রাজশাহীর ৬০ শতাংশ তরুণ-তরুণী মানসিক রোগে আক্রান্ত

প্রকাশিত: জানুয়ারি ২১, ২০২১; সময়: ১১:০৯ am |

তারেক মাহমুদ : করোনাকালে রাজশাহীতে মানসিক রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ সংখ্যা বৃদ্ধির পেছনে অন্যতম কারণ হিসেবে সংশ্লিষ্টরা করোনাভাইরাসের সংক্রমণকে দায়ী করছেন। যারা মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন তাদের বেশির ভাগই তরুণ তরুণী। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসকরা জানাচ্ছেন, করোনার মধ্যে অনেক মানুষের জীবন ও আচরণে পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

চাকরি, ব্যবসা মন্দা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হওয়ায় শিক্ষার্থীরা ভবিষৎ জীবন নিয়ে অনেক দুশ্চিন্তায় আছেন । সেই দুশ্চিন্তা থেকেই তারা মানসিক রোগে আক্রান্ত হয়েছে। করোনায় হাসপাতাল ও ডাক্তারের ব্যক্তিগত চেম্বারের পাশাপাশি অনলাইন এবং টেলিমেডিসিন সেবা নিচ্ছে বেশিরভাগ তরুণ-তরুণী। চিকিৎসকদের মতে, তরুণদের প্রায় ৬০ শতাংশ বিভিন্নভাবে মানসিক সমস্যায় ভুগছে।

এদিকে হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, রামেক হাসপাতালের বহির্বিভাগের মনোরোগ বিভাগে মহামারির আগের তুলনায় এখন প্রতি মাসে গড়ে বেশি রোগী চিকিৎসা নিচ্ছে। হাসপাতালের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনা মহামারিতে পুরনো রোগীদের সমস্যা আরও বেড়েছে এবং নতুন করে অনেকেই মানসিক রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। অর্থাৎ করোনা মহামারিতে মানসিক রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, এখনই যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া না হলে মানসিক রোগের সমস্যা মারাত্মক হতে পারে।

হাসপাতাল সূত্রে জানায়, রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বহির্বিভাগের মনোরোগ বিভাগে গত বছরের মার্চ মাস থেকে ডিসেম্বর মাস পর্যান্ত ৫ হাজারের অধিক রোগী সেবা নিয়েছে। এর মধ্যে বেশি রোগী ছিল জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে। মে মাসে রোগীর সংখ্যা ছিলো ৪৬১ জন। কিন্তু আগস্ট মাসে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৬৫১ জনে। এদিকে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সিপিডির এক জরিপ বলছে, সারা দেশে করোনায় ৮০ শতাংশ যুবকের আয় কমে গেছে। আর করোনার কারণে ৯৬ শতাংশ যুবকই বিভিন্ন ধরনের মানসিক সমস্যায় ভুগছেন। এর মধ্যে ৫৯ শতাংশ জানান, তারা প্রকট মানসিক সমস্যায় ভুগছেন। আর গ্রামের তুলনায় শহরের যুবকরা বেশি চাপে আছে।

রামেক হাসপাতাল চিকিৎসকের ভাষ্যমতে, মহামারিতে দুই ধরনের মানসিক রোগী পাওয়া যাচ্ছে। এর মধ্যে এক দল আছেন যারা করোনাভাইরাস সংক্রমিত না হলেও সংক্রমণের ভয়ে থাকে। পরিচিত কিংবা স্বজনদের কাউকে করোনায় আক্রান্ত হতে দেখে উদ্বেগ থেকে মানসিক সমস্যায় ভুগছেন। অন্য দলের রোগীরা করোনায় আক্রান্ত হয়ে সুস্থতার পর আবারো সংক্রমণের ভয় থেকে এবং অন্যান্য শারীরিক সমস্যার কারণেও বারা আতঙ্কিত হচ্ছে ও মানসিক সমস্যায় ভুগছেন। চিকিৎসকরা বলছেন, এ ধরনের রোগীদের দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার প্রয়োজন।

মনোরোগ চিকিৎসকদের মতে, দীর্ঘ সময় ঘরের বাইরে যেতে না পারা, চাকরি হারানো, জীবিকা ও ব্যবসায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া, প্রিয়জনের মৃত্যু, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় সব বয়সী মানুষই মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হচ্ছেন। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত চিকিৎসকগণ মানুষকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা, শরীরচর্চা করা, পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ করা এবং ভিড় এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিচ্ছেন।

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মনোরোগ বিভাগের চিকিৎসক ডা. রাকিবুজ্জামান চৌধুরী বলেন, ‘আগে থেকেই যারা মানসিক সমস্যায় ভুগছিলেন মহামারিতে তাদের সমস্যা কিছু বৃদ্ধি পেয়েছে। আবার নতুন করেও অনেকে মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত হয়েছেন। বিশেষ করে এখন যারা আমাদের কাছে চিকিৎসা নিতে আসছেন, তারা উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা, মাদকাসক্তি ও বিষণœতার মতো সমস্যায় ভুগছেন। করোনার মধ্যে লকডাউনের পরে মানসিক রোগে আক্রান্ত রোগীদের সংখ্যা আকস্মিকভাবেই বৃদ্ধি পেতে থাকে। তবে আমরা ওই সময় শুধু হাসপাতালেই নয়- অনলাইন ও টেলিমেডিসিন সেবাও দিয়েছি হাজার হাজার মানুষকে।

মনোরোগ বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. মোস্তাফা আলীম জানান, মানুষ কাজ থেকে বি”্যূত হলে কিংবা নানা কারণে দুশ্চিন্তা ও সমস্যায় পড়লে মানসিক সমস্যা হতে পারে। করোনাকালে শিক্ষার্থীদের মাঝে এই সমস্যা সবচেয়ে বেশি লক্ষ করা গেছে। দীর্ঘদিন ঘরে বন্দি জীবন-যাপনের কারণে এবং জীবন ও জীবিকার অনিশ্চয়তার জন্য অনেকেই মানসিক চাপে রয়েছেন। আবার পরিবারের উপার্জনক্ষম মানুষটি পেশা হারালে তার পরিবারের অস্য সদস্যরাও মানসিক সমস্যায় ভোগেন। এ সময় দুশ্চিন্ত- উত্তেগনায় বিষণœতা বেড়ে যায়Ñবিকল্প আয় রোগারের পথ অন্ষেণ করতে গিয়ে অনেক সময় অবৈধ কাজে লিপ্ত হয়। করোনাকালে এই সমস্যা বেশি দেখা দিচ্ছে।

  • 1.4K
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
উপরে