শৃঙ্খলিত সাংবাদিকতা: রক্ষক ‍শুধুই এক নীরব কৌতূহলী দর্শকের ভূমিকায়

প্রকাশিত: মে ২৩, ২০২১; সময়: ১:০১ pm |
খবর > মতামত

শাখাওয়াত লিটন : সাংবাদিক রোজিনা ইসলামের বিরুদ্ধে মান্ধাতার আমলের অফিশিয়াল সিক্রেসি আইনে মামলার পর বাংলাদেশে স্বাধীন সাংবাদিকতা যখন অনেকটাই হুমকির মুখে তখন গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষা ইস্যুতে নিজেদের প্রতিষ্ঠার মূল লক্ষ্য উদ্দেশ্য ভুলে নীরব দর্শকের ভূমিকা নিয়ে বসে আছে বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিল।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ‘গোপনীয় নথির ছবি তোলার অভিযোগে’ রোজিনা ইসলামকে সচিবালয়ে অবরুদ্ধ করে রেখে অপদস্ত করা, তার বিরুদ্ধে মামলা এবং তাকে কারাগারে পাঠানোর পর সামাজিক মাধ্যম ছাড়াও সারাদেশেই প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে। রোজিনার মুক্তির দাবিতে সারাদেশে রাজপথে নেমে এসেছে সাংবাদিকদের বিভিন্ন সংগঠন।

সংবাদপত্রের সম্পাদকদের সংগঠন ‘সম্পাদক পরিষদ’ এক বিবৃতিতে বলেছে: ‘১৯২৩ সালের অফিসিয়াল সিক্রেট অ্যাক্টের আওতায় রোজিনা ইসলামের বিরুদ্ধে যে মামলা করা হয়েছে, এই যুগে এই সময়ে একজন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে ঔপনিবেশিক আমলের আইনে মামলা দায়ের সংবাদপত্রের কণ্ঠরোধের নেতিবাচক মনোভাব ও অশুভ মানসিকতাই বহিঃপ্রকাশ। যা গণমাধ্যমের স্বাধীনতা খর্বের চেষ্টার পাশাপাশি আগামী দিনের স্বাধীন সাংবাদিকতা ও মত প্রকাশের জন্য হুমকি। একটি গণতান্ত্রিক সমাজে এ ধরনের হীন চেষ্টা সংবাদপত্রের অস্তিত্বকে হুমকির দিকে ঠেলে দেয় ও পেশাকে চ্যালেঞ্জের দিকে নিয়ে যায়।’

সংবাদপত্রের স্বাধীনতা রক্ষার জন্য ১৯৭৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়া প্রেস কাউন্সিল দেশের আলোচিত এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কর্ণপাতও করেনি, টু শব্দটিও করেননি। আইনের মাধ্যমে এ প্রতিষ্ঠানটিকে যে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, তা পালন তো দূরে থাক প্রতিষ্ঠানটি কুম্ভকর্ণের মতো নীরব থেকে দায়িত্বের পুরো বিপরীত পথেই হাঁটছে।

অথচ প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম নিয়ে দ্য প্রেস কাউন্সিল অ্যাক্ট ১৯৭৪ এর ১১(১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, “কাউন্সিলের উদ্দেশ্য হল সংবাদপত্রের স্বাধীনতা রক্ষা করা এবং বাংলাদেশের সংবাদপত্র ও সংবাদ সংস্থাগুলির মান বজায় রাখা এবং উন্নতি করা।”

ওই আইনে সংবাদপত্র এবং সংবাদ সংস্থাগুলোর স্বাধীনতা বজায় রাখতে সহায়তা করতেও প্রেস কাউন্সিলকে বলা হয়েছে।

বাংলাদেশ সরকারের প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের প্রাণকেন্দ্র সচিবালয়ে একজন সাংবাদিককে হেনস্তার মতো এমন একটি গর্হিত কাজের সপ্তাহ পার হতে চললেও এখন পর্যন্ত কোনো ধরনের সহায়তা কিংবা বক্তব্য নিয়ে এগিয়ে আসতে দেখা যায়নি প্রেস কাউন্সিলকে।

অথচ সংবাদপত্রের স্বাধীনতা অক্ষুন্ন রাখতে প্রেস কাউন্সিল আইনে ‘জনস্বার্থ ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের সরবরাহ ও প্রচারকে সীমাবদ্ধ করতে পারে এমন কোনও কর্মকাণ্ড পর্যালোচনা করার জন্য’ করতে হয়েছে কাউন্সিলকে।

গত বছরের আগস্টে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় যখন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা না বলার জন্য একটি সার্কুলার জারি করে তখনও নীরব ভূমিকা পালন করেছে প্রেস কাউন্সিল। বিপরীতে মহামারিকালে এমন সার্কুলারের জন্য সেসময় দেশজুড়ে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছিল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে।

১৯৭৪ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সরকারের আমলে যখন সংসদে এ আইনটির প্রস্তাবনা উপস্থাপন করা হয় তখনও সুস্পষ্টভাবে বলা হয় প্রেস কাউন্সিল প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যই হল সংবাদপত্রের স্বাধীনতা রক্ষা করা।

১৯৭৪ সালের প্রেস কাউন্সিল আইনে ‘preserving freedom of the press’ শব্দগুলো ব্যবহার করা হয়েছে। বাংলা একাডেমির অভিধান অনুযায়ী, ‘PRESERVE’ শব্দের অর্থ রক্ষা করা, ক্ষতির হাত থেকে বাঁচানো, পচন থেকে রক্ষা করা ইত্যাদি। সুতরাং ‘preserving freedom of the press’ বা ‘সংবাদপত্রের স্বাধীনতা রক্ষা করা’ বিষয়টির অর্থ খুবই পরিষ্কার।

সংবাদপত্রের স্বাধীনতায় আঘাত, সংবাদপত্রকে ক্ষতি ও ধ্বংস থেকে রক্ষা করার জন্য প্রেস কাউন্সিল আইনগতভাবে বাধ্য। এ প্রতিষ্ঠিানটির কাজ হল গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, বাঁচিয়ে রাখা, অক্ষত রাখা এবং অন্যান্য ক্ষয়ক্ষতি থেকে গণমাধ্যমকে মুক্ত রাখা।

তবে এ বিষয়ে কিছুটা ভিন্নমত পোষণ করেন প্রেস কাউন্সিলের প্যানেল চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট সৈয়দ রেজাউর রহমান।

সাংবাদিক এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা যেহেতু ব্রিটিশ আমলের আইন অফিশিয়াল সিক্রেসি অ্যাক্টকে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য হুমকিস্বরূপ বলছে সেহেতু এ বিষয়ে প্রেস কাউন্সিলের কিছু করার আছে কিনা জানতে চাইলে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে তিনি বলেন, “বিরাজমান পরিস্থিতিতে প্রেস কাউন্সিলের বিশেষ ভূমিকা নেওয়ার খুব কমিই সুযোগ রয়েছে।”

তিনি বলেন, সাংবাদিকরা গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং দেশের গণতন্ত্রের জন্য কাজ করেন। যদি তারা তাদের দায়িত্ব পালনের সময় ‘অন্যায়ভাবে’ বাধার সম্মুখীন হন এবং কাউন্সিলের কাছে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন তবে কাউন্সিল অভিযোগটি পরীক্ষা করে দেখতে পারে।

প্রেস কাউন্সিলের প্যানেল চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট সৈয়দ রেজাউর রহমানের এই বক্তব্যের সঙ্গে একমত নন বিশিষ্ট আইনবিদ শাহদীন মালিক।

দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে তিনি বলেন, “গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষা করতে এবং সাংবাদিকদেরকে হেনস্থার হাত থেকে রক্ষা করতেই এই কাউন্সিল প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। কিন্তু যখন সবাই বলছে গণমাধ্যমের মুখ বন্ধ করতে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে এই অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট ব্যবহার করা হচ্ছে তখন কাউন্সিলের এমন অকার্যকারিতা ও নীরবতা দুর্ভাগ্যজনক।”

তিনি বলেন, কাউন্সিল তার আইনি দায়িত্বে পালনে অবহেলা করছে।

কাউন্সিলের নেতৃত্বে থাকেন চেয়ারম্যান, যিনি সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারক বা শীর্ষ আদালতের বিচারক হওয়ার যোগ্য। এই সংস্থাটিতে ১৪ জন সদস্য আছেন যার মধ্যে রয়েছেন প্রবীণ সাংবাদিক, শিক্ষাবিদ এবং দুইজন সংসদ সদস্য।

রাষ্ট্রপতি কর্তৃক তিন বছরের মেয়াদে মনোনীত কাউন্সিলের চেয়ারম্যান একজন সার্বক্ষণিক কর্মকর্তা। তিনি মাসিক বেতন এবং অন্যান্য পারিশ্রমিক পান। কাউন্সিলের সভায় অংশ নেওয়ার জন্য পারিশ্রমিক পান অন্য সদস্যরাও।

একটি সংবিধিবদ্ধ এবং আধা-বিচার বিভাগীয় সংস্থা হিসেবে গণমাধ্যমের প্রহরীর কাজ করে আসলে প্রেস কাউন্সিল। এটি সাংবাদিকতার নৈতিকতা লঙ্ঘনের জন্য সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধেও বিচারপূর্বক রায় প্রদান করে।

প্রকৃতপক্ষে, সভ্য দেশগুলিতে দীর্ঘদিন ধরেই এ জাতীয় ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ১৯১৬ সালে সুইডেনে সংবাদপত্রের জন্য ‘কোর্ট অফ অনার’ নামে বিশ্বের প্রথম প্রেস কাউন্সিল প্রতিষ্ঠা করা হয়।

এই ধারণাটি দ্রুতই অন্যান্য স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলিতে ও পরবর্তীতে ইউরোপের অন্যান্য অংশে, কানাডা, এশিয়া, অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ডে গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করে। ২০১৭ সালে প্রকাশিত ইন্ডিয়া টুডের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বে চার ডজনেরও বেশি দেশে প্রেস কাউন্সিল বা সমজাতীয় গণমাধ্যম সংস্থা রয়েছে।

আমাদের আইন প্রণেতারাও ১৯৭৪ সালে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষার জন্য এমন একটি পদ্ধতি ও একটি নিবেদিত প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছিলেন।

এর কারণ পরিষ্কার। সংবাদমাধ্যম যদি জনস্বার্থের নজরদারি হিসেবে কার্যকরভাবে কাজ করতে চায় তবে অবশ্যই এর নিরাপদে মত প্রকাশের স্বাধীনতা থাকতে হবে।

এ লক্ষ্যেই তারা প্রেস কাউন্সিল প্রতিষ্ঠার জন্য আইনটি কার্যকর করার সিদ্ধান্ত নেয় যা পৃথিবীর বহু দেশেই রয়েছে।

প্রশাসনিক কাজকর্মের জন্য প্রেস কাউন্সিলের এখন একটি অফিস ভবন রয়েছে। প্রশাসন পরিচালনার জন্য এতে ১২ জন কর্মকর্তা ও কর্মচারী রয়েছে। প্রতি বছর সরকার কাউন্সিলের চেয়ারম্যান ও কর্মচারীদের বেতন এবং অন্যান্য ভাতার জন্য এ দেশের করদাতাদের অর্থ বরাদ্দ করে।

কিন্তু প্রতিষ্ঠার ৪৬ বছর পর এসে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষায় যখন এ প্রতিষ্ঠানটিকে দারুণভাবে প্রয়োজন, তখন প্রেস কাউন্সিলের এমন উদ্বেগজনক নীরবতা সবাইকে দারুণভাবে হতাশ করে। এ নীরবতা আমাদের সামনে এই বার্তাই উপস্থাপন করে, একটি কার্যকর আইন প্রয়োগ করা না হলে তা সময়ের ব্যবধানে অপ্রয়োজনীয় ও ভোতা হয়ে পড়ে।

লেখক: উপ-নির্বাহী সম্পাদক, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড

সূত্র : দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
উপরে