রাজশাহীতে প্রবাহ বন্ধ করে পদ্মার বুকে আ.লীগ নেতার রাস্তা

প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ২৫, ২০২১; সময়: ৪:৩৫ pm |

নিজস্ব প্রতিবেদক : রাজশাহীতে ইজারার নামে বালু উত্তোলনের কোন নিয়ন মানেন না আওয়ামী লীগ নেতা রজব আলী। তিনি রাজশাহী সিটি করপোরেশনের ১ নম্বর ওয়ায়ের কাউন্সিলর এবং প্যানেল মেয়র-২। এছাড়াও তিনি ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক।

রজব আলী রাজশাহীর দিয়াড়খিদিরপুর ও চরশ্যামপুর বালুমহাল ইজারা নিয়েছেন। তিনি তার বালু মহাল থেকে ৬ কিলোমিটার দুরে ইজারাবর্হিভূত তালাইমারী এলাকায় পদ্মা নদীর ভেতর দিয়ে রাস্তা বানিয়ে বালু তুলছেন। এছাড়াও চরশ্যামপুর এলাকাতেও বালু তোলতে জলাধার বন্ধ করে পদ্মার বুকে তৈরী করেছেন রাস্তা। পদ্মার পাড় থেকে দেড় কিলোমিটার দুর থেকে বালু তোলার নিয়ম থাকলেও তা মানছেন রজব আলী। পদ্মার পাড় থেকেই তিনি দিন-রাত বালু তোলছেন। এতে হুমকির মুখে পড়েছে চরশ্যামপুর গ্রাম।

পরিবেশবাদীরা বলছেন, নদীর জায়গায় কোনো ধরনের প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা দেশের প্রচলিত আইনে দণ্ডনীয় অপরাধ। কিন্তু তালাইমারি ও চরশ্যামপুর এলাকায় প্রবাহ বন্ধ করে পদ্মার বুকে রাস্তা তৈরী করা হলেও প্রশাসন নিরব রয়েছেন।

বুধবার সরজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, চরশ্যামপুরে পাড় রক্ষা বাঁধের নিচেই ড্রেজার মেশিন দিয়ে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। এতে ভয়াবহ ভাঙনের হুমকির মুখে পড়ছে বাঁধ ও পুরো এলাকা।

অপরদিকে, পদ্মা নদী থেকে বালু তুলতে তৈরি করা হয়েছে রাস্তা। এভাবেই নিয়ম নিতির তোয়াক্কা না করে রাত দিন ২৪ ঘন্টা বালু তোলছেন ইজারাদার রজব আলী। এ রাজশাহী জেলা প্রশাসকের পক্ষ থেকে নেই কোন তদারকি। পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাদেরকে জানিয়েও প্রতিকার পায়নি বলে অভিযোগ স্থানীয় পদ্মা পাড়ের বাসিন্দাদের।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় এক বাসিন্দা জানান, লিজ নেয়ার পর থেকে অবৈধভাবে বালু তোলা হচ্ছে। কোউ কিছু বলতে গেলে তাদের ভয় দেখানো হয়। তাই ভয়ে কেউ কিছু বলে না।

এদিকে, রাজশাহী নগরের তালাইমারী ঘাট থেকে খানিকটা দূরে পদ্মা নদীর চর পড়েছে। ওই চরের দক্ষিণে নদীর মূল ধারা প্রবাহিত হচ্ছে। ওই চর থেকে নদীর মধ্যে তৈরি রাস্তায় ট্রাকে করে বালু তালাইমারী ঘাটে দিয়ে পরিবহন করা হচ্ছে।

জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, এর আগে রাস্তা তৈরি করার সময়ই রাজশাহী জেলা প্রশাসন অভিযান চালায়। আবার ওই পথে বালু আনা-নেওয়া হচ্ছে শুনে গত বৃহস্পতিবার জেলা প্রশাসনের ম্যাজিস্ট্রেট অভিযান চালিয়ে রাস্তা কেটে দেওয়া হয়।

সোমবার সেখানকার স্থানীয় ব্যক্তিরা জানান, ম্যাজিস্ট্রেট চলে যাওয়ার পরই রাস্তা ঠিক করে আবার বালু পরিবহন শুরু হয়।

কাউন্সিলর রজব আলী বলেন, চৌহদ্দি থেকে বালু তুলে তালাইমারী ঘাটে নিয়ে আসার জন্য তাঁরা একটা রাস্তা তৈরি করছেন। সেখানে এখন নদী নেই। ওই জায়গাটিও আরএস রেকর্ডে রাস্তা হিসেবেই উল্লেখ আছে। সুতরাং তিনি কোনো অনিয়ম করছেন না। অথচ জেলা প্রশাসন রাস্তা কেটে দিয়ে তাঁকে বালু তুলতে দিচ্ছে না।

রজব আলী বলেন, জেলা প্রশাসন তাকে নোটিশ দিয়েছে। এর বিরুদ্ধে তিনি আদালতে রিট করেছেন। জেলা প্রশাসনের নোটিশ কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে আদালত জেলা প্রশাসককে কারণ দর্শাতে বলেছেন। একই সঙ্গে রিটের শুনানি শেষ না হওয়া পর্যন্ত তিনি এই রাস্তায় বালু আনা-নেওয়া করতে পারবেন।

রাজশাহী জেলা প্রশাসক আবদুল জলিল বলেন, ইজারাদার আইনের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে বালু তুলছেন। আদালত তাকে ওই রাস্তায় বালু পরিবহনের অনুমতি দেননি। আদালতের নোটিশের উত্তর দিতে প্রস্তুত আছেন তিনি।

জানা গেছে, রজব আলী তার বালুমহাল থেকে ৬ কিলোমিটার দুরবর্তী কাজলা মৌজার তালাইমারীতে বালু মজুদের পর পরিবহনের নির্দেশনা চেয়ে গত ৩০ নভেম্বর হাইকোর্টে একটি রিট পিটিশন করেছিলেন। রিট পিটিশন নং-৯৫১৪/২০২০। গত ৪ জানুয়ারি হাইকোটের দ্বৈত বেঞ্চ রাজশাহী জেলা প্রশাসকের ওপর রুল জারি করে এই আবেদন নিস্পত্তির আদেশ দেন। ১৭ জানুয়ারির মধ্যে রুলের জবাব দিতেও বলা হয়।

উচ্চ আদালতের এই আদেশে রিটকারীর আবেদনকৃত বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোন নির্দেশনা অথবা আদেশ না দিলেও ইজারাদার প্রতিষ্ঠান মেসার্স রজব অ্যান্ড ব্রাদার্স এর মালিক রজব আলী ইজারা বহির্ভুত এলাকা পদ্মা নদীর কাজলা মৌজার তালাইমারী এলাকায় বালু আহরণ শুরু করেন। একই সঙ্গে বালু পরিবহনের জন্য নদীর চলমান জলধারা বন্ধ করে সড়ক তৈরি করেন।

তবে গত ১১ জানুয়ারি রাজশাহী জেলা প্রশাসক এক চিঠিতে উচ্চ আদালতের রুলের আইনী জবাব দেন। তাতে উল্লেখ করা হয়, বালু ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন-২০১০ এবং বালু ও মাটি ব্যবস্থাপনা বিধিমালা-২০১১ অনুযায়ী মেসার্স রজব অ্যান্ড ব্রাদার্সের করা রিট আবেদনটি আইনগতভাবে মঞ্জুর বা বাস্তবায়নের সুযোগ নেই। ফলে তা নথিজাতের মাধ্যমে নিস্পত্তি করা হয়। জেলা প্রশাসকের এ চিঠির অনুলিপি রজব আলীকেও দেওয়া হলে তিনি বালু তোলা বন্ধ করেননি।

  • 361
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
উপরে