রাজশাহীতে আটকে গেছে ২ শহীদ মিনার নির্মাণ

প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ২০, ২০২১; সময়: ১১:০৬ pm |

নিজস্ব প্রতিবেদক : রাজশাহীর ভাষাসৈনিকদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে আড়াই বছর আগে ‘দেশের প্রথম শহীদ মিনার’-এর জায়গাটিতে নতুন করে একটি শহীদ মিনার নির্মাণ শুরু হয়। রাজশাহী সিটি করপোরেশনের মেয়র এ এইচ এম খায়রুজ্জামান ও রাজশাহী সদর আসনের সাংসদ ফজলে হোসেন বাদশা ওই নির্মাণকাজের উদ্বোধন করেন। এ জন্য ৫০ লাখ টাকাও বরাদ্দ করে সিটি করপোরেশন। কিন্তু এখন পর্যন্ত এই শহীদ মিনার নির্মাণের কিছুই দৃশ্যমান হয়নি।

অপরদিকে, রাজশাহীতে জেলা পরিষদের জায়গায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার নির্মাণে নিষেধাজ্ঞা জারি করে হাইকোর্ট। গত মাসের ২০ জানুয়ারি বিচারপতি জেবিএম হাসান ও বিচারপতি মো. খায়রুল আলমের দ্বৈত বেঞ্চ এই আদেশ দেন। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার নির্মাণে জেলা পরিষদের জায়গা দখল ও স্থাপনা ভেঙে ফেলার অভিযোগ এনে রাজশাহী জেলা পরিষদের নির্বাচিত সদস্য গোলাম মোস্তফা হাইকোর্টে রিট পিটিশন করেছিলেন। এই শহীদ মিনার নির্মাণে ১৬ কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে। গত ১৬ ডিসেম্বর এর নির্মাণ কাজ উদ্বোধন করা হয়।

জানা গেছে, দেশের প্রথম শহীদ মিনারটি স্থাপিত হয়েছিল রাজশাহী কলেজের মুসলিম ছাত্রাবাস চত্বরে। ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় এখনো রাজশাহীতে যাঁরা বেঁচে আছেন, তাঁদের দীর্ঘদিনের দাবি, দেশের প্রথম শহীদ মিনার হিসেবে এটিকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেওয়া হোক। এই দাবির পরিপ্রেক্ষিতেই ২০১৮ সালের ৩০ অক্টোবর নতুন করে সেই শহীদ মিনারের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। এরও আগে ২০০৯ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি মেয়র এ এইচ এম খায়রুজ্জামান প্রথম শহীদ মিনারের স্মৃতি রক্ষার জন্য একটি ‘শ্রদ্ধাস্মারক’ ফলক স্থাপন করেছিলেন।

রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী শরিফুল ইসলাম বলেন, ২০১৯ সালের জুনে কাজ শেষ করার কথা ছিল। জায়গার সংকটের কারণে স্থান পরিবর্তন করতে হয়েছে। নকশাও পাল্টাতে হয়েছে। তাই দেরি হচ্ছে।

রাজশাহীর ভাষাসৈনিকদের দাবি, ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় গুলি করে ছাত্র-জনতাকে হত্যা করা হয়েছে- এমন একটি খবর রাজশাহীতে আসে সন্ধ্যায়। রাজশাহীর মাড়োয়ারি ব্যবসায়ীদের টেলিফোনে খবরটি আসার পর তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ভাষার দাবিতে আন্দোলনকারীদের বুকে গুলি চালানোর খবরে সোচ্চার হয়ে ওঠে রাজশাহীর ছাত্র-জনতা। ওই রাতেই রাজশাহী কলেজের এ ব্লকের আবাসিক শিক্ষার্থী গোলাম আরিফ টিপুর কক্ষে সভা হয়। সেই সভায় সিদ্ধান্ত হয় শহীদদের সম্মানে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের।

কিন্তু তখনকার দিনে শহীদ মিনার বা স্মৃতিস্তম্ভ সম্পর্কে কোনো ধারণাই ছিল না কারও। এরপরও রাত সাড়ে নয়টায় শুরু হলো নির্মাণকাজ। পাশেই ছিল হোস্টেল নির্মাণের জন্য ইট-কাঠ। সেই ইট-কাঠের সঙ্গে কাদামাটি মিশিয়ে রাত ১২টার মধ্যে নির্মিত হয় দেশের প্রথম শহীদ মিনার। তখন মাটিতে কালি দিয়ে দিয়ে লিখে দেওয়া হয়েছিল ‘শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ’। এভাবেই রচিত হয়েছিল মহান ভাষাশহীদদের সম্মানে নির্মিত প্রথম শহীদ মিনারের ইতিহাস। কিন্তু পরদিনই ২২ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন পুলিশ শহীদ মিনারটি ভেঙে দেয়।

এদিকে, নির্ধারিত স্থানে রাজশাহী কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার নির্মাণে বাধা দেওয়ায় ক্ষুদ্ধ রাজশাহীর মেয়র ও এমপিসহ যুক্তিযোদ্ধারা। গত ১৬ ডিসেম্বর এ শহীদ নিমান নির্মাণ কাজ উদ্বোধন করা হয়েছিল। শহীদ মিনার নির্মাণে বাধা দেয়ায় গত ২৫ জানুয়ারি উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আলী সরকারকে আওয়ামী লীগ থেকে বহিস্কার করা হয়। তিনি নগর আওয়ামী লীগের ১৪ নং ওয়ার্ডের সদস্য ছিলেন। এই জায়গায় জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা করেছে।

সিটি মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন বলেন, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার নির্মাণের দাবিটি রাজশাহীবাসীর প্রাণের দাবি। ভাষা সৈনিক, বীর মুক্তিযোদ্ধাবৃন্দ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও আদর্শে বিশ্বাসী রাজনৈতিক দলসহ সর্বস্তরের মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়ে মহানগরীর প্রাণকেন্দ্র সোনাদীঘি সংলগ্ন সার্ভে ইনস্টিটিউটের পরিত্যক্ত স্থানে রাজশাহী কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার নির্মাণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।

সেই পরিপ্রেক্ষিতে ইতোমধ্যে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়েছে। শহীদ মিনার নির্মাণে ইতোমধ্যে সাড়ে ১৬ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। শহীদ মিনার নির্মাণের ব্যাপারে শুরুতে জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান একমত থাকলেও পরবর্তীতে তিনি তার অবস্থান বদলে ফেলেন। রাজশাহীর সর্বস্তরের মানুষের প্রাণের দাবি রাজশাহী কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে বাধা দিয়ে আটকানো যাবে না।

সংসদ সদস্য ফজলে হোসেন বাদশা বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ম্যুরাল এবং শহীদ মিনার নির্মাণে বাধাদানকারী ব্যক্তি আওয়ামী লীগের দলীয় পদে থাকতে পারে না। পাকিস্তান আমলে শহীদ মিনার নির্মাণে বাধা দেওয়া হতো। তেমনিভাবে রাজশাহীতে শহীদ মিনার নির্মাণে বাধা দেওয়া হচ্ছে। রাজশাহী জেলা পরিষদের যেসব ছোট ছোট জায়গা আছে, সেগুলো যেন মিনি পাকিস্তান। সেখানে বঙ্গবন্ধুর ম্যুরাল ও শহীদ মিনার করতে দেওয়া হচ্ছে না। বঙ্গবন্ধুর ম্যুরাল ও কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের বিরোধীতাকারীদের ছাড় দেওয়া হবে না।

বীর মুক্তিযোদ্ধা প্রফেসর রুহুল আমিন প্রামাণিক বলেন, আমরা গত ১৬ ডিসেম্বর মহান বিজয় দিবসে ইতোমধ্যে রাজশাহী কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছি। সেই শহীদ মিনার নির্মাণে বাধা এসেছে। যতই বাধা আসুক, সেখান থেকে শহীদ মিনার কেউ সরাতে পারবে না। সেখানেই প্রতীকি শহীদ মিনারে আমরা আগামী ২১ ফেব্রুয়ারি পুষ্পস্তবক অর্পণ করবো।

তিনি বলেন, শহীদ নিমার নির্ধারিত স্থানেই হবে। শহীদ মিনারের ব্যাপারে কোন আপোষ নেই। শহীদ মিনার নির্মাণে বাধা দানকারীদের বিরুদ্ধে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলা হবে।

  • 952
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
উপরে