লকডাউন বা নিষেধাজ্ঞায় ভাবা হয়নি গরিবের কথা

প্রকাশিত: এপ্রিল ৫, ২০২১; সময়: ৭:১৭ pm |
খবর > মতামত

গোলাম মোর্তোজা : সড়ক ও সেতুমন্ত্রী ৩ এপ্রিল ঘোষণা দিয়েছিলেন লকডাউনের। ৪ এপ্রিল সরকার ঘোষিত নিষেধাজ্ঞায় লকডাউন শব্দটি ব্যবহার না করে কিছু সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। দেরিতে হলেও এবারের করোনাভাইরাস সংক্রমণের বিষয়টি সরকার যে গুরুত্ব দিয়ে নিয়েছে, জারি হওয়া নিষেধাজ্ঞায় তা অনুভূত হয়। গণপরিবহন, সড়ক, নৌ, অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট বন্ধ থাকার কথা বলা হয়েছে। সরকারি-বেসরকারি অফিস সীমিত পরিসরে খোলা রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কর্মীদের নিজ পরিবহনে আনা-নেওয়ার কথা। রাতে বের না হওয়া, শপিংমল বন্ধ রেখে অনলাইন বেচা-কেনা চালু, নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত খোলা জায়গায় কাঁচা বাজার, পোশাক শ্রমিকদের জন্যে কারখানার আশেপাশে ফিল্ড হাসপাতাল তৈরির কথাও বলা হয়েছে। পোশাক কর্মীরা কারখানায় যাবেন কীভাবে, তা নির্দিষ্ট করে বলা হয়নি। নিষেধাজ্ঞার এই ঘোষণার কিছুক্ষণের মধ্যে জানা গেল বইমেলা চলবে। একটির সঙ্গে আরেকটি সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক সিদ্ধান্ত।

এ ধরনের নিষেধাজ্ঞায় অনেককিছু বন্ধ বা সীমিত পরিসরে চালু থাকলে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েন নিম্ন আয়ের মানুষ। দিন এনে দিন খাওয়া শ্রমজীবী মানুষ, বস্তিবাসী। তাদের তাৎক্ষণিক সহায়তা, খাদ্যের যোগান দেওয়া বিষয়ে কোনো কিছু বলা হয়নি সরকারি ঘোষণায়।

লকডাউন বা এই নিষেধাজ্ঞাকালীন করণীয় কী? পরিবহন শ্রমিক, দিনমজুরদের কাজ থাকবে না। তারা কী করবেন? কাজের সন্ধানে বাইরে ঘুরবেন। কাজ না পেলে গ্রামে চলে যাবেন বা যাওয়ার চেষ্টা করবেন। সেখানেও সবার কাজ থাকবে না। তারা গ্রামে গেলে, তাদের সঙ্গে ভাইরাসও যাবে।

মানুষ সারা দেশে ছড়িয়ে পড়লে করোনাভাইরাসও আরও ছড়িয়ে পড়বে।

নিষেধাজ্ঞার ঘোষণায় এসব গরিব মানুষের কথা ভাবা হয়নি। বিবেচনায় নেওয়া হয়নি ক্ষুধা যে করোনার চেয়েও ভয়ঙ্কর। খাদ্যের জোগান দিতে না পারলে গরিব মানুষকে যে ঘরে রাখা যাবে না, তা ভাবা হয়নি। ঘোষণায় সামগ্রিক পরিকল্পনার ছাপ দৃশ্যমান হয়নি।

এবারের এই নিষেধাজ্ঞা বা লকডাউন আরও আগে প্রত্যাশিত ছিল। কিন্তু লোক সমাগম ঘটিয়ে উৎসবের সঙ্গে বহুকিছু উদযাপন করা হয়েছে। এর মধ্যে হেফাজতের আন্দোলন, হরতালও সংক্রমণকে বিস্তৃত করেছে। এসব ক্ষেত্রে সরকারকে তৎপর হতে দেখা যায়নি।

‘করোনা সংক্রমণ হঠাৎ করে বেড়ে গেছে’ ‘লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে সংক্রমণ ও মৃত্যু’ সরকারের পক্ষ থেকে এখন একথা অনেকেই বলছেন।

তার পরিপ্রেক্ষিতে প্রথমে এসেছে ১৮ দফা নির্দেশনা, তারপর লকডাউনের ঘোষণা এবং নিষেধাজ্ঞা।

সংক্রমণ ও মৃত্যু দ্রুত গতিতে বাড়ছে, তা তো দৃশ্যমান। কিন্তু সংক্রমণ এ মৃত্যু ‘হঠাৎ করে’ করে বেড়েছে, তা কি সত্যি?

পুনরায় সংক্রমণ বাড়তে পারে তা বোঝা গিয়েছিল গত ডিসেম্বরের শেষ দিক থেকে। ২৯ ডিসেম্বর দ্য ডেইলি স্টার প্রতিবেদন প্রকাশ করে সুনির্দিষ্টভাবে ব্রিটেনের নতুন স্ট্রেইন বিষয়ে সতর্ক করেছিল। সরকারের পক্ষ থেকে কোনো সতর্কতামূলক উদ্যোগ নিতে দেখা যায়নি। সরকারের দৃষ্টিভঙ্গিতে মনে হয়েছে করোনাভাইরাসের সংক্রমণের জন্যে পর্যাপ্ত সময় দেওয়া হয়েছে। মুরগি ডিমে তা দিয়ে যেভাবে বাচ্চা ফুটায়, সেভাবে করোনাভাইরাসকেও তা দিয়ে বংশবৃদ্ধি করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। ২ এপ্রিল মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার আয়োজন করে সংক্রমণ সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ার সুযোগও তৈরি করে দেওয়া হয়েছে। সরকার ঘোষিত ১৮ দফা নির্দেশনা সরকারই প্রথম ভঙ্গ করেছে। শুধু তাই নয়, লক্ষ মানুষের সমাবেশ ঘটিয়ে শিক্ষা স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জনমানুষের সঙ্গে রসিকতাও করেছে। তারা বিজ্ঞপ্তি দিয়ে বলেছে, স্বাস্থ্যবিধি মেনে মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর গত ২৯ মার্চ যে তথ্য জানিয়েছে, সেদিকে একটু নজর দেওয়া যাক। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা বলেছেন, ‘আমরা প্রতি সপ্তাহে বিশ্লেষণ করি যে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা কোনগুলো। ১৩ মার্চ বিশ্লেষণ করে ছয়টি জেলা পেয়েছিলাম। ২০ মার্চ বিশ্লেষণ করে ২০ টি জেলা পেয়েছিলাম। ২৪ মার্চ দেখেছি ২৯টি জেলা ঝুঁকিপূর্ণ। তারমানে সংক্রমণ আস্তে আস্তে ছড়িয়ে পড়েছে।’

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বক্তব্য প্রমাণ করছে এবারের সংক্রমণ ‘হঠাৎ করে’ বেড়ে যায়নি। পুরো মার্চ মাস ধরেই সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার তথ্য ছিল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কাছে। কিন্তু তারা সেই তথ্য প্রকাশ না করে গোপন রেখেছে। তথ্য গোপন রাখার উপকারিতা কী? কোনো উপকারিতা নেই, ক্ষতি আছে। ১৩ মার্চে ছয় জেলার সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার তথ্য প্রকাশ করে জনসচেতনতা তৈরির চেষ্টা করা দরকার ছিল। ছয় জেলার লোকজনদের দেশের অন্যত্র যাওয়া-আসায় নিরুৎসাহিত করার সুযোগ ছিল। অন্য জেলার লোকজনদের ঝুঁকিপূর্ণ ছয় জেলায় প্রবেশে বিধি-নিষেধ আরোপ করা যেত।

তাহলে হয়ত ২০ জেলা থেকে ২৯ জেলায় সংক্রমণ এভাবে ছড়িয়ে পড়ত না। কিন্তু তথ্য গোপন রেখে, কার্যকর কোনো উদ্যোগ না নিয়ে এখন বলা হচ্ছে সংক্রমণ ‘হঠাৎ করে’ বেড়ে গেছে।

লকডাউনের ঘোষণা কার্যকরের আগে ৪৮ ঘণ্টা সময় দেওয়া হয়েছে। ঘোষণা শোনার পর বাস টার্মিনাল, রেল স্টেশনে মানুষের ঢল নামল। সবাই ঢাকা ছাড়তে চান। এমন কিছু ঘটবে, সেটা মোটেই অপ্রত্যাশিত ছিল না।

মহামারি প্রতিরোধে লকডাউন বিজ্ঞান, রাজনৈতিক কর্মসূচি নয়। ঘোষণা এসেছে রাজনৈতিক কর্মসূচির মতো করে।

যেখানে কোয়ারেন্টিন ১৪ দিনের সেখানে লকডাউন বা নিষেধাজ্ঞা ৭ দিনের। হ্যাঁ, পরে বাড়ানোর সুযোগ আছে। কিন্তু সাতদিনে করোনার সংক্রমণ কমার যে কোনো সম্ভাবনা নেই, তা প্রথম পরিকল্পনায়ই থাকা দরকার ছিল। কলকারখানাও খোলা থাকবে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড চালু রাখা যেমন জরুরি, তার চেয়ে কম জরুরি নয় কার্যকর প্রক্রিয়ায় মহামারি মোকাবিলা করা।

বলা হচ্ছে শিল্প-কারখানায় স্বাস্থ্যবিধি মেনে কাজ হবে। সর্বত্র না হলেও কিছু কারখানায় হয়ত স্বাস্থ্যবিধি মানা হবে। কারখানার বাইরের পরিবেশ কেমন থাকবে? বিষয়গুলো গভীরভাবে বিবেচনা করা হয়েছে বলে মনে হয়নি।

তথ্য গোপন ও উদ্যোগহীনতার আরও দুটি উদাহরণ দিয়ে লেখা শেষ করি। দেশে পুনরায় করোনার সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়তে পারে, পূর্বাভাস ছিল ডিসেম্বর মাস থেকেই। ডিসেম্বরের শেষ দিক থেকে ব্রিটেনে করোনাভাইরাসের নতুন স্ট্রেইন আতঙ্ক তৈরি করে। লন্ডনের বাংলাদেশি অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে নতুন স্ট্রেইন ছড়িয়ে পড়ে। প্রায় ৫০টি দেশ সেই সময় ব্রিটেনের সঙ্গে উড়োজাহাজ যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়। বাংলাদেশ বন্ধ করেনি। ব্রিটেন থেকে আসা যাত্রীদের ১৪ দিনের বাধ্যতামূলক কোয়ারেন্টিন অপরিহার্য ছিল। ৪ দিন-৭দিন-১৪দিন, করছি-করব, ইত্যাদি কথা বলা হয়েছে। বাস্তবে সরকার কোনো উদ্যোগ নেয়নি। সারা দেশে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার পর ব্রিটেন ছাড়া ইউরোপসহ ১২ দেশের যাত্রীদের বাংলাদেশে ঢোকায় নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে বাংলাদেশ। প্রথম নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাশিত ছিল ব্রিটেনের ক্ষেত্রে। অথচ সেই ব্রিটেনকেই রাখা হয় নিষেধাজ্ঞার বাইরে। মজার বিষয় একদিন পর ব্রিটেনই বাংলাদেশের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে।

ব্রিটেনের নতুন স্ট্রেইন বাংলাদেশে শনাক্ত হয়েছে জানুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহে। সেই তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে মার্চ মাসের প্রথম সপ্তাহে। তথ্য প্রকাশ করে যখন সচেতনতা তৈরি করা জরুরি ছিল, তখন তথ্য গোপন রাখা হয়েছে। এখন বলা হচ্ছে ‘সংক্রমণ হঠাৎ করে বেড়ে গেছে’।

উদ্যোগহীনতার আরেকটি নজীর। বাংলাদেশের আরটি পিসিআর পরীক্ষায় ব্রিটেনের নতুন স্ট্রেইন শনাক্ত করা যায় না। ২৯ ডিসেম্বর দ্য ডেইলি স্টার এই তথ্য জানিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে।

বাংলাদেশের আরটি পিসিআরে টু জিন টেস্ট কিট ব্যবহার করা হয়। ব্রিটেনের নতুন স্ট্রেইন শনাক্তের জন্যে থ্রি জিন টেস্ট কিট ব্যবহার করতে হয়। বিশ্ববাজারে থ্রি জিন টেস্ট কিট সহজলভ্য হলেও এই এপ্রিল মাসেও বাংলাদেশ তা সংগ্রহ করেনি। অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল জিনোম সিকোয়েন্সিং করে বাংলাদেশ ব্রিটেনের নতুন স্ট্রেইন শনাক্ত করেছে। কিন্তু প্রতিদিনের সংক্রমণে নতুন স্ট্রেইনের উপস্থিতি কতটা, তা এখনও আমাদের অজানা।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর কি আছে কারও কাছে, অপরিকল্পিত ১৮ দফা, লকডাউন বা নিষেধাজ্ঞার সুফল পাওয়া যাবে?

[email protected]

সূত্র : দ্য ডেইলি স্টার

  • 125
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
উপরে