বিএনপির সাবেক মেয়ররা এখন কোনঠাসা

প্রকাশিত: মে ১২, ২০২২; সময়: ১:১৯ pm |

পদ্মাটাইমস ডেস্ক : কেউ জাগদল থেকে বিএনপির রাজনীতিতে যুক্ত। কেউ আবার ছাত্রদল থেকে ধাপে ধাপে মূল দলে জায়গা করেছেন। দলের সমর্থনে একাধিকবার নিজ সিটি করপোরেশনের মেয়রের চেয়ারে বসেন। বিপুল ভোটে জয়ী হওয়া এমন একাধিক বর্তমান ও সাবেক মেয়ররা এখন অনেকটা কোনঠাসা অবস্থায় আছেন। কাউকে স্থানীয় বিএনপির পদ থেকে সরিয়ে রাখা হয়েছে। কারো আবার কর্মী-সমর্থকদের পদপদবী না দিয়ে চাপের মুখে ঠেলে দেয়া হয়েছে। এসব নিয়ে মনোকষ্টে আছেন বিএনপির মেয়ররা।

বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা ও সাবেক মেয়র নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘দল কি অধ্যাপক দিয়ে না প্রভাষক দিয়ে চালাবে সেই সিদ্ধান্ত আগে নিতে হবে। সব জায়গায় পূরানোর পদ থেকে পুরোপুরি বাদ দিয়ে দল গোছানোর চিন্তা করলে বুমেরাং হবে।’

অবশ্য বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খানের দাবি বিএনপিতে অসন্তোষও নেই। তিনি বলেন, ‘দল পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে নতুন কমিটি হয়। একজন সবসময় এক পদে থাকবেন এটার সুযোগ নেই। ’

মনিরুজ্জামান মনি
২০১৩সালে আওয়ামী লীগের প্রার্থীকে প্রায় ৬০হাজার ভোটের ব্যবধানে হারিয়ে খুলনার মেয়র নির্বাচিত হন মনিরুজ্জামান মনি। ২০১৫ সালের ৩ নভেম্বর ফৌজদারি মামলায় অভিযুক্ত হওয়ায় তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। অবশ্য পরের বছর উচ্চ আদালতের নির্দেশের তিনি স্বপদে বহাল হন।

২০১৮সালের সিটি নির্বাচনে প্রার্থী হিসেবে নগর বিএনপির পক্ষ থেকে তার একক নামই কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতারা তাকে মনোনয়ন দেয়নি। মনোনয়ন দেয়া হয় তৎকালিন নগর বিএনপির সভাপতি নজরুল ইসলাম মঞ্জুকে। তিনি আওয়ামী লীগের তালুকদার আব্দুল খালেকের কাছে হেরে যান।

এ কারণে কিছুটা দূরত্ব তৈরী হয়। সবশেষ গত ডিসেম্বরে খুলনা মহানগরের কমিটি থেকে বাদ পড়েন নেতাকর্মীদের কাছে দুর্দিনের কাণ্ডারি বলে খ্যাত নজরুল ইসলাম মঞ্জু ও মনিরুজ্জামান মনি। এর প্রতিবাদ করায় দল থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মঞ্জুকে।

মজিবুর রহমান সরোয়ার
বরিশালের রাজনীতিতে প্রভাবশালী ব্যক্তি হিসেবে পরিচিতি মজিবর রহমান সরোয়ারের। বরিশাল সদর আসনের তিনি চারবারের সাংসদ। সাবেক মেয়র, সাবেক হুইপও ছিলেন। ভোটের রাজনীতিতে প্রথমবারের মতো ২০১৮ সালে সিটি নির্বাচনে সাদিক আব্দুল্লাহর কাছে হেরে যান সরোয়ার।

বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম মহাসচিব হিসেবে আছেন। চেয়েছিলেন মহানগরের নেতৃত্বে থাকবেন। কিন্তু গত ৩ নভেম্বর মজিবর রহমান সরোয়ারকে বাদ দিয়ে বরিশাল মহানগর বিএনপির নতুন আহ্বায়ক কমিটি হয়। যাতে তার ঘনিষ্ঠদের জায়গা হয়নি। বরং নেতৃত্বে এসেছেন তার প্রতিপক্ষ হিসেবে পরিচিত নেতারা।

এরমধ্য দিয়ে সরোয়ারের প্রায় তিন দশকের একক আধিপত্যের অবসান হয়েছে বলে মনে করেন স্থানীয়রা।

এম মনজুর আলম
বিএনপির প্রার্থী হিসেবে ২০১০ সালে চট্টগ্রামের দাপুটে নেতা, সাবেক মেয়র এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীকে প্রায় লক্ষাধিক ভোটের ব্যবধানে হারিয়েছিলেন এম মনজুর আলম। ভোট পেয়েছিলেন ৪ লাখ ৭৯ হাজার ১৪৫। কিন্তু এক দশকের ব্যবধানে দল পাল্টে আওয়ামী লীগ থেকে মেয়র পদে লড়ার চেষ্টা করেন তিনি। ২০২০ সালের সিটি নির্বাচনে মনোনয়নও সংগ্রহ করেছিলেন মহিউদ্দিন-শীষ্য মনজুর। তবে বঞ্চিত হয়েছেন।

মহিউদ্দিন চৌধুরীকে হারানোর পর সবাইকে চমকে দেয়া মনজুরকে পরবর্তিতে পুরস্কৃত করে বিএনপি। করা হয় বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা। বিএনপির টিকিটে মেয়র হলেও মনজুরের আওয়ামী লীগ ঘেষা ছিলেন। যে কারণে বিএনপি নেতাদের ক্ষোভ ছিল তার প্রতি। তবু পরের নির্বাচনে তাকেই ধানের শীষের টিকিট দেয় বিএনপি। কিন্তু মনজুর নির্বাচনে আ জ ম নাছিরের কৌশলের কাছে কুলিয়ে উঠতে পারেননি।

পরে ২০১৫ সালে মাঝপথে ভোট থেকে দল সরে দাঁড়ালে তিনি রাজনীতি ছাড়ার ঘোষণা দেন। যদিও পরের বছর আবার আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ফেরার চেষ্টা করেন তিনি। কিন্তু সুবিধা করতে পারেননি।

মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল
২০১৩ সালের রাজশাহী সিটির মেয়র হন মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল। প্রভাবশালী এই রাজনীতিক তখন মহানগর যুবদলের আহ্বায়ক ছিলেন। পরে অবশ্য আন্দোলনে পুলিশ হত্যাসহ একাধিক মামলার আসামি হয়ে বছরখানেক আত্মগোপনে ছিলেন। পরে ২০১৬ সালের ১৩মার্চ আদালতে আত্মসমর্পন করলে আদালত তাকে কারাগারে পাঠায়।

এরআগের অবশ্য মেয়র পদ থেকে বুলবুলকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়। ২০১৮ সালের ৩০ জুলাইয়ের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটনের সঙ্গে হেরে গেলেও ৭৮ হাজার ৪৯২ ভোট পেয়েছিলেন বুলবুল।

এদিকে দলের সবশেষ কাউন্সিলে কেন্দ্রীয় বন ও পরিবেশবিষয়ক সম্পাদক হন মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল। পাশাপাশি রাজশাহী মহানগর বিএনপির সাবেক সভাপতিও ছিলেন। তবে তিনি এখন কেন্দ্রীয় পদ ছাড়া সেই অর্থে কোথাও নেই। গতবছরের ডিসেম্বরে বুলবুলকে বাদ দিয়ে মহানগরের আহ্বায়ক কমিটি করা হয়। এরপর থেকে দলের প্রতি তিনি কিছুটা মনক্ষুন্ন বলে বুলবুলের ঘনিষ্ঠ সূত্রে জানা গেছে।

আরিফুল হক চৌধুরী
সিলেটে ছাত্রদলের প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য আরিফুল হক চৌধুরী ছাত্রদলের নেতৃত্ব দিয়ে বিএনপিরও নেতৃত্ব দিয়েছেন। নগর বিএনপির সভাপতির দায়িত্বও পালন করছেন। ২০১৩ সালে তিনি প্রথম সিটি নির্বাচন করে মেয়র পদে নির্বাচিত হন। ২০১৮ সালে দলীয় প্রতীক ধানের শীষ নিয়ে দ্বিতীয় বার মেয়র নির্বাচিত হন তিনি।

দলের এক পক্ষের অভিযোগ তিনি সরকারী দলের সঙ্গে সখ্যতা রেখে চলছেন। তবে মেয়রের ঘনিষ্ঠদের দাবি, তিনি যা করছেন সব সিলেটের উন্নয়নের স্বার্থে।

এসব কারণে বিএনপিতে অনেকটা সাইট লাইনে রাখা হয়েছে আরিফুলকে। বিএনপির বঞ্চিত অংশের নেতা তিনি। সিলেটে দুই ভাগে বিভক্ত দল। পদবি পাওয়া নেতারা চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের গ্রুপে। আর বঞ্চিতরা মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীর গ্রুপে। এ নিয়ে টানাপড়েন চলছে সিলেট বিএনপি।

২০১৯ সালে সিলেট জেলা ও মহানগর যুবদলের আহ্বায়ক কমিটি গঠনের প্রতিক্রিয়ায় চার কেন্দ্রীয় নেতাসহ পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছিলেন আরিফুল। অবশ্য পরে ফেরত দেয়া হয়েছে পদত্যাগপত্র।

এদিকে নিজের কর্তৃত্ব ধরে রাখতে জেলা বিএনপির কাউন্সিলে সভাপতি পদে আরিফুর প্রার্থী হয়েছিলেন। এ নিয়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। স্থগিত করা হয় সম্মেলন। পরে অবশ্য তিনি সরে দাঁড়ান।

এদিকে মাঝে দলীয় চেয়ারপারসনের মুক্তি ও উন্নত চিকিৎসার দাবিতে সিলেটের সমাবেশে প্রথমে তাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। এ নিয়ে মন খারাপও করেন তিনি। পরে অবশ্য তাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
উপে