ভয়াবহ হচ্ছে বরেন্দ্রে ভূগর্ভস্থ পানি সংকট

প্রকাশিত: মার্চ ২৮, ২০২১; সময়: ৯:৫৭ pm |

আসাদুজ্জামান মিঠু : বরেন্দ্র অঞ্চলে ক্রমেই নিচে নেমে যাচ্ছে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর। বরেন্দ্রে উচুঁ অঞ্চল গুলোতে ভূগর্ভস্থ পানি স্তরে পানি শূন্য হয়ে পড়েছে। এতে বাড়িতে বসানো শত শত সাবমার্সেবল পাম্প পুরোপুরি বন্ধ হয়েগেছে। বরেন্দ্র বহুমুখি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ) গভীর নলকূপ গুলো পানি সংকটে ধুকে ধুকে চলছে। এতে বোরোতে সেচ দেয়া নিয়ে হিমশিম খাচ্ছে কৃষকেরা।

বন্ধ শুধু সাবমার্সেবল পাম্পই নয়,ভূগর্ভস্থর তলদেশের পানির স্তর পরিমাপ কূপ মুন্ডুমালা পৌরসভা ও বাধাইড় ইউনিয়নে একটি করে অনেক গভীরতায় বসানো ছিল, সে পরিমাপ কূপ দুইটিওপানি শূন্যে বন্ধ হয়ে অকেজো হয়ে গেছে।

চৈত্রের ধুধু খড়ায় কমে গেছে খাল-বিলের পানি। শুকনো হয়ে পড়েছে অনেক পুকুরও। এমন অবস্থায় বরেন্দ্র অঞ্চলের উচুঁ অঞ্চল গুলোতে খাওয়ার পানির তীব্র সংকটে পড়েছেন হাজার হাজার মানুষ।

বরেন্দ্র অঞ্চলে অদুর ভবিষ্যতে পানির চরম সংকট দেখা দিবে। এধরনের সমস্যার কথা অনেক আগে থেকেই পরিবেশবাদিরা বলে আসছিলেন। ভূগর্ভস্থ পানির লেয়ার বিগত এক যুগে দ্বিগুনের বেশি নিচে গেছে। গবেষকদের কথা আজ বাস্তবে রুপ নিতে শুরু করেছেন॥

এর আগে ২০১৫ সালে ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর ক্রমাগতভাবে নিচে নামায় বরেন্দ্র অঞ্চলের ৩টি পৌরসভা ও ১৫ ইউনিয়ানকে অতি ঝুঁকিপূর্ণ হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ডাসকো ফাউন্ডেশন পরিচালিত সমন্বিত পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রকল্প (আইডাব্লুউআরএম) নামে একটি প্রকল্প জরিপ চালিয়ে এসব এলাকাকে অতিঝুঁকিপূর্ণ চিহ্নিত করেছে।

ঝুঁকিপুর্ণ ওইসব এলাকায় অতি জরুরিভাবে ভূ-গর্ভস্থ থেকে পানি উত্তোলন বন্ধ করে বিকল্প উপায়ের মাধ্যমে পানির ব্যবহার করার পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি। এ অবস্থা চলতে থাকলে কয়েক বছরের মধ্যেই ওইসব এলাকায় মিঠা পানির তিব্র সংকট দেখা দিবে বলে জানিয়েছে তারা।

দীর্ঘ ১ বছর বরেন্দ্র অঞ্চল জুড়ে জরিপ চালিয়ে সরকারেকে এমনই প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন আইডাব্লুউআরএম নামের সংস্থাটি। ২০১৪ সালে পুরো বরেন্দ্র অঞ্চলের মাঠ পর্যায়ে এই জরিপটি পরিচালনা করেন।

সংস্থাটি তাদের প্রতিবেদনে বলেছে, এক যুগ আগে এ ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে ৬০ থেকে ৯০ ফিটের মধ্যে সচারচর পানি পাওয়া যেত। বর্তমানে তা ১৬০ ফিট বা তারও নিচে গিয়ে পানি মিলছে না।

ঝুঁকিপুর্ণ ওইসব পৌরসভা ৩টি হলো রাজশাহীর তানোর উপজেলার মুণ্ডুমালা পৌরসভা, গোদাগাড়ীর কাঁকনহাট ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের রহনপুর পৌরসভা। এছাড়া ১৫টি ইউনিয়নগুলো হলো, রাজশাহী তানোর উপজেলার বাঁধাইড, কলমা, পাঁচন্দর, গোদাগাড়ী উপজেলার মোহনপুর, পাকড়ী, গোদাগাড়ী ইউনিয়ন, চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার, গোবরা তলা ও ঝিলিম ইউনিয়ন, নাচোল উপজেলার কসবা ও নেজামপুর ইউনিয়ন, ভোলাহাটের দলদলি ইউনিয়ন, গোমাস্তাপুরের পাবতীপুর, রহনপুর, রাধানগর, ইউনিয়ন।

প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা গুলো সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে উচ্চতা ৬৫ সেন্টিমিটার। ঝুঁকিপূর্ণ ইউনিয়ন ও পৌর এলাকাগুলোতে অতি দ্রুত গভীর নলকূপের পানি দিয়ে বোরো আবাদ বন্ধ করতে বলা হয়েছে। সেই সঙ্গে পানির রিচার্জ করতে বিদ্যমান বড় পুকুর ও খাড়িগুলো খনন করে ভূ-উপরস্থ পানির ব্যবহার বৃদ্ধি করতে বলা হয়েছে।

২০১৪ সাল থেকে বরেন্দ্র অঞ্চলের ৪টি পৌরসভা ও ৩৫ ইউনিয়ানকে অতি ঝুঁকিপুর্ণ হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর পর থেকেই এসব ঝুঁকিপুর্ণ অঞ্চল গুলোতে প্রায় ৪৮ টি কূপ বসিয়ে ভূ-গর্ভস্থর পানি স্তরের নিয়মিত পরিমাপ করে আসছেন ডাসকো ফাউন্ডেশন পরিচালিত সমন্বিত পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রকল্প (আইডাব্লুউআরএম) নামে একটি জরিপ সংস্থা।

সংস্থাটি সর্বশেষ ২০১৮ সালে মার্চ মাসের ঝুঁকিপুর্ণ এলাকায় ৪৮ টি পরিমাপ কূপ দিয়ে ভূ গর্ভস্থর পানি স্তরের মাপ গ্রহন করেছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি তানোরের মুন্ডুমালা পৌরসভা ও বাধাইড় ইউনিয়ন এবং গোমাস্তপুর উপজেলার পার্বতীপুর ইউনিয়নে দ্রুত গতিতে পানি নেমে যাচ্ছে। ফলে এ দুই ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা চরম ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি) ভূ-তত্ব ত্ত খনিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. চৌধুরী সারওয়ার জাহান। বরেন্দ্রে অঞ্চলের ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর নিয়ে ২০১৪ সাল থেকে গবেষণা করছেন।

ড. চৌধুরী সারওয়ার জাহান জানান, বরেন্দ্র অঞ্চলে ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর দ্রুত নিচে নামাই চিন্তিত গবেষকেরা। কারণ নিচে পানি শূণ্য হলে বালি,পাথর ফাকা হয়ে পড়বে। তাতে করে সামান্য ভূমিকম্প হলেই দেবে যেতে পারে।

এ গবেষক আরো বলেন,ব রেন্দ্র অঞ্চল কে বাচাতে পানির কোন বিকল্প না। প্রথমেই ভূ-গর্ভস্থ থেকে সেচ কাজে পানি ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। বৃষ্টির পানি সংরক্ষণে পুকুর-খাড়ি বেশি করে খনন করতে হবে। বাসা বাড়ির ছাদের পানি ভূ-গর্ভস্থ ভিতরে রিফানিং করে ঢুকাতে হবে। এক কথায় বৃষ্টির পানি বেশি বেশি রির্চাজ করতে হবে।

এজন্য সরকারের পাশাপাশি এসব অঞ্চলের কৃষক, শিক্ষক, ইমানগন ও সচেতন ব্যাক্তিদের এগিয়ে আসতে হবে। তার আগে সরকারকে এসব অঞ্চলের কৃষি জমিতে সেচ দিতে বিকল্প উপায়ে পানির ব্যবস্থা করতে পারলেই সমস্যা কিছুটা হলেও সমাধান হবে বলে মনে হয়।

তানোরের মুন্ডমালা পৌর মেয়র সাইদুর রহমান বলেন, এ এলাকার প্রধান সমস্যা এখন সেচ ও খাবার পানি। একের পর এক সাবমার্সেবল নলকূপ বসিয়েও পানি সংকট সমাধান করা সম্ভব হচ্ছে না। মাত্র দুই বছর আগে বসানো সাবমার্সেবল পাম্পগুলো পানির অভাবে একের পর বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।

চৈত্র মাস পড়তে না পড়তেই পুকুরের পানি তলানিতে। তবুও পচা দুর্গন্ধ। এখন গ্রামবাসীর খাওয়ার পানির ভরসা একব্যাক্তির বাড়িতে বসানো একইঞ্চি পাইবের সাবমার্সেবল পাম্প। তাও পানির অভবে বন্ধ হতে শুরু করেছে।

বাধাইড় ইউপি চেয়াম্যান আতাউর রহমান বলেন,তার ইউনিয়নে ১৫০টি মত সাবমার্সেবল পাম্প দিয়ে পানির ব্যবস্থা করা হয়েছিল। তার মধ্যে প্রায় অর্ধেক পাম্প তলদেশে পানি না থাকায় বন্ধ হয়ে পড়ে আছে। এতে ইউনিয়ন বাসির খাওয়ার পানি চরম দুর্ভকে পড়ে আছে। অনেক পুকুর শুকায় চৈাচির হয়ে গেছে। গরু-ছাগল,হাড়িপাতিল মাজা ঘোষা সবই করতে হচ্ছে দুরদুরান্ত থেকে কেনা আনা পানিতেই। যার ফলে গ্রামে এখন চলছে পানির হাহাকার।

তিনি আরো বলেন, বোরো মৌসুমে বেশি মাত্রায় পানি ব্যবহারের ফলে এ অঞ্চলে প্রতি বছর গড়ে দুই ফুট করে পানির লেয়ার নিচে নেমে যাচ্ছে। দীর্ঘ দিন ধরে এমনটি হওয়ার কারণে পানির সংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।

ডাসকো ফাউন্ডেশন পরিচালিত সমন্বিত পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রকল্প (আইডাব্লুউআরএম) এর বরেন্দ্র অঞ্চলে দায়িত্ব প্রাপ্ত সহকারী প্রজেক্টর জাহাঙ্গীর আলম খাঁন জানান, বরেন্দ্র অঞ্চলে সেচ কাজে ভূ-গর্ভস্থে থেকে অতিরিক্ত মিঠাপানি উত্তোলনের ফলে ক্রমগতভাবে পানির স্তর নিচে নামছে।

তানোরের মুন্ডুমালা পৌরসভা ও বাধাইড় ইউপি দুইটি পর্যবেক্ষন কূপ(মাপ) প্রায় ৩০০ ফুট গভীরে বসানো ছিল। চলতি বছর এ দুই কূপও পানি শূন্য হয়ে অকেজো হয়েগেছে।

জাহাঙ্গীর আলম বলেন, তাদের সংস্থার পক্ষে সরকারে কাছে সুপারিশে অতিঝুঁকিপুর্ণ দুই ইউনিয়ন এলাকায় অতি জরুরিভাবে ভূ-গর্ভস্থ থেকে পানি উত্তোলন বন্ধ করে বিকল্প উপায়ের মাধ্যমে সেচ কাজে পানির ব্যবহার করার পরামর্শ দিয়েছে। তার পরেও যদি সরকার কোন পদক্ষেপ গ্রহন না করে তাহলে মাত্র দুই তিন বছরের মধ্যে কৃষি কাজে সেচ তো দুরের কথা খাওয়ার মিঠা পানির তীব্র সংকটে পড়বে এ এলাকার মানুষ। গত ৫ বছর আগে পাঠানো সুপারিশগুলো সরকার বাস্তবায়ন করলে আজ সে সংকটে অঞ্চলের মানুষকে পড়তো হতোনা।

তিনি আরো জানান,বরেন্দ্র অঞ্চলের সবচেয়ে বেশি উঁচু পার্বতীপুর ইউনিয়ন। এখানে সমুদ্র পৃষ্ঠের সমতল থেকে ১৩৫ ফুট উঁচু। এর পরে আছে বাধাইড় ইউনিয়ন। এ দুই ইউনিয়ন কে সেনসেটিভ জোন হিসাবে অভিহিত করা হয়েছে। পরের স্থানে রয়েছে, মুণ্ডুমালা পৌর এলাকা, পাঁচন্দর, ঝিলিম, নেজামপুর ইউনিয়ন। তাই তাদের দেয়া সুপারিশ গুলো সরকারকে দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। সেই সঙ্গে পানির রিচার্জ করতে বিদ্যমান বড় পুকুর ও খাড়িগুলো খনন করে ভূ-উপরস্থ পানির ব্যবহার বৃদ্ধি করতে হবে।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ স্টাডিজের (আইবিএস) গবেষক রাজ্জাকুল ইসলাম জানান, ১৯৮০ সালে এ অঞ্চলে পানির স্তর মাত্র ৩৯ ফুট নিচে ছিল। তবে ৩৬ বছরের ব্যবধানে ২০১৬ সালে ১১৮ ফুট নিচে নেমে গেছে। ১০০ থেকে ১৫০ ফুট নিচে পাতলা একটা পানির স্তর পাওয়া যাচ্ছে।

তিনি আরও জানান, দেশের গড় বৃষ্টিপাত ২ হাজার ৫০০ মিলিমিটার হলেও এ এলাকায় গড় বৃষ্টিপাত মাত্র ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ মিলিমিটার। বৃষ্টিপাতে ভূগর্ভস্থ পানির গড় পুনর্ভরণের হার দেশে ২৫ শতাংশ হলেও এ অঞ্চলে মাত্র ৮ শতাংশ।

  • 585
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
উপরে