ইশ, দুর্নীতিটা যদি না থাকতো!

প্রকাশিত: জুন ৩, ২০২১; সময়: ৭:২০ pm |
খবর > মতামত

প্রভাষ আমিন : বাজেট বিষয়টা বড্ড খটমট লাগে। ঠিক বুঝতে পারি না। লাখ লাখ কোটি টাকার ব্যাপার। টাকা কোত্থেকে আসে, কোথায় যায়; সবই যেন মাথার ওপর দিয়ে যায়। একটা বিষয় বুঝি, সংসারের যেমন একটা আয়-ব্যয়ের হিসাব থাকে, দেশেরও তেমনই থাকে। আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি হলেই সমস্যা। প্রস্তাবিত বাজেটে আয়ের অনেক খাত দেখানো হয়, বছর শেষে যেটা মেলে না; ঘাটতি থেকে যায়। আসলেই আয়-ব্যয়ের হিসাব মেলানো বড্ড কঠিন। বাজেটে অনেক উচ্চাভিলাষ থাকে, অনেক পরিকল্পনা থাকে। তবে সব পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয় না। বছর শেষে ‘পরীরা উড়ে যায়’, কল্পনাগুলো মুখ থুবড়ে মাটিতে পড়ে থাকে।

তবে বাজেট এলেই আমার মন ভালো হয়ে যায়। ছেলেবেলায় বাজেট মানেই ছিল বৈদেশিক ঋণ। আর এখন আয়-ব্যয়ের প্রায় পুরোটাই নিজেদের টাকায়। এই সক্ষমতা দেখতে ভালো লাগে। সাম্প্রতিক সময়ে আরও কিছু ভালো লাগার মতো খবর আমাদের আপ্লুত করে, গর্বিত করে। আইএমএফ গত বছরই পূর্বাভাস দিয়েছিল, এ বছর গড় জিডিপিতে বাংলাদেশ ভারতকে ছাড়িয়ে যাবে। আর বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর রিপোর্ট অনুযায়ী বাংলাদেশের মানুষের মাথাপিছু আয় ভারতের চেয়ে বেশি। ভারতের প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ কৌশিক বসুর কলমে বাংলাদেশের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা। প্রবৃদ্ধির বিবেচনায় বাংলাদেশকে তিনি রেখেছেন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের কাতারে। কৌশিক বসুর প্রবন্ধটি আমার মন ভালো করে দিয়েছে, তবে তারচেয়েও বেশি পরিতৃপ্তি পেয়েছি পাকিস্তানি অর্থনীতিবিদ বিশ্বব্যাংকের সাবেক পরামর্শক আবিদ হাসানের লেখা পড়ে। সম্প্রতি এক লেখায় পাকিস্তানের দুরবস্থার কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি লিখেছেন, ‘২০ বছর আগেও এটি অকল্পনীয় ছিল যে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় পাকিস্তানের প্রায় দ্বিগুণ হবে। বাংলাদেশের বর্তমান প্রবৃদ্ধি বজায় থাকলে দেশটি ২০৩০ সালে অর্থনীতির বড় শক্তি হয়ে উঠবে। আর পাকিস্তানের এই দুরবস্থা চলতে থাকলে ২০৩০ সালে বাংলাদেশ থেকে আমাদের সহায়তা নেওয়ার অবস্থা তৈরি হবে।’ অর্থনীতির বিভিন্ন খাত ধরে ধরে পরিসংখ্যান দিয়ে তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরে আবিদ হাসান লিখেছেন, ‘পাকিস্তানকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করা, ঋণ কমানো এবং বাংলাদেশ থেকে সাহায্য গ্রহণ থেকে বিরত থাকতে হলে বাংলাদেশকে অনুসরণ করতে হবে। এতে হয়তো আমাদের জাতীয় আবেগ আহত হবে, কিন্তু এখান থেকে উত্তরণের সংক্ষিপ্ত কোনও পথ নেই। আমরা যদি সবকিছু বর্তমানে যেভাবে চলছে, সেভাবে ছেড়ে দিই, তবে এক দশকের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে সাহায্য গ্রহণের পরিবেশ সৃষ্টি হবে।’ বাংলাদেশ-পাকিস্তানের তুলনা প্রসঙ্গ এলেই আমার কানে বাজে পাকিস্তানি সাংবাদিক জায়গাম খানের আকুতিটি। ২০১৮ সালে ইমরান খান পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর সে দেশের মন্ত্রিসভার এক বৈঠকে পাকিস্তানের উন্নয়নে ‘সুইডেন মডেল’ অনুসরণের সিদ্ধান্ত হয়। সেদিন রাতেই পাকিস্তানের ক্যাপিটাল টিভিতে এক টকশোতে সাংবাদিক জায়গাম খান ক্ষুব্ধকণ্ঠে বলেছিলেন, ‘খোদাকে ওয়াস্তে হামে বাংলাদেশ বানা দো’। কিন্তু ইমরান খানের চার বছরের শাসনামলেও জায়গামের আকুতি কারও কানে গেছে বলে মনে হয় না। বরং আবিদ হাসানরা আজ লিখছেন, ১০ বছরের মধ্যে বাংলাদেশের কাছে হাত পাততে হবে পাকিস্তানকে। আবিদ হাসানের লেখাটি বেশি তৃপ্তি আনে। কারণ, একাত্তর সালে আমরা যুদ্ধ করে পাকিস্তানের কাছ থেকে স্বাধীনতা এনেছি। তখন পাকিস্তান আমাদের মিসকিন মনে করতো। ২৩ বছর ধরে বঞ্চনা আর শোষণে পশ্চিম পাকিস্তান আমাদের দাবিয়ে রাখতে চেয়েছিল। পারেনি। বাংলাদেশ মিসকিন তো নয়ই, বরং পাকিস্তানের এখন হাত পাতার দশা। বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এখন উপচেপড়া। বাংলাদেশ এখন শ্রীলঙ্কাকে ঋণ দিচ্ছে। আবিদ হাসানের কথামতো যদি ২০৩০ সালে পাকিস্তান বাংলাদেশের কাছে হাত পাতে, আমরা হয়তো ফিরিয়ে দেবো না।

দেশের বাইরে এত মন ভালো করা খবর। আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক, কৌশিক বসু, আবিদ হাসান সবার রিপোর্টে, সবার কলমে বাংলাদেশের প্রশংসা। কিন্তু দেশের ভেতরের দিকে তাকালে বরং মন খারাপ হয়ে যায়। খাতে খাতে দুর্নীতি আর অনিয়মের খবর। কেনাকাটা নিয়ে যা হয় বাংলাদেশে, তাকে এখন আর কেউ পুকুর চুরি বলে না, সাগরচুরি বললেও কম বলা হয়। ২৫০ টাকার সুই কেনা হয় ২৫ হাজার টাকায়। এরকম হরিলুট বোধহয় শুধু বাংলাদেশেই সম্ভব! দুর্নীতি আসলে পদে পদে। কোথায় ব্রিজ ধসে পড়ে, কোথাও রডের বদলে বাঁশ দেওয়া হয়। এমনকি বছর ঘোরার আগেই প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাড়ি ভেঙে পড়ে। আসলে দুর্নীতি আমাদের সবকিছু ভেঙে ফেলে। প্রধানমন্ত্রী যে আন্তরিকতায় গরিব মানুষের মাথা গোঁজার ঠাঁই করে দিলেন, দুর্নীতিবাজরা তা গিলে খেলো। এমনকি করোনাকালে গরিব মানুষকে সাহায্যের নানা উদ্যোগকেও ব্যর্থ করে দিয়েছে এই দুর্নীতিবাজরা। কেন্দ্রে যা বরাদ্দ হয়, তৃণমূলে তার ফোঁটাও পৌঁছে না। গরিব মানুষের টাকাও মেরে খায় আমলা আর ঠিকাদাররা। আমাদের শ্রমিকরা বিদেশে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে অর্জন করা অর্থ দেশে পাঠায় আর আমাদের বড় লোকেরা, এমনকি এমপিরা সেই টাকা পাচার করে কানাডায় বেগমের জন্য বাড়ি কেনে। হাজারো শ্রমিক বছরজুড়ে যত টাকা পাঠায়, এক পি কে হালদার তার কয়েকগুণ পাচার করে দেয়। আমরা দাবি করি শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়াও, স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়াও। কিন্তু বছর শেষে দেখি এই করোনাকালেও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় তার বরাদ্দের ৮০ ভাগ ব্যয় করতে পারেনি। যে ২০ ভাগ ব্যয় করেছে, তার অনেকটাই গেছে দুর্নীতিবাজদের পেটে। তার মানে আসলে বরাদ্দের কত ভাগ জনগণের কাজে লেগেছে?

কৌশিক বসু আর আবিদ হাসানদের লেখা যতটা মন ভালো করে, এই দুর্নীতির খবর মন তারচেয়ে বেশি খারাপ করে। আমার আসলে মন খারাপের চেয়ে আফসোস বেশি হয়। বাংলাদেশের যে সম্ভাবনা, উন্নয়নের যে গতি; ইশ যদি দুর্নীতিটা না থাকতো; তাহলে আমরা কোথায় যেতে পারতাম! স্কাই ইজ দ্য লিমিট। আল্লাহর ওয়াস্তে কঠোর হাতে দুর্নীতির লাগাম টানুন, পৃথিবীর কেউ বাংলাদেশকে দাবায়ে রাখতে পারবে না। (সূত্র-বাংলাট্রিবিউন)

লেখক: হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
উপরে