রামেক হাসপাতালের বেপরোয়া দালালদের এবার পুলিশকে হুমকি

প্রকাশিত: জানুয়ারি ১২, ২০২১; সময়: ৭:৫১ pm |

তারেক মাহমুদ  : বেপরোয়া হয়ে উঠেছে রোগী ধরা দালালরা। জামিনে বেরিয়ে এসে নামে-বেনামে পুলিশকে হুমকি দিতেও ভয় করছে না তারা। দালালদের কতিপয় ব্যক্তি রাজনৈতিক নেতা পরিচয়ে কিংবা সাংবাদিক পরিচয়ে মদদ দিয়ে যাচ্ছে। দালালরা পুলিশের হাতে ধরা পড়লে ওই নামধারীরা তদবিরে নেমে পড়ে। আর এসব কাজে সমন্বয় করে থাকে দালালদের আশ্রয়-প্রশ্রয়দানকারী বেসরকারি ক্লিনিক ও হাসপাতালের মালিক, কর্মচারী ও চিকিৎসকরা।

সম্প্রতি রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দালালদের দৌরাত্ম্য সীমা ছাড়ালে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও পুলিশ বিভাগ শুদ্ধি অভিযান শুরু করেন। সাম্প্রতিক সময়ে নিয়মিত অভিযানে বেশ কিছু দালাল গ্রেফতার হয়। এরপরই দালালরা বেপরোয়া হয়ে উঠে এবং দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যদের হুমকি দিতে থাকে। তবে পুলিশের একটি সূত্রও বলছে, পুলিশ তাদের হুমকিতে শঙ্কিত নয়। রোগী ধরা দালালদের বিরুদ্ধে শুদ্ধি অভিযান অব্যাহত থাকবে। এই ব্যাপারে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও ভুক্তভোগীরা পুলিশকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। যাতে করে দালালমুক্ত পরিবেশে রোগী ও তাদের স্বজনরা নির্বিঘ্নে চিকিৎসাসেবা নিতে পারেন।

জানা গেছে, সুষ্ঠু পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গত ডিসেম্বর মাস থেকেই রোগীধরা দালালদের ধড়পাকড় অব্যাহত রেখেছেন আইনশৃঙ্খল রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। এরপরও দালালদের উৎপাত কমেনি। তারা বিভিন্ন কৌশলে আগত রোগী ও স্বজনদের মিথ্যা প্রলোভন দেখিয়ে হয়রানি করছে এবং তাদের কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে।

রাজপাড়া থানা পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, দালালরা বেনামে রামেক হাসপাতাল বক্স ও নগরীর লক্ষ¥ীপুর পুলিশ ফাঁড়ির দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যদের হুমকি দেয়ার বিষয়টি জানা গেছে। অন্যদিকে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যরা দালাল নির্মূলে কাজ করায় কয়েকটি সিন্ডিকেট এই পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে নগরীর রাজপাড়া থানায় মৌখিক ও লিখিতভাবে নানা বিষয়ে অভিযোগ দিয়েছে।

এদিকে রামেক হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, আগের চেয়ে দালালদের দৃশ্যমান উৎপাত কম হলেও নেপথ্যে তাদের সার্বক্ষণিক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। এজন্য তারা নতুন কৌশল হিসেবে হাসপাতালে ঢুকেই রোগী সেজে টিকিট কেটে নিচ্ছে। পুলিশ তাদের ধরলে টিকিটের কথা বলে সেবা নেয়ার বিষয় জানাচ্ছে। তবে এবার তাদের এই কৌশলটি ধরে ফেলেছে পুলিশ।

অন্যদিকে হাসপাতালের বাইরে রাস্তায় দাঁড়িয়ে লক্ষ¥ীপুরের বিভিন্ন দোকান থেকেও তারা কার্যক্রম চালাচ্ছে। পুলিশের পক্ষ থেকে তাদের বিরুদ্ধে চলছে নিয়মিত অভিযান। চিহ্নিত করা হচ্ছে দালালদের, করা হচ্ছে তালিকা।

হাসপাতালে দালালদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযানে কাজ করছেন নগরীর রাজপাড়া থানা পুলিশের সদস্যরা। আর প্রাথমিক অবস্থায় তাদের ধরতে সক্রিয় থাকছেন লক্ষ¥ীপুর পুলিশ ফাঁড়ির সদস্যরা। দালালদের কাজে বাধাগ্রস্ত হওয়ায় লক্ষ্মীপুর পুলিশ ফাঁড়ির সদস্যদের এখন বেনামে হুমকি দিচ্ছে দালাল সিন্ডিকেট।

জানা গেছে, দালালদের সহযোগিতা করছেন রাজনৈতিক ও সাংবাদিক পরিচয়ে স্থানীয় কিছু ব্যক্তি ও প্রভাবশালীরা। হাসপাতালের বাইরে ফুটপাতের দোকানগুলো পুলিশ কয়েক সপ্তাহ আগে সরিয়েছে। অবৈধ দোকানগুলোতে ব্যাপক যানজট ছিলো ও দালালরা বসে বসে রোগী চিহ্নিত করতো। কিন্তু নতুন করে ওইসব দোকান বসানোর জন্য রাজনৈতিক ও সাংবাদিক পরিচয়ের ওই ব্যক্তিরা পুলিশের কাছে তদবির করছেন। তবে পুলিশ সদস্যরা জানাচ্ছেন, জনস্বার্থে এই দোকানগুলো সরিয়ে হাসপাতালের সুন্দর পরিবেশ ফেরাতে কাজ করা হচ্ছে। কোনোভাবেই এই অবৈধ দোকান আর বসতে দেয়া হবে না।

নগরীর রাজপাড়া থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মাজহারুল ইসলাম জানান, হাসপাতালের পরিবেশ ঠিক রাখতে দালাল নির্মূলে আমরা প্রতিনিয়ত কাজ করে যাচ্ছি। নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে। দালাল নির্মূল করতে যা যা করা দরকার আমরা করবো। পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে থানায় দালালদের বেনামে অভিযোগ দেয়ার বিষয়ে ওসি মাজহারুল ইসলাম জানান, কয়েকটি বিষয়ে অভিযোগ দিয়েছে, বিষয়টি আমরা দেখছি।

রাজশাহী মহানগর পুলিশের মুখপাত্র ও অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (সদর) গোলাম রুহুল কুদ্দুস জানান, দালালদের ধরতে প্রতিনিয়ত আমরা কাজ করে যাচ্ছি। নিয়মিত অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেফতার করা হচ্ছে। হাসপাতালে দালালমুক্ত করার জন্য আমাদের অভিযান থাকবে। নানা পরিকল্পনা করে দালালমুক্ত করার জন্য কাজ করে যাচ্ছি।

রামেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শামীম ইয়াজউদ্দিন জানান, হাসপাতাল দালালমুক্ত করার জন্য সংশ্লিষ্টদের নিয়ে কাজ করছি। সেই সাথে চিকিৎসকসহ দায়িত্বরতদের নিয়ে গুরুত্বসহকারে বিষয়টি আলোচনা করা হয়েছে। হাসপাতালে যেন দালাল না থাকে, সে বিষয়ে পদক্ষেপ নিয়েছি। হাসপাতালে যাতে দালালরা প্রবেশ করতে না পারে। সে বিষয়ে হাসপাতালের পুলিশ ও আনসার সদস্যদের বিভিন্ন দিকনির্দেশনা দেয়া হয়েছে। হাসপাতালে দালালমুক্ত পরিবেশ রাখার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে।

ভুক্তভোগী ও রাজশাহী জেলা জাসদের সহসভাপতি মোস্তাক আহমেদ মাসুম জানান, হাসপাতালের সুন্দর পরিবেশ রাখতে দালাল নির্মূল করা গুরুত্বপূর্ণ। দূরদূরন্ত থেকে চিকিৎসা নিতে আসা মানুষ রাজশাহীর অতিথি। তাদের নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা সচেতন রাজশাহীবাসীর দায়িত্ব। দালালদের জন্য বাইরে থেকে আসা রোগীরা ভোগান্তি ও প্রতারণার শিকার হবে এটা আমাদের কাম্য নয়। এটা রাজশাহীবাসীর জন্য লজ্জাজনক। অচিরেই ভ্রাম্যমান আদালতের মাধ্যমে এই সকল প্রতারক দালাল ও তাদের সহযোগী এবং দালালদের আশ্রয়দাতাদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তÍমূলক শাস্তি প্রদান করে রাজশাহীবাসীকে লজ্জার হাত থেকে রক্ষা করা খুবই প্রয়োজন। এতে করে অসহায় দরিদ্র চিকিৎসা নিতে আসা মানুষগুলো প্রতারণার হাত থেকে বাঁচবে। এবং রাজশাহীবাসী গৌরবান্বিত হবে।

এ ব্যাপারে রাজশাহীর বিশিষ্ট আইনজীবী আসলাম সরকার জানান, দালালদের জন্য সুনির্দিষ্টভাবে কোনো আইন নেই। তবে প্রতারণার আইন ৪২০ ধারায় তাদের সাজা দেয়া যাবে। হাসপাতালে দালাল চিহ্নিত করে জনকল্যাণের স্বার্থে ম্যাজিস্ট্রেট দিয়ে দালালদের ৪২০ ধারায় সাজা দেয়া যায়।

মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার আব্দুল মান্নান জানান, এই বিষয়ে আমি রাজশাহী জেলা প্রশাসকের সাথে কথা বলবো। এই দালালদের জন্য রাজশাহী শহরে সেবা নিতে এসে অনেক অসহায় মানুষ নিঃস্ব হয়ে বাড়ি ফিরে যায়। মাঝে মাঝে অভিযান চলছে কিছু দালাল ছাড়া পেয়ে যাচ্ছে। আবারো তারা প্রতারণার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের জন্য কঠোর আইন করা দরকার। ভ্রাম্যমান আদালতে তাদের কঠোর শাস্তি দিতে হবে।

এদিকে আইনের ৪২০ ধারায় বলা হয়েছে, প্রতারণা এবং বেআইনিভাবে সম্পত্তির প্রস্তাবের প্ররোচনা.- যে কেউ প্রতারণা করে এবং এর দ্বারা অপ্রত্যক্ষভাবে কোনো ব্যক্তির কাছে কোনো সম্পত্তি হস্তান্তরের উদ্দেশ্যে প্রতারিত হয়, অথবা কোনো মূল্যবান নিরাপত্তার পুরো বা কোনো অংশকে পরিবর্তন করে বা ধ্বংস করে, স্বাক্ষরিত বা সিলমোহরযুক্ত এবং যা একটি মূল্যবান নিরাপত্তা রূপান্তরিত করার ক্ষমতা রাখে। তাকে সাত বছরের কারাদণ্ডের মেয়াদ বা কারাদণ্ডে দণ্ডিত হতে পারে এবং দোষী সাব্যস্ত হতে হবে।

আইনজীবী আসলাম সরকার আরও জানান, হাসপাতালে দালালচক্র রয়েছে এরা নগরীর বিভিন্ন বে-সরকারি হাসপাতাল, প্যাথলজি ও ফার্মেসিতে রামেক হাসপাতালের রোগী নিয়ে প্রতারণা করছে দীর্ঘদিন থেকে। জনকল্যাণ ও জনস্বার্থে হাসপাতালে নিয়মিত অভিযান করে সিসি টিভির ফুটেজ দেখে দালাল চিহ্নিত করতে হবে। একজন দালাল একাধিকবার এই কাজ করলে তাদের ধরে জবানবন্দি নিয়ে তারা স্বীকার করলে ৪২০ ধারায় যে প্রতারণার সাজা আছে সেই সাজা দিতে হবে। আর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কঠোরভাবে নির্দেশ দিলে পুলিশ প্রতিনিয়ত অভিযান করলে বাকি দালালরা শাস্তির ভয়ে প্রতারণার এই পথ ছেড়ে দিতে পারে।

উল্লেখ্য, কয়েক বছর থেকেই রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বেপরোয়া দালালচক্র। মাঝে মাঝেই রোগী ও স্বজনদের উপরে প্রকাশ্যে মারধরের ঘটনাও ঘটছে। মাঝে মাঝে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে দালালদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা হয়। দালালদের আটক করে জেল হাজতে পাঠানো হয়েছে। কিন্তু তারা জামিনে খুব সহজেই মুক্তি পায়। এরপর আবারো চলে দালালদের দৌরাত্ম্য।

১৩ ডিসেম্বর রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বর্হিবিভাগের চিকিৎসা নিতে আসা এক নারী রোগীকে বেদম পিটিয়েছিলো দালালরা। পরে পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশিত হয়। এরপর থেকেই হাসপাতালে দালাল মুক্ত করার নির্দেশ দেন কর্তৃপক্ষ। এছাড়াও হাসপাতালে কর্তব্যরত কিছু চিকিৎসক ও কর্মকর্তা প্রতিবাদ করলেও তাদেরকে দেখানো হয়েছে ভয়ভীতি। ফলে মানসম্মানের ভয়ে তারাও কিছু বলতে পারছিলেন না।

  • 139
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
উপরে