আওয়ামী লীগের তৃণমূলে জট

প্রকাশিত: এপ্রিল ১৭, ২০২২; সময়: ১২:২৮ pm |

পদ্মাটাইমস ডেস্ক : ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সম্মেলন নিয়মিত হলেও দলে তৃণমূলের সম্মেলন বেশ অনিয়মিত। বছরের পর বছর সম্মেলন না হওয়ায় স্থানীয় পর্যায়ে দলের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। এ নিয়ে উপজেলার নেতারা দুষছেন জেলা নেতাদের, আর জেলার অভিযোগের আঙুল কেন্দ্রের দিকে। কেন্দ্রের অভিযোগ পদ আঁকড়ে থাকা তৃণমূল নেতাদের দিকে।

২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাসে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। তিন বছর মেয়াদি কমিটির মেয়াদ শেষে আগামী ডিসেম্বরে ২২তম সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। তবে আওয়ামী লীগের ৭৮টি সাংগঠনিক জেলা শাখার মধ্যে ৪২টি, ১০টি সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের মধ্যে পাঁচটি এবং আট শতাধিক উপজেলা ও পৌরসভার মধ্যে তিন শতাধিক কমিটির মেয়াদ এরই মধ্যে পেরিয়ে গেছে।

দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের অভিযোগ তৃণমূল নেতাদের তাগাদা দিলেও তাঁরা পদ আঁকড়ে থাকতে সম্মেলন করতে টালবাহানা করেন। ক্ষমতাসীন দলে পদ থাকলে তৃণমূলে নানারকম সুবিধা নেওয়া যায়। সম্মেলন হলে পদ হারিয়ে কামাই বন্ধের আশঙ্কায় অনেকেই পদ ছাড়তে চান না। তবে তৃণমূলের নেতারা

বলছেন, কেন্দ্র থেকে নির্দেশনা এলে সম্মেলন অনুষ্ঠানে তাঁদের সাংগঠনিক বাধ্যবাধকতা আছে।

দলের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ফারুক খান বলেন, তৃণমূলে নেতারা পদ ছাড়তে চান না। যখনই কেন্দ্র থেকে সম্মেলন আয়োজনের নির্দেশনা যায়, তৃণমূল নেতারা নানা টালবাহানা শুরু করেন। তাঁদের আবদার-অনুরোধ থাকে যে মাঠে লড়াই সংগ্রাম করেছি, নেতৃত্বে আর কয়টা দিন থাকি। এতে করে সম্মেলন করা হয় না, নতুন নেতৃত্বও তুলে আনা সম্ভব হয় না।

কেন্দ্রীয় নেতাদের ব্যর্থতার কারণে তৃণমূলের সম্মেলন নিয়মিত হয় না বলে স্বীকার করেছেন আওয়ামী লীগের একজন সাংগঠনিক সম্পাদক। তিনি বলেন, প্রায় সব স্তরের সম্মেলনই অনিয়মিত। কেন্দ্রীয় নেতাদের নজরদারির অভাবেই মূলত এমন হচ্ছে। সম্মেলনের পরে কমিটি পূর্ণাঙ্গ করতেও লেগে যায় এক থেকে দেড় বছর। পূর্ণাঙ্গ কমিটি করে তা অনুমোদনের জন্য কেন্দ্রে জমা দিলে যাচাই-বাছাই শেষে অনুমোদন পেতে পেতে চলে যায় আরও ছয় মাস থেকে এক বছর। ফলে জট শেষ আর হয় না।

ঢাকা বিভাগে ১৭টি জেলার মধ্যে রাজবাড়ী ছাড়া বাকি ১৬ জেলার সম্মেলন হয়নি। চট্টগ্রাম বিভাগে ১৫ জেলার মধ্যে ১০ জেলা কমিটির মেয়াদ ফুরিয়েছে। চট্টগ্রাম মহানগরে সম্মেলন ছাড়াই ২০১৩ সালে তিন বছর মেয়াদি কমিটি গঠন করা হয়েছিল।

নোয়াখালী জেলার কমিটি ভেঙে আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়েছে। ভেঙে দেওয়া কমিটির প্রভাবশালী সাধারণ সম্পাদক একরামুল করিম চৌধুরীকে স্থানীয় সাংসদ হিসেবে আহ্বায়ক কমিটিতে সদস্য হিসেবে রাখা হয়েছে। এ নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে উত্তেজনা ও অস্বস্তি আছে। ক্ষুব্ধ এই নেতা আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রকাশ্য ঘোষণা দিয়েছেন।

রংপুর বিভাগে ৯টি জেলার মধ্যে দিনাজপুর ও গাইবান্ধা এবং খুলনা বিভাগে ১১টি জেলার মধ্যে মাগুরা, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা ও ঝিনাইদহ জেলা কমিটির মেয়াদ শেষ। ময়মনসিংহ বিভাগে পাঁচ জেলা কমিটির সবগুলোর, বরিশাল বিভাগে সাত জেলার মধ্যে চার জেলা কমিটির ও সিলেট বিভাগে সুনামগঞ্জ জেলা কমিটির মেয়াদ নেই। তবে রাজশাহী বিভাগের ৯টি সাংগঠনিক জেলার সবগুলোর সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে।

দেশে বর্তমানে ৪৯৫টি উপজেলা ও ৩৩০টি পৌরসভা রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় চার শতাধিক সাংগঠনিক কমিটিরই মেয়াদ ফুরিয়েছে। কিশোরগঞ্জের কয়েকটি উপজেলায় দলীয় সম্মেলন হয়েছে প্রায় ২৭ বছর আগে। করিমগঞ্জ উপজেলার সম্মেলন হয়েছে ২৬ বছর আগে। এই কমিটির ৩৯ পদধারী নেতার ৩২ জনই মারা গেছেন বলে জানা গেছে। হোসেনপুর, কটিয়াদী, পাকুন্দিয়া, করিমগঞ্জ, তাড়াইল, ভৈরব, কুলিয়ারচর, ইটনা, মিঠামইন ও অষ্টগ্রাম উপজেলায় সম্মেলন হয়েছে ২০ থেকে ২৫ বছর আগে। মাদারীপুরের রাজৈর উপজেলার সম্মেলন হয়েছে ২৬ বছর আগে। ঢাকার লাগোয়া নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও উপজেলায় সম্মেলন হয়েছিল ২৫ বছর আগে।

শুধু কিশোরগঞ্জ বা মাদারীপুর নয়, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের জেলা নোয়াখালীর উপজেলাগুলোরও একই অবস্থা। জেলার কোম্পানীগঞ্জ ও কবিরহাট উপজেলা তাঁর সংসদীয় আসন। এই দুই উপজেলায় সম্মেলন হয়েছে ২০১২ সালে। দুটি উপজেলায় আওয়ামী লীগের প্রকাশ্য কোন্দল ও সংঘাতে প্রাণ হারিয়েছেন দুজন। কাদেরের ছোট ভাই আবদুল কাদের মির্জা গত বছর কোম্পানীগঞ্জ আওয়ামী লীগের একটি পৃথক কমিটি ঘোষণা করেন। কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি খিজির হায়াত খান আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘কোনো কারণ নাই, এমনিই আমাদের সম্মেলন হয়নি।’

বরিশাল বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদক আফজাল হোসেন বলেন, স্থানীয় নেতারা বিভিন্ন অজুহাতে সম্মেলন করতে চান না। ময়মনসিংহ বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদক শফিউল আলম চৌধুরী নাদেল আজকের পত্রিকাকে বলেন, সম্মেলন করার জন্য আগে হয়তো কিছুটা উদ্যোগের অভাব ছিল। এই কারণে সম্মেলন হয়নি। আগামী জুলাই মাসের মধ্যে উপজেলা সম্মেলন ও সেপ্টেম্বরের মধ্যে জেলার সম্মেলন শেষ করার লক্ষ্য স্থির করা হয়েছে।

চট্টগ্রাম বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন বলেন, চট্টগ্রাম বিভাগের প্রত্যেকটি মেয়াদোত্তীর্ণ ওয়ার্ড, ইউনিয়ন, পৌর, উপজেলা এবং জেলা সম্মেলন দ্রুত সম্পন্ন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

সহযোগী সংগঠনগুলোর মধ্যে মহিলা আওয়ামী লীগ, যুব মহিলা লীগ ও তাঁতি লীগের সম্মেলন হয়েছিল ২০১৭ সালের মার্চ মাসে। এই সংগঠনগুলোর তিন বছর মেয়াদি কমিটিগুলোর মেয়াদ শেষ। বঙ্গবন্ধু আওয়ামী আইনজীবী পরিষদ চলছে ২০১৭ সালে গঠিত আহ্বায়ক কমিটি দিয়ে।

আরেক ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন ছাত্রলীগের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় ২০১৮ সালের মে মাসে। একই বছর দুই বছর মেয়াদি কমিটি করা হয়। প্রায় দেড় বছর পর দুজনকে অব্যাহতি দিয়ে আল নাহিয়ান খান জয় ও লেখক ভট্টাচার্যকে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব দেওয়া হয়। সম্মেলন আর হয়নি। সহযোগী সংগঠনের মধ্যে কৃষক লীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, মৎস্যজীবী লীগ ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন শ্রমিক লীগের মেয়াদ শেষ হবে আগামী নভেম্বর মাসে।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
উপে