কতটুকু ভালোবাসি বাংলাদেশকে?

প্রকাশিত: মার্চ ২৭, ২০২২; সময়: ৪:২৯ pm |
খবর > মতামত

তুষার আবদুল্লাহ : কন্যাকে দেশে রেখে নাকি ভুল করছি। এর প্রায়শ্চিত্ত আমাকে করতে হবে। এমন কথাই বলছেন চারপাশের মানুষ। যারা বলছেন, তারা সমাজের একশ্রেণির মানুষ নন। টাকার বিচারে সবাই অবশ্য একশ্রেণির, অর্থাৎ উচ্চবিত্ত। কিন্তু শিক্ষা, পেশা ও সামাজিক পরিচয় বিবেচনায় তারা ভিন্ন ভিন্ন শ্রেণির। একটি শ্রেণিকে জানি, যারা বিশেষ একটি ব্যবসার মাধ্যমে আচমকা বিত্তের মালিক হয়েছেন।

দেশের বিভিন্ন স্থানে পেশাগত কাজে তাদের কাছে যেতে হয়। চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে ব্যক্তিগত আলাপও চলে আসে। দেখলাম তাদের বেশিরভাগের সন্তানরা দেশে নেই। কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, আমেরিকায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। মালয়েশিয়া, রাশিয়া, ভারতেও আছে কারও কারও সন্তান। এবং এ নিয়ে তাদের গৌরবের শেষ নেই।

বলছেন, এ দেশে কিছু হবে না। খামোখা ছেলেমেয়েদের মেধার অপচয় করে কী হবে? যেহেতু তাদের সন্তানরা ইংরেজি মাধ্যমে পড়েছে, সেহেতু মেধাবী। আমিও বিশ্বাস করি আমাদের সব সন্তানই মেধাবী। কিন্তু বাংলাদেশে থাকলে মেধার অপচয় হবে, আমি এই প্রোপাগান্ডায় অবিশ্বাসী।

আজ সকালেই এক বন্ধুর সঙ্গে দেখা। আমাদের আড্ডার মাঝে চলে এলেন তার দুই স্বজন। সদ্য স্নাতক শেষ করা বন্ধুর দুই স্বজনই জানালেন, তাদের পরিবার থেকে চাপ আছে বাইরে চলে যাওয়ার। উচ্চশিক্ষার ছুঁতোয় স্বপ্নের দেশে স্থায়ী হওয়ার প্রবল তাগাদা আছে। আমি ওই তরুণদের কাছে জানতে চাইলাম কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, আমেরিকা গিয়ে কী করবেন? ওদের উত্তর- পরিবারের যারা ওসব দেশে আছেন তারা ছোটখাটো চাকরি করেন। কেউ কেউ ব্যবসা। আসলে লাইফটা অনেক ‘সিকিউরড’ ওখানে। আমি বললাম, ওখানে তো দেখি কত বাঙালির অপঘাতে মৃত্যু হচ্ছে। চাকরি, ব্যবসা ওখানেও সোনার হরিণ হয়ে উঠছে। তাহলে ‘সিকিউরড’ হলো কীভাবে?

আমার এই প্রশ্নের জবাব শুধু এই দুই তরুণই নয়, পরিচিতদের যারা ছেলেমেয়েকে বিদেশ পাঠানোর স্বপ্ন, আকাঙ্ক্ষার বীজতলা হিসেবে ইংরেজি মাধ্যমে পড়াচ্ছেন তারাও দিতে পারেননি। কেন সন্তানকে বিদেশ পাচার করে দেওয়া? আসলে শুধু সন্তান নয়, নিজেদেরই পাচার হয়ে যাওয়ার ‘সাজগোজ’এটা। সন্তানরা যথাযথ ‘জলপানি’ নিয়ে বিদেশ পড়তে যাবে, এটা শুধু কোনও একক পরিবারের গৌরব নয়, রাষ্ট্রেরও। কিন্তু ঘুষ, দুর্নীতির সম্পদ, টাকা পাচারের পাশাপাশি, তারা সন্তানদেরও পাচারের ‘বস্তু’ করে তুলেছেন।

আত্মীয়-পরিজন মহলেও কোণঠাসা হয়ে যাওয়ার অবস্থা। সহকর্মীদের কাছে তো পাত্তা পাওয়ার অবস্থানে নেই। কারও পুরো পরিবার বিভুঁইয়ে। কারও ছেলে –মেয়ে। যাদের সন্তানরা দেশে আছেন তারা ইংরেজ মাধ্যমে পড়ছেন। বাংলার সঙ্গে তাদের কোনও যোগাযোগ নেই। ইংরেজি মাধ্যমে সন্তানরা পড়বে, এটা সামাজিক ‘গুনাহ’হবে কেন? এ নিয়ে ব্যক্তিগতভাবে আমারও কোনও রক্ষণশীল অবস্থান নেই। সমস্যা হলো ইংরেজি মাধ্যমে পড়বে বলে, সন্তানের সঙ্গে মাতৃভাষার বিচ্ছেদ ঘটাবো কেন?

বাংলা, বাংলার ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধ শুধু বিদ্যায়তনের শিক্ষা নয়। মূলত এই শিক্ষাটি পারিবারিক। এমন অনেক শিক্ষক, সমাজ সংস্কারকের ভূমিকায় থাকা ব্যক্তিদের জানি, যারা আমার সন্তানকে বাংলাদেশ, জয় বাংলা, বঙ্গবন্ধুর প্রতি ভালোবাসা জাগরণের জন্যে ঘাম ঝরাচ্ছেন। অথচ তাদের পারিবারিক কথোপকথনের ভাষা–বাংলা নয়। দেশের স্বাধীনতা, বিজয় নিয়েও তাদের সন্তানদের মধ্যে কোনও দরদ নেই।

রাজনীতিবিদদের ওপর ভরসা তো আগেই বাদ দিয়েছি। হরতাল, ভাঙচুর, সন্ত্রাসে আমাদের সন্তানদের অনিশ্চিত শিক্ষার মধ্যে ঝুলিয়ে রেখে, নিজেদের সন্তানদের ঠিকই বিদেশে পড়িয়ে এনে, আবার আমাদের শাসকের অবস্থানে বসিয়ে দিচ্ছেন। তাদের অনুপ্রেরণায় সমাজের সব তলার মানুষ এখন একই পদ্ধতি অবলম্বন করেছে।

শুধু রাজনীতির ক্ষেত্রে নয়, সামাজিক আন্দোলন এবং প্রতিষ্ঠান পরিচালনার জন্যে, শাসক, শোষক তৈরির জন্য বিদেশের বাতাস খাইয়ে আনাটাই এখন ফ্যাশন। দেশে আমাদের যে সন্তানরা অনিশ্চয়তা, প্রতিবন্ধকতাকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে তাদের চেয়েও যোগ্য হয়ে উঠছেন, তারা শোষিতই রয়ে যাচ্ছেন। এই বিভাজন ও বৈষম্য শিক্ষার একদম প্রাথমিক স্তর থেকে তৈরি করা। প্রকাশ্যে লোকদেখানো বৈষম্য ভেঙে ফেলার দাবি, আওয়াজ যারা তুলছেন, তারা বাম-ডান যে দিকেরই হোক, তাদের ব্যক্তি গরজ শূন্য। কারণ, তাদের সন্তানরা প্রাথমিক বিদ্যালয় বা মাদ্রাসায় যায় না। সাধারণ হাইস্কুলে যাচ্ছে না।

এমনকি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়াটাও কমিয়ে দিয়েছে। সমাজ ও রাষ্ট্রের শিক্ষার এই বৈষম্য গত পঞ্চাশ বছরে বদলাতে পারিনি আমরা। আজ স্বাধীনতার যে উদযাপন দেখছি, সেই উদযাপন উপভোগ্য হয় না। কারণ, চারদিকে যে আত্মপ্রতারণা ও ভণ্ডামির আতশবাজি দেখি, তা দেখে বঙ্গবন্ধু, চার নেতা, এবং বীর মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে নিজেকে বড় অপরাধী মনে হয়। তবে উল্লাসের বড় কারণও আছে আমার। যখন দেখি তরুণদের একটি বড় অংশ দেশ ছেড়ে না গিয়ে এখানেই লড়াই করে, নিজ পেশায়, ব্যবসায় বিজয়ের হাসি হাসছে।

আজ স্বাধীনতা উদযাপন আমার সেই সন্তানদের প্রতি উৎসর্গ করেই বলতে চাই, সন্তান যে মাধ্যমেই পড়ুক, আসুন আমাদের পরিবারে বাংলাদেশকে রাখি, ব্যক্তিস্বার্থে নয়, ভালোবেসে। বাংলাদেশকে সিঙ্গাপুর, কানাডা বা আমেরিকার মতো নয়, গড়ি সোনার বাংলার আদলে।

লেখক: গণমাধ্যমকর্মী

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
উপরে