আলী খামেনির পুরো নিয়ন্ত্রণে এল ইরান

প্রকাশিত: জুন ২৩, ২০২১; সময়: ১১:২১ am |
খবর > মতামত

আলতাফ পারভেজ : ইরানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ভোট শেষ হয়ে গেছে ১৮ জুন। ভোটের আগেই সবাই জানত কে জিতবে। ‘এক ব্যক্তির নির্বাচন’ই ছিল এটা। সেই অর্থে ইরান এখন উগান্ডা, উত্তর কোরিয়া কিংবা ও রকম অন্যান্য দেশের কাতারে চলে এল। তবে দেশটিতে ভোট পর্ব আছে এখনো এবং ভোটের দিন প্রশাসন কারচুপি করেছে বলে সমালোচনা নেই। সে বিবেচনায় ইরান মুসলমানপ্রধান অনেক দেশের চেয়ে আলাদা। তবে নতুন প্রেসিডেন্টকে নিয়ে সাধারণ ইরানিদের বাড়তি উদ্দীপনা নেই। তারা কাবু অর্থনৈতিক সংকটে। সেই সংকট সামাল দিতে নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসি নায়কের ভূমিকা নিতে পারবেন—এমন বিশ্বাস ইরানে কম জনেরই আছে। বরং এ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দেশটি একরোখা রাজনীতির নতুন এক যুগে প্রবেশ করল। রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক সংস্কারের ছিটেফোঁটা আওয়াজগুলো অনেক পিছিয়ে গেল।

রুটিরুজির সংকটে ভোটে আগ্রহ হারিয়েছে ইরান
নির্বাচনী স্বচ্ছতার চেয়েও ইরানিদের মাথাব্যথা বেশি এখন রুটিরুজি নিয়ে। অর্থনীতি স্মরণকালের সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের নির্মম অবরোধের সঙ্গে মহামারির ছোবল মিলে বহু মানুষ চাকরিহারা। মুদ্রার দর পড়ে গেছে বিপুলভাবে। এ কারণে আমদানি পণ্যের বাজার অস্থির। বাজারে ঢুকলে মধ্যবিত্তের মন খারাপ হয়ে যায়। নিম্নবিত্তরা আগেই হতবিহ্বল হয়ে আছে।

রিয়ালের পতন সমাজের এই দুই অংশের ক্রয়ক্ষমতা মারাত্মকভাবে কমিয়ে দিয়েছে। ভোটে মানুষের উৎসাহ সে কারণেই কম। বলা হচ্ছে, বিপ্লবের পর এবার সবচেয়ে কম ভোটার ভোট দিলেন।
ইরানে ২০১৫ সালে ১ ডলার সমান ৩২ হাজার রিয়াল পাওয়া যেত। এখন অনানুষ্ঠানিক মার্কেটে ১ ডলার সমান ২ লাখ রিয়ালের ওপরে। সরকারি ‘এক্সচেঞ্জ রেট’ যদিও ১ ডলার সমান ৪২ হাজারই আছে। কেবল গত আড়াই বছরে ডলারের বিপরীতে ইরানি মুদ্রার দাম কমেছে ৪০ ভাগ। ২০১৭ সাল থেকে জিডিপির গতিও কমছে।

রাইসি ১০ লাখ নতুন কর্মসংস্থানেরও আশ্বাস দিয়েছেন। এর জন্য বিনিয়োগ কীভাবে হবে, সেটা খোলাসা করেননি, বিশেষ করে অর্থনীতি যখন অনেকখানি রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত। গত দু-তিন বছর প্রবৃদ্ধির গতি ঋণাত্মক। যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধে তেল বিক্রি বাধাপ্রাপ্ত হওয়ায় দেশজুড়ে মন্দা ইন্ধন পাচ্ছে মারাত্মকভাবে। ইউরোপের সঙ্গে ইরানের বাণিজ্য কমে গেছে প্রায় ৮০ শতাংশ। ইউরোপ ছিল দেশটির বড় বাণিজ্য-সহযোগী। এ রকম অবস্থায় রাইসিকে অর্থনীতি ঠিকঠাক করতে রাশিয়া ও চীনের ওপরই ভরসা করতে হবে বেশি। রাইসির শাসনকালে চীনের সঙ্গে তেহরানের সম্পর্ক ধারণার চেয়েও জোরেশোরে বিকশিত হতে পারে।

নির্বাচনী প্রচারণায় রাইসি বলেছিলেন, তিনি সকল নাগরিককে মাসে সাড়ে চার মিলিয়ন রিয়াল দিতে চান সংকট সামাল দিতে। মুশকিল হলো এ অর্থ মুদ্রাবাজারে মাত্র ১৮ ডলারের মতো হবে। রাইসি ১০ লাখ নতুন কর্মসংস্থানেরও আশ্বাস দিয়েছেন। এর জন্য বিনিয়োগ কীভাবে হবে, সেটা খোলাসা করেননি, বিশেষ করে অর্থনীতি যখন অনেকখানি রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত।

শাসক ‘ব্যবস্থা’ পূর্ণ অনুগত প্রশাসক পেল
ইরান বিপ্লবের চেয়ে ১৯ বছরের বড় ইব্রাহিম রাইসি। এ বিপ্লবের মূল প্রজন্মের একজন তিনি। দেশের ‘বিপ্লবী পুনর্গঠনে’ রাইসি ভূমিকা রেখেছেন প্রধানত বিচার বিভাগে। ধাপে ধাপে সেখানে প্রধান বিচারপতি হয়েছেন। তার আগে কিছুদিন ইমাম রেজার নামে প্রতিষ্ঠিত ‘আসতান কুদস রাযাওয়ি’ সংস্থায় দায়িত্ব পালন করেছেন। ধর্মীয় দিক থেকে এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান ইরানে। তবে রাইসির বিচারক জীবনই তাঁর রাজনৈতিক ভাবমূর্তিকে আকার দিয়েছে। বিরুদ্ধবাদীদের মতে, বিচার বিভাগের যে অংশ ‘বিপ্লববিরোধী’দের দমন, পীড়ন ও নির্মূলে দায়িত্ব পালন করেছে, রাইস তার অংশ ছিলেন।

বামপন্থী থেকে মধ্যপন্থী অনেক রাজনৈতিক বন্দীর নির্মম সাজা শেষে বিচারক ইব্রাহিম রাইসি দেশটির নীতিনির্ধারকদের পছন্দের একজন হয়ে ওঠেন। রাইসি নিজে অবশ্য মনে করেন, তাঁর পেশাগত জীবন কেটেছে মানবাধিকার রক্ষায়! এই দুই ভাষ্য নিয়ে এখন প্রবল বিতর্ক হচ্ছে। তবে সন্দেহ নেই, দেশটির প্রধান নেতা আয়াতুল্লা আলী খামেনির ইচ্ছা-অনিচ্ছা বোঝেন রাইস এবং সেটার নিখুঁত বাস্তবায়নকে কর্তব্য জ্ঞান করেন।

তারই ফল হিসেবে খুব নির্বিঘ্নে তিনি নির্বাহী বিভাগের প্রধান হয়ে এলেন। ২০১৭ সালের নির্বাচনেই সেই চেষ্টা ছিল। কিন্তু হাসান রুহানির মতো শক্তিশালী প্রার্থী থাকায় সেবার সম্ভব হয়নি। এবার তাই কোনো ঝুঁকি নেওয়া হয়নি। ন্যূনতম প্রতিদ্বন্দ্বিতা হতে পারে—এমন কারও নামই রাখা হয়নি ব্যালট পেপারে রাইসির বিপরীতে। এর ফলে ইরানের শাসক ‘ব্যবস্থা’ তাৎক্ষণিকভাবে একজন নির্ভরযোগ্য প্রশাসক পেল। তবে দেশ তাতে কতটা লাভবান হলো বলা মুশকিল।

২০১৭ সালে রুহানি যখন প্রেসিডেন্ট হন, তখন প্রায় ২৪ মিলিয়ন ভোট পান। আর এবার রাইসি ১৮ মিলিয়ন ভোট পেয়ে জিতেছেন। ভোটের অঙ্কে স্পষ্ট ব্যালট পেপারের প্রতি জনতার আস্থা কমছে এবং রাইসিও জনপ্রিয়তায় কোনো নায়ক নন। এ রকম বিজয় খারাপ নজির হিসেবে সব সময়ই তাড়া করবে রাইসিকে। কেউ কেউ বলছে, প্রতিযোগিতাহীন সাজানো নির্বাচনে জিতে আসা পায়ের তলায় কলার খোসার মতো ঝুঁকি হয়ে থাকে। তবে ইরানের মিত্র সিরিয়ার বাশার আল-আসাদ যেভাবে কিছুদিন আগে ৯৫ শতাংশ ভোট পেয়ে চতুর্থবারের মতো প্রেসিডেন্ট হয়েছেন, রাইসির ইরানে সে রকম লজ্জাহীন কিছু দেখা যায়নি।

রাইসির জন্য তাৎক্ষণিক চ্যালেঞ্জ হলো ইউরোপ-আমেরিকার সঙ্গে দর-কষাকষি করে অবরোধ ওঠানো। ইরানিদের জন্য এর চেয়ে বড় কোনো চাওয়া নেই এখন। অর্থনৈতিক সংকটে মেধাবী তরুণ-তরুণীরা স্রোতের মতো দেশ ছাড়ছে। গত ২৮ এপ্রিল দেশটির এক কর্মকর্তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে সবচেয়ে ভালো শিক্ষার্থীদের ৭৫ শতাংশই বাইরে চলে যাচ্ছে বা যেতে চাইছে।

আন্তর্জাতিক প্রচারমাধ্যম ইরানের নতুন প্রেসিডেন্টকে ‘কট্টরপন্থী’ বলছে। এটা তাঁর প্রধান যোগ্যতা নয় মোটেই। নতুন প্রেসিডেন্টের এ পরিচয় দিয়ে ইরানের এই মুহূর্তের রাজনীতির পুরো ব্যাখ্যাটা আসে না। রাইসির চেয়ে জনপ্রিয় কট্টরপন্থীও আছেন ইরানে। তাঁদের মধ্যে রাইসি সফল, কারণ আয়াতুল্লা আলী খামেনি তাঁকে আস্থাভাজন মনে করেছেন। ‘বিপ্লব’ ইরানে যে ‘ব্যবস্থা’ কায়েম করেছে, তাতে সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে আয়াতুল্লা আলী খামেনির চাওয়া-পাওয়াই সেখানে শেষ কথা।

অর্থনৈতিক অবরোধ সরানো রাইসির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ
প্রেসিডেন্ট হিসেবে রাইসির আগামী চার বছর ইরানের জন্য যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তাঁর জন্যও জরুরি। আয়াতুল্লা আলী খামেনির পর সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে তাঁর নামও বিবেচনায় আছে। প্রেসিডেন্ট পদে তাঁর সফলতার ওপর ভবিষ্যতের এসব বাছাই নির্ভর করবে। আবার এমনও কথা আছে, ৮২ বছর বয়সী আয়াতুল্লা আলী খামেনি নিজের ছেলে মুজতবা খামেনিকে পরবর্তী সর্বোচ্চ নেতার পদে দেখতে চান, সে জন্য রাইসিকে প্রেসিডেন্ট করে সে পথ সুগম করে তোলা হলো।

এসব জল্পনাকল্পনার বাইরে রাইসির জন্য তাৎক্ষণিক চ্যালেঞ্জ হলো ইউরোপ-আমেরিকার সঙ্গে দর-কষাকষি করে অবরোধ ওঠানো। ইরানিদের জন্য এর চেয়ে বড় কোনো চাওয়া নেই এখন। অর্থনৈতিক সংকটে মেধাবী তরুণ-তরুণীরা স্রোতের মতো দেশ ছাড়ছে। গত ২৮ এপ্রিল দেশটির এক কর্মকর্তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে সবচেয়ে ভালো শিক্ষার্থীদের ৭৫ শতাংশই বাইরে চলে যাচ্ছে বা যেতে চাইছে।

রাইসিকে এই স্রোত থামাতে হবে তাদের ফিরিয়ে আনা কঠিন হলেও। কিন্তু সেটা সহজ নয়। অবরোধ ওঠাতে হলে পাশ্চাত্যের সঙ্গে পারস্পরিক গ্রহণযোগ্য একটা বোঝাপড়া দরকার। ৪২ বছরের টানাপোড়েনে সে রাস্তা দুর্গম হয়ে গেছে। বিশেষ করে আমেরিকার ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার তালিকায় যখন ব্যক্তিগতভাবে রাইসির নামও রয়েছে এবং কমান্ডার কাসেম সোলেইমানিকে হত্যার শোক ইরানিরা এখনো কাটিয়ে ওঠেনি।

ইরান-ইসরায়েল ছদ্মযুদ্ধ বাড়তি গতি পেতে পারে
২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্র মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়ে নয়জন ইরানির বিরুদ্ধে যে নিষেধাজ্ঞা জারি করে, তাতে নতুন প্রেসিডেন্টের নামও আছে। প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়া মাত্র ইউরোপ-আমেরিকায় রাইসির মানবাধিকার রেকর্ড নিয়ে হইচই শুরু হয়েছে নতুন করে। রাইসির কূটনীতিবিদদের এসব খারাপ প্রচারণা অতিক্রম করেই বাইডেন প্রশাসনের সঙ্গে বোঝাপড়ায় সফল হতে হবে।

রাইসির জন্য আরেকটি খারাপ সংবাদ হলো তিনি যখন ইরানের প্রেসিডেন্ট হচ্ছেন, ইসরায়েলে তখন নেতানিয়াহুর চেয়েও কট্টর আরেকজন ক্ষমতায় এসেছেন। এর মানে দাঁড়াচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ইরান-ইসরায়েল ছদ্মযুদ্ধ এই দুই প্রেসিডেন্টের আমলে বাড়তি গতি পেতে পারে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে বাড়তি কোনো উত্তেজনায় আপাতত আগ্রহী নয়। এই অঞ্চল থেকে সৈন্য এবং সরঞ্জাম—সবকিছু কমাতে চাইছে তারা। সে জন্য ইরানের সঙ্গে উত্তেজনা কমিয়ে আনার বিষয়ে ডেমোক্র্যাট সরকার অনেকখানি আন্তরিক। রাইসি কতটা সেই সুযোগ নিতে পারবেন, তা নিয়ে অনুমান করা দুঃসাধ্য।

কারণ, আয়াতুল্লা আলী খামেনির ইচ্ছা-অনিচ্ছায় বন্দী তাঁর ভবিষ্যৎ। তবে আমেরিকার কূটনীতিবিদেরা রুহানির চেয়ে রাইসি-প্রশাসনের সঙ্গে চুক্তি করতে বেশি আগ্রহী। রুহানি যে চুক্তিই করতেন, তার বিরুদ্ধে দাঁড়াত দেশটির কট্টরপন্থীদের দুই ভরকেন্দ্র মজলিশ এবং বিপ্লবী সৈনিক দল। এখন সেই ঝুঁকি থাকছে না। প্রেসিডেন্ট, পার্লামেন্ট, বিচার বিভাগ—রাষ্ট্রের এই তিন অংশই রক্ষণশীলদের পুরো কবজায় এল।

এর ফলে সুবিধা হলো এই রাইসি বেশি ছাড় দিয়ে চুক্তি করলেও সেটা অনুমোদন করাতে বেগ পেতে হবে না। অর্থাৎ ইরানের সঙ্গে একটা টেকসই পরমাণু চুক্তি আয়াতুল্লা আলী খামেনির পছন্দের কারও সঙ্গে করাই সঠিক ভাবছেন বাইডেনের আমলারা। সে রকম কিছুর জন্য অবশ্য আগামী আগস্ট পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। নতুন প্রেসিডেন্ট তখনই দায়িত্ব নেবেন। তত দিন বাইডেন প্রশাসনকে প্রমাণ করে যেতে হবে ট্রাম্পের ইরাননীতি থেকে তারা বের হতে চায়। আলী খামেনি বলটি আমেরিকার দিকে ঠেলে দিলেন।
আলতাফ পারভেজ ইতিহাস বিষয়ে গবেষক

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
উপরে