ফেসবুকের কারণে ১৭ বছর পর কন্যাকে ফিরে পেলেন বাবা-মা

প্রকাশিত: জানুয়ারি ১১, ২০২১; সময়: ১:৫৮ pm |

পদ্মাটাইমস ডেস্ক : তানিয়ার বয়স ছিল তখন মাত্র আট বছর। বাবার সঙ্গে ঢাকা দেখতে এসেছিল। ফুফুর বাসা থেকে একদিন বেড়িয়ে যায়। বাড়ি খুঁজে না পেয়ে ছুটে যায় ফুফাতো বোনের স্কুলে। কিন্তু স্কুলের দারোয়ান ভেতরে ঢুকতে দেয়নি। এরপর বদলে যায় তানিয়ার জীবন।

একদিনের জন্য তানিয়ার ঠাঁই হয় এক পরিবারে। পরের দিন আরেকটি পরিবার ঠাঁই দিয়ে তানিয়াকে মেয়ে হিসেবেই বড় করে তোলে। বিয়ে দেয়। তানিয়ার কোল জুড়ে এখন দুই সন্তান। তবে বাবা-মাকে হারানোর বেদনা এখনো কষ্ট দিতো তাকে। কথা হলেই এ নিয়ে গল্প জুড়ে দিতেন স্বামীসহ অন্যদের সঙ্গে।

কথা প্রসঙ্গেই স্বামী আনোয়ার হোসেন ও তার এক বন্ধু তানিয়ার হারিয়ে যাওয়া নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেন। এই চোখ ওই চোখ হয়ে নজরে আসে শত মাইল দূরে থাকা বাবা-মায়ের। এরপর ১৭ বছর পর তানিয়ার সঙ্গে দেখা হয় তার বাবা-মায়ের। এ যেন নতুন জীবন শুরু। সেদিনের ছোট্ট তানিয়া স্বামী-সন্তান নিয়ে বাবা-মায়ের কাছে ফিরলেন।

এটি সিনেমার কোনো গল্প নয়। গোপালগঞ্জের কোটালিপাড়া পশ্চিমপাড়ার তানিয়া আক্তারের বাস্তব জীবনের গল্প। রবিবার (১০ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় এই রিপোর্ট লেখার সময় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া থেকে স্বামী-সন্তান নিয়ে বাবার বাড়িতে যাচ্ছিলেন তানিয়া।

তানিয়াসহ পরিবারের লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ঢাকার একটি বাস কাউন্টারে কর্মরত মো. সুন্দর আলী ২০০৪ সালে তার সাত বছর বয়সের মেয়ে তানিয়ার আবদার মেটাতে ঢাকায় নিয়ে আসেন। ঢাকার আগারগাঁও-এ সুন্দর আলীর বোনের বাড়িতে ছিলেন তারা। সবার অজান্তে তানিয়া একদিন বাসা থেকে বের হয়ে যায়। বাসা চিনতে না পেরে তানিয়া ছুটে যায় ফুফাতো বোনের স্কুলে। সেখানকার দারোয়ান তাকে ঢুকতে দেয়নি। রাস্তা না চেনায় এক পর্যায়ে একটি বাসে করে সংসদ ভবনের কাছে আসে তানিয়া। সেখানে একটি দোকানে টেলিভিশন দেখতে দেখতে রাত হয়ে যায়। তখন বাসায় যেতে তানিয়া অনেক কান্নাকাটি করে। কিন্তু ঠিকানা বলতে না পারায় এক হিন্দু লোক তাকে তার বাসায় নিয়ে যান। পরদিন তানিয়াকে তার পরিবারের কাছে পৌঁছে দিতে তিনি অনেক জায়গায় খোঁজাখুজি করেন।

তানিয়া বলেন, ‘এক পর্যায়ে কলাবাগান এলাকায় আরজুদা খাতুন মিলন ও তার ছেলে রিপনের সঙ্গে দেখা হলে তারা বিষয়টি জেনে আমাকে তাদের বাসায় নিয়ে আসেন। এরপর থেকে ওই বাড়িতে আমি বড় হতে থাকি। রিপনকে আমি বাবা বলে ডাকি। খুব আদর যত্ন তারা করতেন। ওই পরিবার থেকেই আমার বিয়ে হয়।’

তানিয়া আরও জানায়, রিপনের গ্রামের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়া কসবা উপজেলার রায়তলা গ্রামে।

তানিয়ার স্বামী ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া পৌর এলাকার শান্তিনগরের আনোয়ার হোসেন জানান, রিপন নামে ওই ব্যক্তি তার পূর্ব পরিচিত। সব কিছু জেনে শুনেই তিনি তানিয়াকে বিয়ে করেন। তাদের ঘরে এখন এক ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে। তানিয়া প্রায়ই বাবা-মাকে হারানোর কথা বলতো। এই অবস্থায় তিনি ও এক বন্ধু তানিয়ার ছবি দিয়ে ফেসবুকে পোস্ট দেন। সেই সূত্র ধরেই বিষয়টি জানতে পেরে তানিয়ার বাবা-মা শনিবার রাতে আখাউড়ায় ছুটে আসেন।

১৭ বছর পর নিজেদের তানিয়ার সঙ্গে বাবা-মায়ের দেখাদেখি হলে এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। আনন্দে কান্নায় ভেঙে পড়েন তারা। জড়ো হন এলাকার লোকজন। দিনভর অতীত স্মৃতি নিয়ে কথা বলেন পরিবারের লোকজন।

তানিয়ার ছোট বোন সোনিয়া খানম বলেন, ‘বোনের ছোট বেলার অনেক স্মৃতি মনে আছে। বোনকে হারানোর পর সব সময় মন খারাপ থাকতো। ভাবতাম বোনকে বুঝি কখনও পাব না। তবে আম্মা প্রায়ই বলতেন, এই দেশটা ছোট। একদিন না একদিন আমি আমার মেয়েকে ঠিকই ফিরে পাবো। বোনকে পেয়ে আমরা খুশি।’

তানিয়ার বাবা সুন্দর আলী রবিবার সন্ধ্যা সাতটার দিকে বলেন, ‘প্রতিবেশী রুমা নামে একজন ফেসবুকে তানিয়ার বিষয় নিয়ে লেখালেখির কথা আমাদের জানায়। এরই সূত্র ধরে ঠিকানা বের করে মেয়ের বাড়িতে আসি। এখন মেয়ে ও তার স্বামী সন্তান নিয়ে বাড়িতে যাচ্ছি। এভাবে মেয়েকে খুঁজে পাবো কখনো ভাবিনি। তিনি এজন্য সৃষ্টিকর্তার প্রতি শুকরিয়া আদায় করেন।

  • 19
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
উপরে