শাহ মখদুম বিমানবন্দরে ২০ মিটার অটো লিফটিং ‘হাই মাস্ট’ পোল স্থাপনে ৪৫ লাখ ৭০ হাজার ২ টাকা দর পাওয়া গেছে। যেখানে রাসিকের অটো লিফটিং ‘হাই মাস্ট’ পোল স্থাপনের প্রাক্কলিত দর ৩২ লাখ ৫০ হাজার টাকা। এই দুই দরের হিসাবের অংক বলছে, শাহ মখদুম বিমানবন্দরের চেয়ে রাসিকের দরটি অপেক্ষাকৃত অনেক কম। এছাড়া ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান প্রাইস স্কেজিউলে ‘হাই মাস্ট’ পোল স্থাপনসহ যেই একক দর উদ্ধৃত করেছেন (৩১ লাখ ৪৭ হাজার টাকা) তা রাসিকের দরের চেয়ে ৩ দশমিক ১৭ শতাংশ কম।

রাজশাহীর গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী কামরুজ্জামান বলেন, এই ‘হাই মাস্ট’ লাইটিং পোল বাংলাদেশের মধ্যে ঢাকার পর রাজশাহীতেই প্রথম। এরপর শাহ মখদুমে বসানো হচ্ছে। তাই ঢাকা ও শাহ মখদুমের দরপত্র বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে রাজশাহী সিটি করপোরেশন তুলানমূলক কম দামেই ‘হাই মাস্ট’ পোল স্থাপন করেছে।

শাহ মখদুম বিমানবন্দর কিভাবে বা কেন বেশি দরে কিনছে সেটা এই কমিটির বিবেচ্য নয়। রাসিকের দরপত্র বিশ্লেষণে বেসিক রেট, তার সঙ্গে ভ্যাট, ট্যাক্স, কাস্টম ডিউটি এগুলো আলাদা করে দেখানো ছিল। আর প্রয়োজনী কাগজপত্র না পাওয়ায় শাহ মখদুমেরগুলো সেভাবে বিশ্লেষণ করে দেখা সম্ভব হয়নি বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

এদিকে ৮ নভেম্বর স্থানীয় সরকার বিভাগে প্রতিবেদন সম্পর্কে অবগত ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে তদন্ত প্রতিবেদনটি পাঠিয়েছেন রাসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. এবিএম শরীফ উদ্দিন।

প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা স্বাক্ষরিত সেই অবহিতকরণ চিঠিতে বলা হয়েছে, ‘রাসিক মেয়রের গঠন করে দেওয়া ৫ সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি মোট ৭ পাতার প্রতিবেদন দিয়েছে। প্রাপ্ত তদন্ত প্রতিবেদন সদয় অবগতি ও পরবর্তী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে নির্দেশক্রমে পাঠানো হলো’।

আপরদিকে বেশি দামে ‘হাই মাস্ট’ পোল স্থাপন প্রশ্নে- শাহ মখদুম বিমানবন্দরের ব্যবস্থাপক দিলারা পারভীন বলেন, আমাদের এগুলো বিষয় সব ঢাকা থেকেই হয়ে আসে। তবে, ব্রান্ড আলাদা, দেশ আলাদা হলে; দামও আলাদা। এটা তো হতেই পারে। কিন্তু ঠিক কি হয়েছে তা পুরোটা আমার জানা নেই। ঢাকা হেড কোয়ার্টারে যোগাযোগ করা হলে তারা হয়তো সুনির্দিষ্টভাবে কিছু বলতে পারবে।

  • 290
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
উপরে