রাবি নীতিভ্রষ্ট শিক্ষকদের হাতের ক্রীড়নক?

প্রকাশিত: মে ১৭, ২০২১; সময়: ১২:১২ pm |

গোলাম সারওয়ার : বিশ্ববিদ্যালয় সারাবে কে ? এই প্রশ্ন রেখেছেন নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির রাজনীতিবিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. হেলাল মহীউদ্দীন। তিনি তাঁর শিক্ষকতাজীবনের বেশিরভাগ সময়েই কাটিয়েছেন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসরে।

গত ১৪ মে প্রথম আলোর অনলাইন সংস্করণে উপরোল্লিখিত শিরোনামে তাঁর একটি কলাম প্রকাশিত হয়। মূলতঃ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক সময়ের ন্যক্কারজনক ঘটনাবলীকে কেন্দ্র করেই তাঁর এ লেখা। বিশেষ করে কিছুসংখ্যক শিক্ষক পদ-পদবীর লোভের বশবর্তী হয়ে তারা যেসব ঘৃণ্য কর্মকান্ডে জড়িত হয়ে পড়ছেন,সেটাই লেখার উপজীব্য।

ডঃ মহীউদ্দীন এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘‘এ কথা সত্য যে,বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্ষমতা ও হালুয়া-রুটির রাজনীতি সংশ্লিষ্ট অশিক্ষকসূলভ কর্মজীবীদের সংখ্যা অতীতের যে কোন সময়ের চেয়ে এখন অনেক বেশি।দুর্নীতি, অনিয়মও পাল্লা দিয়ে বাড়ছে’’। লেখার উপসংহারে তিনি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্রের ফেসবুক থেকে এ সংক্রান্ত একটি পোস্ট উদ্ধৃত করেন।

ছাত্রটি নিজের বিশ্ববিদ্যালয় প্রসঙ্গে পোস্টে বলেন,‘‘আগামী জুন মাসে ট্রেজারার ও প্রোভিসি পদে নতুন মুখ আসতে যাচ্ছে।সরকারের প্রতি আবেদন, দু’জন আমলা নিয়োগ দিন। কারণ,আমি চাই শিক্ষকেরা ক্লাসে ফিরুক। পদে যাওয়ার জন্য ভোর রাতে শিক্ষকরা মারামারি না করুক। যৌন নিপীড়নের কথিত অভিযোগ না সাজাক। আমি চাই, আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা প্রশাসনিক পদ পাওয়ার জন্য ভিসির গেটের সামনে খাসির মাংস নিয়ে অপেক্ষা না করুক। আমি চাই আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা পদায়নের লোভে, নিজের রাজনৈতিক স্বার্থে ক্লাস বর্জন না করুক, ছাত্র রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ না করুক। শিক্ষার্থীদের বাসায় ডেকে নিয়ে সালামির ভাগ না বসাক। শুধু প্রশাসনিক লোভনীয় পদের দৌড়াদৌড়ি বন্ধ হলেই শিক্ষকেরা অপরাজনীতি ছেড়ে ক্লাসে যাবেন। গত পাঁচ বছরে আমি যে তামাশা দেখেছি তার প্রতিবাদে আমার কাছে এ ছাড়া আর ভিন্ন শব্দায়ন নেই।’’

স্বায়ত্তশাসিতসহ প্রায় অধিকাংশ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরা তাদের পদলোভী শিক্ষকদের প্রতি এ ধরনের মত পোষণ করেন-যা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রতিনিয়ত দেখা যাচ্ছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরাও এ ধরনের শিক্ষকদের এবং নীতিভ্রষ্ট ভিসির বিরুদ্ধে ফেসবুক পেজে নানা নেতিবাচক স্ট্যাটাস, কমেন্ট, ভিডিও দ্বারা ঘৃণা প্রকাশ করেছে। প্রশাসনের সর্বোচ্চ পদসহ তদবিরবাজ, তৈলমর্দনকারী, চাটুকার রেজিস্ট্রার, প্রক্টর, প্রভোস্ট, প্রশাসক, বিভিন্ন দপ্তরের ও ইনস্টিটিউটের পরিচালক পদে দায়িত্বপ্রাপ্তদের অনিয়ম, দুর্নীতি, অশিক্ষকসূলভ কর্মকান্ডের বিরুদ্ধে তারা ভিন্নভাবে প্রতিবাদ জানাচ্ছেন। পেশার অমর্যাদাকারি এইসব শিক্ষকরা প্রশাসনের কাজে ব্যতিব্যস্ত থাকার কারণে তাদের মূল কাজ শিক্ষাদানকেও অবজ্ঞা করে।

নানা ধরনের ভিডিও’র মধ্যে রয়েছ- নিখিলবঙ্গ বিয়ে খাওয়া কমিটি, যা শয়তান দূর হয়ে যা, রাবি ক্যাম্পাস থেকে চলে যা, ইত্যাদি। ‘‘শয়তানমুক্ত রাবি’’ হ্যাশট্যাগে রাবি শিক্ষার্থীদের এমন বেশকিছু ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে গত ৭মে জুম্মার নামাজের পর থেকে। তারা ক্যাম্পাসের বিভিন্ন স্থানে তিনবার পাথর নিক্ষেপের মাধ্যমে তাদের এই প্রতীকী প্রতিবাদ পালন করছে। কতিপয় লোভী শিক্ষকদের বিবেকবর্জিত কদর্য কাজ শিক্ষার্থীদের মনোকষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

শয়তানদের তাড়িয়ে শিক্ষাঙ্গনটি অনিয়ম, অনৈতিক, আদর্শহীন এবং ক্লাসে ফাঁকিবাজ স্বার্থান্ধ শিক্ষকদের মোহভঙ্গ ঘটানো জরুরি হয় পড়েছে বলে তারা মন্তব্য করেন। পাশাপাশি তারা শিক্ষা ও গবেষণার সহায়ক পরিবেশ তৈরির জন্য আকুল আবেদন জানিয়েছেন। তারা তাদের প্রিয় শিক্ষকদের শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে রক্ষা করতে চায়।আর একমাত্র পাথর নিক্ষেপের মাধ্যমেই শয়তানকে ক্যাম্পাস থেকে স্থায়ীভাবে বিতাড়িত করা সম্ভব বলে তারা মনে করছেন।তারা ধারাবাহিকভাবে এই কর্মসূচি অব্যাহত রাখবেন বলে ভিডিওতে জানিয়েছেন।

রাজশাহীবিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক ড. সুলতান মাহমুদ রানা পত্রিকায় প্রকাশিত তাঁর একটি নিবন্ধে এইসব লোভাতুর শিক্ষকদের প্রসঙ্গে বলেন, ‘‘প্রশাসনের বিভিন্ন পদ-পদবীর আশায় নোংরামো কর্মকাণ্ড এখন চিরাচরিত রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। উল্লেখ করতে খারাপ লাগলেও এটি সত্য যে, রাজনীতির নেতিবাচক সংস্কৃতি এখন শিক্ষকরাই বেশি প্রাকটিস করতে শুরু করেছেন। কে প্রশাসনে যাবে,কে যাবেনা, কাকে বাদ দিতে হবে, কাকে চাকরিচ্যুত করতে হবে, কার বিরুদ্ধে মিথ্যা হয়রানিমূলক আচরণ করতে হবে, কাকে মিথ্যা অভিযোগে জর্জরিত করতে হবে, কাকে পদ দিতে হবে, কাকে দিতে হবেনা, কার পদোন্নতি বিলম্বে করতে হবে, কার দ্রুত করতে হবে- এগুলো এখন শিক্ষক রাজনীতির মূল বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর এর ফল হিসেবে শিক্ষকদের মধ্যে দলাদলির মাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে আগের তুলনায় অনেক বেশি। একই দলের মধ্যে গ্রুপিং শুরু হয়েছে।’’

তারই কারণে সৃষ্টি হয় প্রফেসর সোবহান গ্রুপ বনাম প্রফেসর মিজান গ্রুপ। প্রগতিশীল শিক্ষকদের যে অংশ প্রফেসর সোবহানের দুর্নীতির বিরুদ্ধে আন্দোলন করছেন তা এই গ্রুপিংয়েরই ফসল। এখন ক্যাম্পাসে আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রফেসর সোবহানের সময়ে সবচেয়ে সুবিধাভোগী কয়েকজন শিক্ষকের নির্লজ্জ ভূমিকা নিয়ে। গত ৪-৬ মে পর্যন্ত ‘‘দুর্নীতিবিরোধী শিক্ষকসমাজের’’ ব্যানারে অন্যান্যদের মধ্যে ঐ কয়েকজন শিক্ষককে সোচ্চার ভূমিকা পালন করতে দেখা গেছে।

ভিসি সোবহানকে কুমন্ত্রণা দেয়া থেকে শুরু করে প্রায় সবধরনের নেতিবাচক কর্মকাণ্ডের সহযোগী ছিলেন তাঁরা। চাহিদামত আরো সুযোগ-সুবিধা না পাওয়ায় এবং সামনে বিপদ বুঝতে পেরে মুখ মুছে ফেলে দিয়ে নিজেদের ‘ধোয়া তুলসিপাতা’ প্রমাণ করতে এখন তাঁরা ভিঁড়েছে তাদেরই গুরুর বিরুদ্ধে আন্দোলনরত গ্রুপে। ঘনিষ্ঠমহল সূত্রে জানা গেছে,এইসব সুবিধাবাদী কয়েকজন শিক্ষকের কর্মকাণ্ডের অডিও ক্লিপ সাংবাদিকদের হাতে আছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষককে আমাদের সমাজে আমরা সবচেয়ে বিবেকবান, জ্ঞানী এবং গুণী বলে মনে করি, কিন্ত এত বড় বড় ডিগ্রি নিয়ে, মেধাবি হয়ে, বিদেশী বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা নিয়ে এইসব অনৈতিক কাজ করতে তাদের বিবেকে একটুও বাধেনা! শিক্ষা নাকি মানুষকে মহীয়ান, গরীয়ান করে। কী শিক্ষা তারা গ্রহণ করেছে? এইসব কারণে এখন অনেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের সাথে মেয়ে বিয়ে দিতে চায়না। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষকই তাদের মেয়েকে এদের সাথে বিয়ে দিতে অমত পোষণ করেন।

এ প্রসঙ্গে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সন্মানিত সাবেক ভিসি (যিনি পরবর্তীতে রাষ্ট্রদূত হয়েছিলেন) প্রফেসর সাইদুর রহমান খান বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনে অনুষ্ঠিত এক আলোচনা সভায় দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, ‘‘শিক্ষকতার আদর্শের জায়গায় যে ধস নেমেছে, তাতে আমাদের নৈতিকতা শিক্ষার এখন বড় প্রয়োজন। সিনিয়র শিক্ষকরা জানেন, আগে শিক্ষক মানে কেমন ছিলেন, আর এখন সব টিটকারি মারে। একজন সাবেক শিক্ষক হিসেবে এটা আমার গায়েও লাগে।’’

নিজেদের বিশ্ববিদ্যালয়ের গুণী শিক্ষকরাও এই ধরনের আদর্শচ্যুত শিক্ষকদের কর্মকাণ্ডে লজ্জিত, বিব্রত। শিক্ষকের বিচ্যুতি যদি এমন নগ্নভাবে উন্মোচিত হয়, তাহলে এর নেতিবাচক প্রভাব সুদূরপ্রসারী।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ধস ঠেকাতে হলে, মান রক্ষা করতে হলে মূল ভূমিকা পালন করতে হবে এই বিশ্ববিদ্যালয়েরই শিক্ষক সমাজকে।যাদের গায়ে অন্ততঃ আঁচ লাগছে, সেইসব সাধারণ শিক্ষকরা। রুখে দাঁড়ান ঐসব নীতিহীন, আদর্শহীন শিক্ষকদের বিরুদ্ধে। ঐসব নীতিভ্রষ্ট শিক্ষকদের কারণে কেন প্রকৃত শিক্ষকরা দায়ী হবেন? একদল শিক্ষকের স্খলনের দায়ে কেন তাঁরা নিজেদের ছাত্র-ছাত্রীদের কাছে অসন্মানিত হবেন? কেন তাদের অপকর্মের কারণে আমাদের প্রিয় ঐতিহ্যবাহী এই বিশ্ববিদ্যালয়ের বদনাম হবে? ঐসব লোভাতুর, অশিক্ষকসূলভ মনোভাবের শিক্ষকদের হাতের ক্রীড়নক নাকি এই বিশ্ববিদ্যালয়? এসব দেখার কী কেউ নেই?

লেখক- সাবেক সভাপতি, রাজশাহী প্রেসক্লাব।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
উপরে