রাজশাহীতে পঞ্চাশোর্ধ্ব বয়সে ‘মায়ের আঁচলে’ সফলতা

প্রকাশিত: মার্চ ১৬, ২০২১; সময়: ১:৪৭ pm |

শফিকুল ইসলাম : পঞ্চাশোর্ধ্ব বয়সে এসে কামরুন নাহারের সফল উদ্যোক্তা হওয়ার ঘটনা এখন রাজশাহীর অনেকের মুখে শোনা যায়। যে বয়সে এসে কাজ থেকে অবসরে যাওয়ার কথা ভাবেন, তখন টিকে থাকার প্রয়োজনীয়তাই কামরুন নাহারকে উদ্যোক্তা বানিয়েছে।

কামরুণ নাহার পড়েছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগে। বিয়ের পর চাকরি। কিন্তু সাংসারিক ঝামেলায় তা ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। আগে থেকেই স্বাধীনভাবে কিছু করতে চেয়েছিলেন। ভাবতে ভাবতে একপর্যায়ে শুরু করেন আচার তৈরির কাজ। এই আচারেরই ব্র্যান্ডিং করেন ‘মায়ের আঁচল’ নামে।

রাজশাহীতে এরই মধ্যে পরিচিতি পাওয়া মায়ের আঁচলের প্রতিষ্ঠাতার নাম কামরুন নাহার (৫৭)। নগরীর টিকাপাড়া এলাকার এই নারী ঘরে তৈরি আচার বাজারজাত করেন ঢাকাতেও। একটি ফুড ডেলিভারি প্রতিষ্ঠান এখন তাঁর কাছ থেকে আচার কিনে পৌঁছে দেয় গ্রাহকের ঘরে।

আর মায়ের আঁচলে কাজ করে নিজেদের ঘরে উপার্জনকারী হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছেন ৭ থেকে ১০ জন নারী। তাঁদের মধ্যে চারজন স্থায়ীভাবে কাজ করেন। মায়ের আঁচলে তৈরি করেন বরই, তেঁতুল, আম, জলপাইয়ের মিক্সড চাটনি, আচার ও তেঁতুলের সস। এসবের চাহিদাও বেশ। কেনার জন্য নিয়মিত অর্ডার আসে রাজশাহীসহ ঢাকার বিভিন্ন দোকান ও রেস্তোরাঁ থেকে। ৬০ হাজার টাকার মধ্যে উৎপাদন খরচ। কর্মীদের মজুরি মিটিয়ে কামরুন নাহারের হাতে প্রতি মাসে লাভের টাকা থাকে প্রায় ৩০ হাজার।

২০১৯ সালে তেঁতুলের আচার ও চাটনিতে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনের (বিএসটিআই) অনুমোদন পায় মায়ের আঁচল। আচারের সঙ্গে এখন বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি অফিসে ভাত, বিরিয়ানিসহ পিঠার অর্ডার পান কামরুন নাহার। করোনা মহামারি শুরু হওয়ার পর থেকে নিয়মিত রান্না করছেন ফুড পান্ডার গ্রাহকদের জন্য।
বিজ্ঞাপন

কামরুন নাহার জানান, প্রথম দিন প্রশিক্ষণ নিতে গিয়ে দেখেন, তাঁর বয়সী কোনো নারীই সেখানে নেই। সবার বয়সই ৩০ থেকে ৩৫–এর মধ্যে। প্রশিক্ষকেরাও আশঙ্কা করছিলেন, তিনি হয়তো কিছুদিন পরই ক্ষান্ত দেবেন। কিন্তু টানা তিন মাসের প্রশিক্ষণে এক দিনও অনুপস্থিত থাকেননি।

পঞ্চাশোর্ধ্ব বয়সে এসে কামরুন নাহারের সফল উদ্যোক্তা হওয়ার ঘটনাও এখন রাজশাহীর অনেকের মুখে শোনা যায়। তাঁর বয়স ৫৭। যে বয়সে এসে অনেকে কাজ থেকে অবসরে যাওয়ার কথা ভাবেন, তখন টিকে থাকার প্রয়োজনীয়তাই কামরুন নাহারকে উদ্যোক্তা বানিয়েছে।

সুখের সংসারে অভাব আসার পর দিশেহারা কামরুন নাহারের সংগ্রাম শুরু হয় ২০১৩ সালে, যখন তাঁর স্বামী মারা যান। কামরুন নাহারের স্বামী জনতা ব্যাংকের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ছিলেন। ২০১১ সালে অবসরে যাওয়ার আগেই এককালীন টাকা তুলে নেন তিনি। ফলে স্বামী মারা যাওয়ার পরই অর্থনৈতিক সংকটে পড়তে হয় কামরুন নাহারকে। থাকার বাড়িটিও হাতছাড়া হয়ে যায়। তাঁর এক ছেলে আলাদা থাকেন।

২০১৪ সালে বুটিকসের কাজ শুরু করেন কামরুন নাহার। কিন্তু এতে খুব বেশি সুবিধা করতে পারেননি। পরে শুভাকাঙ্ক্ষীদের পরামর্শে বিভিন্ন ধরনের আচার তৈরি শুরু করেন। ২০১৭ সালে পান ট্রেড লাইসেন্স। শুরুতে বাড়ির আশপাশের লোকজনই তাঁর এই পণ্যের ক্রেতা ছিলেন। পরে লোক রেখে তা বাজারজাত শুরু করেন। এর মধ্যেই প্রশিক্ষণ নেন রাজশাহী মহিলা কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থেকে।

কামরুন নাহার বলেন, প্রথম দিন প্রশিক্ষণ নিতে গিয়ে দেখেন, তাঁর বয়সী কোনো নারীই সেখানে নেই। সবার বয়সই ৩০ থেকে ৩৫–এর মধ্যে। প্রশিক্ষকেরাও আশঙ্কা করছিলেন, তিনি হয়তো কিছুদিন পরই ক্ষান্ত দেবেন। কিন্তু টানা তিন মাসের প্রশিক্ষণে এক দিনও অনুপস্থিত থাকেননি কামরুন নাহার। অন্য অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে তিনিই এখন সফল হওয়ার পথে।

‘মায়ের আঁচল’ নাম কেন, তা নিয়ে কামরুন নাহারকে অনেকেই প্রশ্ন করেন। তিনি এর উত্তর দেন, জন্মের পর সন্তানেরা খাওয়া শেখে মায়ের কাছে। কামরুন নাহারের কাছ থেকে যাঁরা খাবার কিনবেন, তাঁরা যেন মায়ের যত্ন অনুভব করেন, সে ভাবনা থেকেই এই নামকরণ।

রাজশাহী নগরের টিকাপাড়ায় একটি ভাড়া বাড়িতে থাকেন কামরুন নাহার। টিকাপাড়া মসজিদের পাশে চোখ পড়ে ‘মায়ের আঁচল’ লেখা সাইনবোর্ডে। বাড়ির তিনটি কক্ষে ছোট-বড় আলমারির তাকে সাজানো বিভিন্ন ধরনের আচারের বয়াম।

নতুন তৈরি আচারের বয়াম আলমারির তাকে রাখতে রাখতে কামরুন নাহার বলছিলেন, করোনা মহামারি শুরুর আগে অনেক অর্ডার আসত। মাঝখানে কমে যায়। কিন্তু এই দুঃসময়েও কর্মীদের বেতন দেওয়া বন্ধ রাখেননি। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পর এখন আবার অর্ডার আসতে শুরু করেছে।

কামরুন নাহার এখন ব্যবসার পরিসর বাড়ানোর পরিকল্পনা করছেন। শুরুতে যে বুটিকসের কাজ করতে গিয়ে ব্যর্থ হয়েছিলেন, তা এখন নতুন করে শুরু করতে চান। বাড়ির একটি কক্ষের আলমারিতে নানা নকশার পোশাক। বর্তমানে ছয়-সাতজন নারীকে বুটিকসের কাজ শেখাচ্ছেন। প্রস্তুতি শেষ হলে শুরু হবে নতুন উদ্যোগ। তাতে হয়তো মায়ের আঁচলে কর্মসংস্থান হবে আরও নারীর। সূত্র- প্রথম আলো

  • 158
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
উপরে