পদ থেকে বঞ্চিত করতে পারবেন, মুজিব আদর্শ থেকে নয়: আসাদ

প্রকাশিত: মার্চ ৭, ২০২১; সময়: ২:২৩ pm |

নিজস্ব প্রতিবেদক : রাজশাহী জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান আসাদ বলেছেন, দলের পদ-পদবী তো বিভিন্ন মানুষই পায়। পদ পাওয়া মানুষেরা আমাদের সাথে হাঁটুক, আমারা পদবিহীন মানুষেরা হাঁটবো। একবার দেখি না তার কাতারে লোক বেশি হয়, না আমাদের কাতারে। অনেক নেতার তো বড় বড় সম্মেলনে তিনশ লোকও জুটে না। বর্তমান বাংলাদেশের ইতিহাস রচনা হলো। পদবিহীন আসাদের একক আলোচনা অনুষ্ঠানে রেজিস্ট্রেশন করে হাজার হাজার মানুষ প্রবেশ করেছে।

শনিবার বিকেল সাড়ে ৩টায় সেন্টার ফর পিপল্স অ্যান্ড পলিসির আয়োজনে একক আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন। আসাদ বলেন, আমাকে আওয়ামী লীগের পদ থেকে বাদ দিতে পারেন। আওয়ামী লীগের আদর্শ থেকে বাদ দিতে পারবেন না। আমাকে শেখ হাসিনার মিটিংয়ে ওঠা থেকে বঞ্চিত করতে পারেন। কিন্তু মাদ্রাসার মাঠে শেখ হাসিনার উচ্চারণ- আসাদ কোথায়? এ ডাক থেকে আপনারা বন্ধ করতে পারবেন না।

মাদ্রাসার মাঠে সমাবেশে মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে কথা বলেছিলাম। আমি সৌভাগ্যবান মানুষ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনা দুই মিনিট মঞ্চের পেছনে দাঁড়িয়ে ছিলেন আসাদের সাথে কথা বলার জন্য। এই থেকে তো আমাকে বঞ্চিত করতে পারবেন না।

তিনি বলেন, আমাকে মনোনায়ন না দিয়ে শেখ হাসিনা আপাকে আমি বলেছিলাম, আপা আমি আর কাজ করতে পারবো না। আপা আমাকে বলেছিলেন- জবাই কাকে করা হয়? কাছের মানুষকেই। আমি তোকে জবাই করেছি, তোকেই কাজ করতে হবে। এই অধিকার নিয়ে কে কথা বলতে পারে? এটি তো আপনারা বন্ধ করতে পারবেন না। সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে বলছি, সাবধান! ভালোভাবে চলেন, ভালো পথে হাঁটেন। আওয়ামী লীগের প্রবীণদেরকে সম্মান করেন।

ছাত্রলীগ, যুবলীগসহ যাদের ছাড়া আমাদের মিটিং মিছিল হয় না। যারা আমাদেরকে নেতা তৈরি করে। যারা আমাদেরকে সম্মান দেয় তাদের সম্মান দিয়ে আমরা তাদের স্কুল কলেজে চাকরি দেয় নাই। টাকা নিয়ে জামায়াত বিএনপির কর্মিদের দিয়েছে।

নিজের সততার দাবি করে আসাদ বলেন, আমি শপথ করে বলতে পারি- আমি অর্থ কামানোর জন্য আওয়ামী লীগ করিনি। দীর্ঘ সময় আওয়ামী লীগ ক্ষমতায়। আমি দুদককেই বলতে চাই, আপনাদের কাছে অনুরোধ করে গেলাম আমার অর্থ সম্পদের হিসেব দিয়েই আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের খাতা খুলুন। আমি সাধারণ সম্পাদক থাকা অবস্থায় রাজশাহীতে অনেক সরকারি প্লট দেওয়া হয়েছে। অনেকেই নিয়েছেন। নাম না বলি। আমাকেই ডেকেছিলো।

সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান ৫ কাঠার প্লট। আমি বলেছি- শুধু আসাদুজ্জামান হলে নিবো, সাধারণ সম্পাদক হিসেবে নিবো না। আমি নেইনি। আমাকে প্রধানমন্ত্রী এমপিতে মনোনায়ন না দিয়ে, জেলা পরিষদের চেয়্যারম্যান করার প্রস্তাব দেন। আমি আপার কাছে অনুরোধ করেছি আমি যাবো না। বরেন্দ্র ও আরডিএ’র চ্যেয়ারম্যানের প্রস্তাব দেন। আমি নেইনি।

দলীয় বিরোধীতার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমার নাম গেলেই কিছু মানুষ বিরোধীতা করে। আমিতো করতেই চাই না আমি ওইসব জায়গায় যাবো না। আমি আওয়ামী লীগের পথেই থাকবো। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সাথেই পথ চলবো। আর আমার জীবনের শেষ লক্ষ তো আছেই। আমার মৃত্যুর পর অনেক নেতার চেয়ে আমার জানাযা যাতে বড় হয়, এই লক্ষ্যই আমার পথ চলা। সেই লক্ষ্য নিয়েই আমি সামনের দিকে এগিয়ে যেতে চাই। তিনি বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আপনাকেই বলতে শুনেছি আমি দলের ত্যাগি নেতাদের মূল্যায়ন করতে চাই।

আপনি যে কর্র্মিকে যেখানেই পান, তার খোঁজ নেওয়ার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠেন। সাথে সাথে বলে উঠেন, কি খেয়েছো? কোথায় উঠেছে? কি করো? আপনি এত বড় রাষ্ট্রের দায়িত্ব পালনের পরও এই কাজটি করেন। কিন্তু আপনার পাশের নেতারা কী সেই কাজটি করে? আওয়ামী লীগের কিছু কেন্দ্রীয় নেতাদের এখন স্যার বলতে হয়। স্যার না বললেই নয়।

আসাদ বলেন, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর যারা আওয়ামী লীগে এসেছেন সেই সমস্ত বেয়াদবদের স্যার বলতে প্রবীণ নেতারা কষ্ট পায়। আওয়ামী লীগে আমরা কাউকে স্যার বলতে আসিনি। আওয়ামী লীগ গণমানুষের দল। আমি এইসব দেখে বার বার বঙ্গবন্ধু ও প্রধানমন্ত্রী আপার কথা মনে পড়ে।

আমার মনে হয়, আপনারাও ওই কথা বিশ্বাস করেন। আমার যারা প্রত্যন্ত অঞ্চলে রাজনীতি করি। তারা কোন কাজে গ্রামে গেলে সেখানে যদি কোন গরীব আওয়ামী লীগের কর্মী থাকে, সে পাগল হয়ে যায়। তার বাড়িতে যদি খাবার না থাকে, সে পাশের বাড়িতে থেকে চাল ডিম নিয়ে এসে ওই নেতাকে খাওয়ানোর চেষ্টা করেন। এটি আমরা খুব উপভোগ করি।

বিএনপি নেতা মিজানুর রহমান মিনুর বক্তব্য বিষয়ে তিনি বলেন, শেখ হাসিনা লড়াই সংগ্রাম করে এই দেশের দুঃখী মানুষের জন্য। বিধবা মায়ের জন্য স্বামীহারা মায়েদের জন্য। শেখ হাসিনা করো কাছে মাথা নিচু করে না। শেখ হাসিনাকে দমানো সম্ভব না। আর আজকে রাজশাহীতে মিজানুর রহমান মিনু ৭৫ এর পনেরো আগস্ট সৃষ্টির ঘোষণা দেন। মিনু ভাই আপনাকে শ্রদ্ধা করি, সম্মান করি। আপনি রাজশাহীর মেয়র ছিলেন।

আপনি এমপি ছিলেন, কিভাবে ছিলেন সব জানি। আবার আপনাকেই আমি দেখেছি নিজের বাপকে বাদ দিয়ে প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানকে ‘বাপ’ বলতে। আবার আপনাকেই দেখেছি রাজশাহীর সার্কিট হাউজে শেখ হাসিনার পায়ে হাত দিয়ে সালাম করতে। নিজের মাথায় হাত নিয়ে আপনি বলতে চেয়েছেন, বড় বোন আপনি আমার জন্য দুয়া করে দেন। সেই মিনু যখন দাঁড়িয়ে বলে হাসিনা আপনার লজ্জা লাগে না।

শেখ হাসিনা তো কোন দিন কারো কাছে মাথা নিচু করেনি। ইজরাইলের সাথে কার সম্পর্ক মিনু সাহেব আপনি জানেন। তোমার যদি বুকের সৎ সাহস থাকে যে কোন জায়গায় যে কোন অবস্থায় যে কোন চ্যালেঞ্জর মোকাবেলা করার জন্য কেন্দ্র আওয়ামী লীগের দরকার নেই, আমাদের মহানগর ও জেলার ছাত্রলীগই যথেষ্ট। সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে বলি মিনু সাহেব বক্তৃতা প্রত্যাহার করেন।

যদি প্রত্যাহার না করেন, আপনার ম্যাডাম খালেদা জিয়া গিয়ে শেখ হাসিনার কাছে ক্ষমা চেয়েছে আপনি দেখেননি। মিনু আপনি বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারী ফারুকের চেয়ে বড় কেউ না। সেই ফারুক বলেছিলো আমরা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেছি। পারলে কেউ কিছু করুক। পরে সেই ফারুকই জেলা খানায় কেঁদেছিলো। রাজনীতি করেন, রাজনীতির ভাষায় কথা বলেন। আর যদি অন্য ভাষায় যেতে চান আমরা আপনার মত মিনুকে সেই পথে আবার মোকাবেলা করতে প্রস্তুত আছি।

রাজনীতির অভিজ্ঞতা বিষয়ে আসাদ বলেন, ছাত্র রাজনীতি থেকে যুব রাজনীতিতে আসলাম সেটি আমার অভিজ্ঞতা। আমি যুবলীগ করতে গিয়ে আওয়ামী লীগের নেতাদের খুব বকা খেয়েছি। ইফতারি হাতে নিয়েও নেতাদের চাপে তানোর থেকে পালিয়ে আসাতে হয়েছে। প্রবীণ নেতারা বলতো শেখ হাসিনাকে নিয়ে ক্ষমতায় যাবো কিন্তু রাজশাহীতে এমপি করা যাবে না। কেনো এমপি করা যাবে না ব্যাখ্যা দিতো না। প্রবীণ নেতারা কেনো এইসব কথা বলতো আমি বুঝতে পারতাম না।

৯৬ থেকে ২০০১ সালে আমি যুবলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক ছিলাম। তখন প্রশাসনের কাছে গেলে সবাই সম্মান করতো। এখন কোন মন্ত্রী গেলেও ডিসি আর দাঁড়ায় না। ২০০৮ এরপর যখন ক্ষমতায় আসলাম তখন রাজশাহী জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হই। প্রশাসন তখন পাত্তাও দেয়নি। তখন ওই মুরব্বিদের কথা মনে হতো। সাড়ে তিন বছরে এমপির ঠ্যালায় আমাদের নেতারা বাঁকা ছিলো। এখনতো ১৫ বছরের এমপিদের নির্যাতন। এই নির্যাতনের পর আওয়ামী লীগ রাজশাহীতে মাঠে কত দিন টিকবে সেটিই বিবেচ্য বিষয়।

প্রবীণ নেতাদের অপদস্তের কথা তুলে ধরে আসাদ বলেন, আতাউর রহমান খাঁনরা যখন ফারুক চৌধুরীর বাড়িতে গিয়ে গলা ধাক্কা খায়। ৭৫ এর পরে রাজনীতি করা মানুষ তারা। ওরা যখন বাহিরে এসে কাঁদে। এদের চোখের পানির দাম কী আল্লাহ দিবে না? আবার সিটি কর্পোরেশনে গিয়ে মেয়রের কাছে কেউ যদি অপমান হয়ে আওয়ামী লীগের মুরব্বিরা ফেরত আসে। সেটিও কষ্টের বিষয় হয়।

আবার হঠাৎ করে আসা মন্ত্রী শাহরিয়ারের কাছে যখন প্রবীণ নেতারা যায়, সে তখন বলে আপনি কে? তাকে যখন পরিচয় দিতে হয়। আওয়ামী লীগের পরিচয় দিয়ে কথা বলতে হয়। সেই মানুষগুলোর প্রশ্নের জবাব কে দিবে? কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আপনি বলেন, হাইব্রিড কাউয়া দলে জায়গা হবে না। ঠিক তখনই হাইব্রিডদের প্রভাব ততই বৃদ্ধি পায়।

একক আলোচনা সভায় উপস্থিত ছিলেন, রাজশাহী জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আলী সরকার, আওয়ামী লীগের জাতীয় কমিটির সদস্য এবং কাঁকনহাট পৌরসভার মেয়র আতাউর রহমান খান, সাবেক প্রতিমন্ত্রী ও জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য অধ্যাপক জিনাতুন নেসা তালুকদার, তানোর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি গোলাম রাব্বানী, সাধারণ সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল মামুন, বাঘা পৌরসভার সাবেক মেয়র আক্কাস আলী, জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সহ-সভাপতি বদরুজ্জামান রবু।

জেলা যুবলীগের সভাপতি আবু সালেহ, সাধারণ সম্পাদক আলী আজম সেন্টু, জেলা কৃষক লীগের সভাপতি রবিউল আলম বাবু, মহানগর সেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক জেডু সরকার, রাজশাহী বার অ্যাসোসিয়েশসের সাবেক সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট একরামুল হক, তানোর পৌরসভার মেয়র ইমরুল হক, মুন্ডুমালা পৌরসভার মেয়র সাইদুর রহমান প্রমুখ। এ অনুষ্ঠানে জেলার দূর-দূরান্ত থেকে তৃণমূলের নেতাকর্মীরা আসেন।

  • 561
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
উপরে