রাজশাহীতে সুইস অ্যালবিনো জাতের ইঁদুরের বাণিজ্যিক খামার

প্রকাশিত: জানুয়ারি ৫, ২০২১; সময়: ২:১৬ pm |

নিজস্ব প্রতিবেদক : নিতান্ত শখের বসে চারটি ইঁদুর নিয়ে লালন পালন করা শুরু। সেখান থেকেই এখন শয়ে শয়ে ইঁদুর পালন করে বিক্রি করছেন রাজশাহীর সালাহউদ্দিন মামুন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণীবিদ্যা বিভাগের গবেষণার পরিচারক তিনি।মাত্র তিন বছর আগে শখের বসে শুরু করা ইঁদুর থেকে এখন তিনি বিক্রি করে মাসে হাজার হাজার টাকা উপার্জন করছেন।তার কাছ থেকে দেশের বিভিন্ন গবেষণা সংস্থা ইঁদুর ক্রয় করে নিয়ে গিয়ে গবেষণা করছেন।

গত বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজশাহীর কাটাখালীর পৌর এলাকায় তার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, ইঁদুর লালন পালন করার জন্য ছোট আকৃতির একটি কক্ষ পুরোটাই নেট দিয়ে ঢেকে দিয়েছেন সালাহউদ্দিন মামুন। মেঝেতে কয়েকটি খাঁচি রয়েছে। কাঁচির ওপর হার্ডবোর্ডের তৈরি ৮ থেকে ১০টি বাক্স। সেসব বক্সে রয়েছে ইঁদুর। কোনো কোনো বক্সে সদ্য জন্ম দেওয়া ইঁদুরের বাচ্চাও চোখে পড়লো।

সালাহউদ্দিন মামুন জানান, ২০১৭ সালে প্রাণীবিদ্যা বিভাগের এক পিএইচডি গবেষকের গবেষণার পর অতিরিক্ত চারটি ইঁদুর বেচে যায়। তিনি সেই ইঁদুরগুলো ছেড়ে দিচ্ছিলেন।টিস্যু খুব দুর্বল হওয়ায় খোলা পরিবেশে টিকতে পারবে না মনে করে ইঁদুরগুলো আমি বাড়িতে নিয়ে আসি।তার মধ্যে দুইটি মা ইঁদুর ছিলো।এক মাস পর দুইটা মা ইঁদুর থেকে ২০ টা ইঁদুরের বাচ্চা পাওয়া যায়।এভাবে প্রায় প্রতিমাসে ইঁদুরের বাচ্চা দিতে লাগলো।সেই চারটা ইঁদুর থেকে ১০০০ পিস পর্যন্ত ইঁদুর হয়েছে ।

তিনি জানান, একটি মা ইঁদুর থেকে একবারে ৮ থেকে ১০টি বাচ্চা পাওয়া যায়। বছরে কমপক্ষে আট থেকে ১০টি বাচ্চা পাওয়া যায়। আমাদের আবহাওয়া ইঁদুর উৎপাদনের জন্য খুব অনুকূলে। এইজন্য বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় আমাদের দেশে মা ইঁদুর বেশি সংখ্যকবার বাচ্চা দেয়। ইউরোপসহ অন্যান্য দেশে যেখানে বছরে দুই থেকে তিনবার একটি মা ইঁদুর বাচ্চা দেয় সেখানে আমাদের দেশে আট থেকে ১০ বার বাচ্চা পাওয়া যায়।আবার লালনপালনের খরচও কম হওয়ায় খুব লাভজনক।একটা ইঁদুর দিনে চার থেকে পাঁচগ্রাম খাবার খায়।তবে বিক্রি করে বেশ লাভজনক। শখের বসে শুরু হওয়া খাবার থেকে আমি এ পর্যন্ত ৫ হাজার পিস ইঁদুর উৎপাদন করে বিক্রি করেছি দেশের বিভিন্ন গবেষণাগারে।

সালাহউদ্দিন মামুন জানান, ইঁদুর লালন পালন শুরু করার এক মাস পর আমি প্রথম রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণীবিদ্যা বিভাগের মিউজিয়ামের রায়হান ভাইয়ের কাছে ২০ পিস ইঁদুর দিয়েছিলাম। তিনি আমাকে ১০০০ টাকা দিয়েছিলেন। এর একমাস পর বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড বায়োটেকনোলজিকে আরো ২০ পিস ইঁদুর দেওয়া হয়।এভাবে ক্রমান্বয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োকেমেস্ট্রি, ফার্মেসী ও প্রাণীবিদ্যা বিভাগে নিতে শুরু করলো।এছাড়া বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসী বিভাগও ইঁদুর নিতো।তখন প্রতি পিস ইঁদুর বিক্রি করেছি ৪০ টাকায়।বাচ্চা দেওয়ার এক মাসের মধ্যে ইঁদুর বিক্রির উপযোগী হয়।

সালাহউদ্দিন মামুন জানান, তবে করোনাভাইরাসের কারণে সব ক্যাম্পাস বন্ধ থাকায় প্রচুর ইঁদুর জমা হয়ে পড়েছিলো। প্রচুর ইঁদুর অবিক্রিত হয়ে পড়ে। গত অক্টোবর মাসেও আমার কাছে এক হাজার পিস ইঁদুর ছিলো।এর মধ্যে প্রতিটি ইঁদুর ৭০ টাকা হিসেবে ২৫০ পিস ও ১৫০ পিস করে ঢাকার দুইটি ফার্মাসিউটিক্যালস প্রতিষ্ঠান ক্রয় করে নিয়ে গেছে। ইঁদুর রাখার জায়গা ছোট হওয়ায় ৪০০ পিসের ওপর ইঁদুর বিড়ালকে দিয়ে খাইয়েছি।বর্তমানে আমার কাছে ১৫০ পিসের মতো ইঁদুর রয়েছে।তবে এখন ইঁদুরের বেশ চাহিদা তৈরি হয়েছে।দেশের বিভিন্ন ইউনিভার্সিটি আমার কাছ থেকে ইঁদুর নেওয়ার জন্য ফোন করছে।এর মধ্যে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং সিরাজগঞ্জের খাজা ইউনুস আলী মেডিকেল কলেজ থেকেও অর্ডার পেয়েছি।

সালাহউদ্দিন মামুন জানান, ঠিকমতো প্রচার করা গেলে প্রচুর বেচাবিক্রি হওয়ার সম্ভাবনা আছে। আমার যতটুকু বিক্রি হয়েছে তার সবই এর ওর কাছ থেকে লোকজন শুনে আমার কাছে ইঁদুর কিনতে এসেছেন। আমি কোনো প্রচার করিনি।তারপরও আমার বেচাবিক্রি ভালো হয়েছে।

সালাহউদ্দিন মামুন জানান, ইঁদুর বিক্রি করে এখন প্রতি মাসে গড়ে ৫ হাজার টাকা আয় হয়। একটা বড় ঘর করে নেট দিয়ে পুরোটাই ঢেকে ১০০ পিস মা ইঁদুর আর ২০ পিস বাবা ইঁদুর রাখলে মাসে মাসে কয়েকগুণ আয় বৃদ্ধি করা সম্ভব।কারণ ১০০ পিস মা ইঁদুর আর ২০ পিস বাবা ইঁদুর থেকে মাসে ৫০০ থেকে ১০০০ পিস ইঁদুর উৎপাদন করা সম্ভব। যা থেকে ৩৫ থেকে ৭০ হাজার টাকা উপার্জন করা সম্ভব। আমার পরিকল্পনা এখন আরেকটি বড় ঘর করে সেখানে প্রতিমাসে ৫০০ থেকে ১০০০ ইঁদুর উৎপাদন করা।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনেটিকস অ্যান্ড বায়োটেকনোলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আবু রেজা বলেন, আমি কয়েক মাস পরপর তার কাছে থেকে ৫০টি করে ইঁদুর নিই। বিভিন্ন ধরনের গবেষণায় তার কাছ নেওয়া ইঁদুরগুলো কাজে লাগে।যতবেশি অ্যাপ্লিকেশন তত বেশি ইঁদুরের প্রয়োজন হয়। কারণ গবেষণায় প্রয়োগ সরাসরি মানবকুলের ওপর করা যায় না। সেক্ষেত্রে ইঁদুর খুব কাজে লাগে। আর সুইস অ্যালবিনো ইঁদুর গবেষণার কাজেই ব্যবহার করা হয়।

  • 11
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
উপরে