‘চিকিৎসক হিসেবে এক দুঃসময় পার করছি’

প্রকাশিত: মার্চ ৩০, ২০২১; সময়: ১:৪৩ pm |
খবর > মতামত

ডা. রাজীব দে সরকার : করোনা নিয়ে এই মৌসুমে আবার নতুন করে আলাপ-সংলাপ শুরু হলো। শুধু আমরা চিকিৎসক, সেবিকা আর স্বাস্থ্যকর্মীরা জানি, গত ১২টা মাসে করোনা আমাদের কাছে একটি দিনের জন্যও পুরনো হয়ে যায়নি।

করোনা হঠাৎ করেই ‘নস্যি’ হয়ে গিয়েছিল আমাদের দেশের মানুষের কাছে। কিন্তু আসলে, মিডিয়া হাইপ না পেলেও, করোনা একদিনের জন্যও আমাদের ছেড়ে যায়নি। শুধু আমরা ছেড়ে দিয়েছিলাম স্বাস্থ্যবিধি নামের জিনিসটাকে। অথবা স্বাস্থ্যবিধি ঝুলে ছিল আমাদের থুঁতনিতে।

গত ৭ দিনে আমার আত্মীয়-স্বজন, এলাকার মানুষ এবং পরিচিত কিছু মানুষজনের কাছে থেকে বেশ কিছু ফোন, WhatsApp বার্তা, Messenger বার্তা পেয়েছি, যাদের নিজেদের কিংবা তাদের পরিবারের কেউ না কেউ করোনা রোগের লক্ষণ নিয়ে আমাকে নক দিয়েছেন।

অন্যান্য স্বাস্থ্য পরামর্শের পাশাপাশি সবাইকেই করোনার টেস্ট করাতে বললাম। তাতেও ২/১ জন ছাড়া কারও সাড়া পেলাম না।
৪০-এর বেশি বয়স যাদের তাদের ভ্যাকসিন নেওয়ার ব্যাপারে প্রশ্ন করে উলটো আমিই হতাশ হলাম। সরকার ভ্যাকসিন দিচ্ছে। সম্পূর্ণ বিনা মূল্যে। একটি সুন্দর সাজানো গোছানো সিস্টেমের মাধ্যমে ভ্যাকসিন দেওয়া হচ্ছে। অনলাইনে এত সুন্দর নিবন্ধন ‘সুরক্ষা অ্যাপ’ যা খুব দ্রুত সময়ে সাধারণ মানুষের ব্যবহার উপযোগী করে তৈরি করা হয়েছে।

কিন্তু সেই ভ্যাকসিনের প্রতিও মনে হয় মানুষের অনীহা চলে এলো। আসলে খুব সহজে যা পাওয়া যায় তার প্রতি আকর্ষণ আর থাকে না। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী চৌকস কূটনৈতিক দূরদর্শিতায় যে অতি আরাধ্য ভ্যাকসিন আমরা পেলাম, অনেক দেশ এখনও সেই ভ্যাকসিনের দিকে বুভুক্ষের মতো চেয়ে আছে। অথচ আমরা পেয়েও ‘হাতের লক্ষ্মী পায়ে ঠেলছি’।

ফলে যা হওয়ার তাই হলো। ক্রমাগত চরিত্র পাল্টানোর ক্ষমতাসম্পন্ন করোনাভাইরাসের ইউকে ভ্যারিয়েন্ট এ দেশে ঢুকে পড়লো। ইনফেকশনের পরিমাণ ঝড়ের গতিতে বাড়তে শুরু করলো। আমার আশপাশের মানুষগুলোর আক্রান্ত হবার খবর প্রতিনিয়ত পাচ্ছি।
ফোনগুলো পেয়ে এখন আমি খুব নির্লিপ্ত থাকার চেষ্টা করি। কারণ আমি জানি, এদের কারও শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটলে হাসপাতালে একটা বেডও আমি জোগাড় করে দিতে পারবো না।

একজন চিকিৎসক হিসেবে আমি অনেক বাজে একটা সময় পার করেছি করোনা ইউনিটে দায়িত্বরত অবস্থায়। এ এক দুঃসময়। কোভিড ইউনিটে দেখেছি, একসাথে অনেকগুলো মানুষ শ্বাস নেওয়ার মতো স্বাভাবিক একটি কাজ করতে গিয়েও কাতরাচ্ছেন। হাই-ফ্লো অক্সিজেন দিয়েও তাদের স্টেবল করা যাচ্ছে না! সৃষ্টিকর্তা বাতাস ভরা অক্সিজেন দিয়েছেন। কিন্তু সেই অক্সিজেন প্রবল শক্তি দিয়েও বুক ভরে টেনে নিতে না পারার যে কষ্ট, সেটা যার হয়নি, তাকে বোঝানো যাবে না।

আমাদের জাতির আরও একটা ভালো গুণ দোষারোপ করা। নিজের ভুলটা আমরা দেখি না। গত কয়েকটা মাস বাসা থেকে হাসপাতাল আর হাসপাতাল থেকে বাসা যাওয়ার সময় আমি শতকরা ১০ ভাগ মানুষের মুখেও মাস্ক দেখিনি। শারীরিক দূরত্বের কোনও বালাই তো ছিলই না। ঘণ্টায় ঘণ্টায় হাত ধোয়ার যে নির্দেশনা ছিল, আন্দাজ করতে পারি তা কত নিষ্ঠার সাথে পালিত হয়েছে!

এ কোন ধরনের স্বাস্থ্যবিধি!!
এ কোন ধরনের প্রহসন!!

একটা মহামারি, এতগুলো মৃত্যু – এগুলো কি আমরা ভুলে বসে আছি? নাকি নিরুৎসব মৃত্যুও আমাদের আর নাড়া দেয় না? মৃত্যুর হার শতকরা কত, এই আলোচনাই অর্থহীন। কারণ, যার পরিবারে একজনও মারা যাচ্ছেন, তার কিন্তু পুরো শতভাগই ক্ষতিই হলো। তাই শতকরার পরিসংখ্যান বাবা হারানো ছেলে কিংবা ছেলে হারানো বাবাকে বলা আরেকটা প্রহসন!

আরেকটা কথা বলা প্রয়োজন, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চললে, বাইরে যারা কাজ করেন, যারা অফিসে কাজ করেন, তাদের প্রতিদিন ৬/৭টি সার্জিকেল মাস্ক লাগার কথা। কিন্তু একটি সার্জিক্যাল মাস্ক ৬/৭ দিন চালাতেও দেখেছি মানুষকে। হালকা নীল রঙের মাস্ক ধুলোয় কালো হয়ে গেছে আমাদের ‘মোডিফাইড’ স্বাস্থ্যবিধির কল্যাণে।

শনাক্তের হার ১৩% পেরিয়ে যাচ্ছে। সেটা পেরোচ্ছে কারণ হাসপাতালের আইসোলেশনে থাকা রোগীদের কিংবা হাসপাতালের নন-কোভিডে থাকা রোগীদের লক্ষণভিত্তিক কোভিড টেস্ট করানো হচ্ছে। করোনা আক্রান্তের লক্ষণ নিয়ে কেউ স্বতঃপ্রণোদিতে হয়ে টেস্ট করালে এই সংখ্যা আরও অনেক বাড়তো।

স্বাস্থ্য অধিদফতর তথা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে এই নতুন পরিস্থিতি মোকাবিলায় অনেক প্রস্তাবনা/নির্দেশনা দিয়েছে। সেগুলো কোনও দফতর এখনও আমলেই নেয়নি। বিসিএস-এর প্রিলিমিনারি পরীক্ষাটাও হলো। কক্সবাজার-সেন্ট মার্টিন প্লেজার ট্রিপগুলোও চলছে। ইউকে’র ফ্লাইটগুলো উঠছে-নামছে। কোয়ারেন্টিনে থেকে বিয়েশাদি হচ্ছে। সামনের সপ্তাহে মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা। ইনভিজিলেটর হিসেবে দায়িত্বপত্র হাতে পেলাম!

সবকিছুই হচ্ছে, সবকিছুই হবে।

শুধু এক দুঃসময়ের মুখোমুখি দাঁড়াচ্ছি আমরা, আমরা চিকিৎসকেরা, আমরা নার্সরা, আমরা স্বাস্থ্য কর্মীরা। যাদের ছুটি নেই। যাদের ছুটি ছিল না। ২৪ ঘণ্টা আরোগ্য নিকেতনগুলো খোলা রাখবো আমরা। দুঃসময়ের নদীটা পার করে দেবো আপনাদের। নিজেরা দুঃসময়কে কাঁধে করে নিয়ে আপনাদের মাস্কবিহীন ঘুরে বেড়ানোর সুসময়টা এনে দেবো।

শেষে একটা ঘটনা শেয়ার করি–

৩ মাস আগে লিফটে করে নামছিলাম আমরা ৩/৪ জন। সবাই সবার অপরিচিত। লিফটে শুধু আমিই মাস্ক পরা। একজন হঠাৎ করে বলে উঠলো, ‘দ্যাখেন, করোনা নিয়ে আমাদের ডাক্তাররা কি ভয়টাই না দেখিয়েছিল। দেশে নাকি মড়ক লাগবে। হাসপাতালে কোনও সিট পাওয়া যাবে না। কী একটা ‘চিটিং বাজি’! সবই ‘শালা’দের বিজনেস’।

আমি লিফটের ছাদে তাকিয়ে মনে মনে বললাম, ‘ঈশ্বর, আমার এই জাতিকে তুমিই রক্ষা করো’।

লেখক: রেজিস্ট্রার, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল।
সূত্র : বাংলাট্রিবিউন

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
উপরে