মন্দ ঋণ আসলে কত?

প্রকাশিত: মার্চ ১৩, ২০২১; সময়: ৮:২০ pm |
খবর > মতামত

রুমিন ফারহানা : কয়েক দিন আগে এক আলোচনায় খেলাপি ঋণের প্রসঙ্গ উঠতেই যখন বললাম বাংলাদেশে বর্তমানে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ সাড়ে তিন লক্ষ কোটি টাকার ওপরে, তখন উপস্থিত আওয়ামী লীগের এক সংসদ সদস্য এমনভাবে প্রতিক্রিয়া জানালেন, যেটি ছিল আমার জন্য বিব্রতকর তবে অপ্রত্যাশিত না। তার বক্তব্য ছিল, তিনি আমাকে মিথ্যাবাদী বা তথ্য গোপনকারী বলতে চান না, তবে আমি নাকি অবশ্যই দর্শক-শ্রোতাদের বিভ্রান্ত করছি। তার মতে দেশে বর্তমানে খেলাপি ঋণের পরিমাণ এক লক্ষ কোটি টাকার নিচে।

তাহলে এখন প্রশ্ন আসে কে সঠিক কথা বলছেন? বাংলাদেশে খেলাপি ঋণ আসলে কত? সাড়ে তিন লক্ষ কোটি টাকার ওপরে, নাকি এক লক্ষ কোটি টাকার নিচে? দুটি অংকের মধ্যে ব্যবধান এতই বেশি যে কোনও হিসাবেই আমরা দু’জনই সঠিক হতে পারি না। ব্যবধানটি আড়াই লাখ কোটি টাকার, যা আমাদের জাতীয় বাজেটের অর্ধেক। মজার বিষয় হলো আওয়ামী লীগের সাংসদ যা বলেছেন, সরকারি কাগজে-কলমে তা সঠিক। বাংলাদেশ সরকারের তথ্যমতে দেশে বর্তমানে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৮৮ হাজার কোটি টাকা। তাহলে কি আমি এটা জেনেও আওয়ামী লীগের সাংসদের কথা অনুযায়ী ইচ্ছাকৃতভাবে জনগণকে বিভ্রান্ত করেছি?

একটা কথা স্পষ্ট করা দরকার, খেলাপি ঋণের পরিমাণ যাই হোক না কেন, সরকারের অতি ঘনিষ্ঠ, মদদপুষ্ট লোক ছাড়া এই দেশে লক্ষ কোটি টাকা ঋণ খেলাপি হওয়া সম্ভব নয়। অতি ধনী বৃদ্ধির হারে বিশ্বে প্রথম হওয়া বাংলাদেশে সরকারি হিসাব মতেই মন্দ ঋণের পরিমাণ ৮৮ হাজার কোটি টাকা। বলে রাখি, সরকারি হিসাবে যখন খেলাপি ঋণ ১ লক্ষ ১০ হাজার কোটি টাকা দেখানো হচ্ছিল, তখন আইএমএফ বলেছে এই সংখ্যা আড়াই লাখ কোটি আর বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর গত বছর এক কর্মশালায় বলেন, ব্যাংকিং খাতের মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৯ শতাংশ বলা হলেও প্রকৃত খেলাপি ২৩ শতাংশ, যা অঙ্কের বিবেচনায় ৪ লাখ কোটি টাকার ওপরে। আর বিশ্ব ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশে খেলাপি ঋণের হার সবচেয়ে বেশি। প্রয়োজন না থাকলেও রাজনৈতিক বিবেচনায় ব্যাংকের অনুমোদন দেওয়া, ব্যাংকের পরিচালকদের পরস্পরের যোগসাজশে একে অন্যের ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়া, রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে ঋণ ফেরত না দেওয়ার সংস্কৃতি, মামলার দীর্ঘসূত্রতা সবকিছুই এই খেলাপি ঋণ বীভৎস পরিমাণে বাড়ার জন্য দায়ী। এমনকি সংসদে ৩০০ জন শীর্ষ ঋণ খেলাপির তালিকা আসার পরও তাদের বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে জানা যায় না।

সরকারি দল তাদের মন মতো তথ্য না হলে স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে সবকিছু তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেয়, তা সেই তথ্যের উৎস যত শক্তিশালীই হোক না কেন। করোনাকালে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি নিয়ে আইএমএফ এর তথ্য সরকারের পছন্দ হয়েছিল বলে সেটা নিয়ে খুব ঢাকঢোল পেটানো হয়েছিল, কিন্তু এখন এই আইএমএফ এর খেলাপি ঋণের তথ্য সরকারের পক্ষে যায় না বলে সেটা আস্থার যোগ্য না। এসব অস্বস্তিকর ক্ষেত্রে সরকারে তার নিজের সংস্থাগুলোর তথ্যের ওপর আস্থা রাখতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। অথচ বিশ্বব্যাংক বলছে (২০১৯ সালে) ডাটার বিশ্বাসযোগ্যতায় বাংলাদেশ ১০০ পয়েন্টে মাত্র ৬২.২ পয়েন্ট পেয়ে দক্ষিণ এশিয়ায় একেবারে তলানিতে আছে; একমাত্র আফগানিস্তান আছে বাংলাদেশের নিচে।

বাংলাদেশে গত ৩ বছরের খেলাপি ঋণের হার দেখে নেওয়া যাক। ২০১৯ সালে মার্চ শেষে দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের হার ছিল প্রায় ১২ শতাংশ। সেই সময়ে সরকারি হিসাব মতে অবলোপনকৃত ঋণ বাদেই খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৫৫ হাজার কোটি টাকার বেশি। বলে রাখি অবলোপনকৃত ঋণ হচ্ছে সবচেয়ে খারাপ শ্রেণির মন্দ ঋণ, যেটি উদ্ধারের আশা ব্যাংক আর করে না।

২০২০ সালের মাঝামাঝি সময়ে এই মন্দ ঋণ কমে দাঁড়ায় ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকায়, আর ২০২১ এ এসে এর পরিমাণ হয়েছে ৮৮ হাজার কোটি টাকা। পরিসংখ্যানগত দিক থেকে তাকালে চমৎকৃত না হয়ে পারা যায় না। কারণ সরকারি বয়ান মতে বাংলাদেশে খেলাপি ঋণের হার ধাপে ধাপে কমছে। কিন্তু আসলেই কি বিষয়টি তেমন?

ক্ষতিগ্রস্ত শিল্পোদ্যোক্তাদের বিশেষ সুবিধা দেওয়ার জন্য ২০১৫ সালে ঋণ পুনর্গঠনের নীতিমালা জারি করা হয়। যেসব শিল্প গ্রুপের ৫০০ কোটি টাকার ওপরে খেলাপি ঋণ ছিল তাদের ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিয়ে এবং যেসব শিল্প গ্রুপের এক হাজার কোটি টাকার ওপরে খেলাপি ঋণ ছিল তাদের এক শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিয়ে ঋণ নবায়নের সুযোগ করে দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। উদ্দেশ্য ছিল বিশেষ সুবিধা নিয়ে ঋণ পুনর্গঠনের মাধ্যমে শিল্পগুলোর লোকসান কাটিয়ে ওঠা। একইসঙ্গে প্রতিষ্ঠানগুলো চালু রেখে আয়-উপার্জনের মাধ্যমে ঋণের অর্থ পরিশোধ করা। বাংলাদেশ ব্যাংকের এমন সুবিধা নিয়ে ওই সময় ১১টি শিল্প গ্রুপ ১৫ হাজার কোটি টাকার ঋণ পুনর্গঠন করেছিল। এর ফলে ওই সময় রাতারাতি খেলাপি ঋণ কমে যায়। কিন্তু পুনর্গঠনের সুবিধা নিয়ে এসব শিল্প গ্রুপ ঋণ নবায়ন করলেও পরে ওইসব খেলাপি ঋণ যথাযথভাবে পরিশোধ করেনি। উপরন্তু যে পরিমাণ ঋণ পুনর্গঠন করেছিল, তার কিস্তি পরিশোধ না করায় সুদে-আসলে তা ক্রমান্বয়ে বেড়ে যাচ্ছে। শুধু তা-ই নয়, উচ্চ আদালত থেকে খেলাপি ঋণের ওপর স্থগিতাদেশ নিয়ে বড় গ্রুপগুলোর অন্য ব্যাংক থেকে ঋণ সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

কিছুদিন আগেই আবার দেওয়া হয় একই সুবিধা। দেশের অর্থনীতিবিদ, ব্যাংকার, এবং সচেতন মানুষদের প্রতিবাদের প্রতি ন্যূনতম ভ্রুক্ষেপ না করে ঋণখেলাপিদের জন্য ঋণের মাত্র ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিয়ে ঋণ পুনঃতফসিল করার সুবিধা দেওয়া হয়েছিল এবং সুদ ধার্য করা হয়েছিল মাত্র ৯ শতাংশ যা ১০ বছরে পরিশোধযোগ্য। সেই সুবিধা চলছে এখনও। এই সুবিধার ফলে বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণ এখন টেকনিক্যালি আর খেলাপি নয়। এর মধ্যে একটা মজার খবর নজর কাড়ল আমাদের। ঋণখেলাপিদের পরে এবার জালিয়াতি করে ব্যাংকের অর্থ আত্মসাতকারীদেরও বিশেষ সুবিধা দেওয়া হচ্ছে।

এছাড়াও তিন মাস যদি কোনও ঋণখেলাপি থাকে তাহলে তাকে ‘খেলাপি ঋণ’ বলা হবে। এটিই বিশ্বের নিয়ম। অথচ বাংলাদেশে বর্তমানে তিন মাস নয়, নয় মাস যদি খেলাপি থাকে তাহলে সেটা খেলাপি ঋণ হবে। এর মাধ্যমে সরকার কৃত্রিমভাবে খেলাপি ঋণের হার কম দেখাতে পারছে। এখন সংজ্ঞা পাল্টে, অবলোপনকৃত ঋণ বাদ দিয়ে, মামলার স্থগিতাদেশ নিয়ে, নামমাত্র শর্তে ঋণ পূনতফশিলের ব্যবস্থা করে কাগজে-কলমে খেলাপি ঋণের পরিমাণ কম দেখানোই যায়, কিন্তু অর্থনীতিতে ব্যাংক খাতের প্রকৃত চিত্র তাতে কোনোভাবেই পাল্টায় না। এই দেশে রাজনৈতিক খুঁটি শক্তিশালী থাকলে কীভাবে গোটা ব্যাংক গিলে খেয়ে ফেলা যায়, তার অসাধারণ উদাহরণ হতে পারে বেসিক ব্যাংকের আব্দুল হাই বাচ্চু আর ফারমার্স ব্যাংকের মহিউদ্দিন খান আলমগীর।

জনাব বাচ্চুর ব্যাপারে সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত প্রথম আলোকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে (১৯ জানুয়ারি,২০২০) স্পষ্টই বলেছেন, ‘আব্দুল হাই বাচ্চুর মতো একজন লোকই ব্যাসিক ব্যাংক ধ্বংস করে দিলেন। আর আমরাও এতে পক্ষ (পার্টি) হয়ে গেলাম।…’ তাকে যখন প্রশ্ন করা হয়, বাচ্চুর রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা কী ছিল, তখন তিনি বলেন, ‘বাচ্চু ছিলেন অন্য ধরনের রাজনীতিবিদ। বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে তার সংযোগ ছিল এবং এগুলো তিনি ব্যবহার করেছেন।’ আর সেই সাক্ষাৎকারেই ফারমার্স ব্যাংক সম্পর্কে জনাব মুহিত বলেন, ‘ফারমার্স ব্যাংকে শুরু থেকেই ডাকাতি হয়েছে। এটা কোনো ব্যাংক ছিল না’।

একজন মানুষ সত্যিকারভাবে ব্যবসা করতে গিয়ে ঋণ নিয়ে বিপদে পড়তে পারে; লোকসান দিয়ে খেলাপি হতে পারে। কিন্তু আমাদের দেশের প্রায় সব খেলাপি ঋণ হচ্ছে ‘ইচ্ছেকৃত ঋণখেলাপি’দের যারা ঋণ নেওয়ার সময় থেকেই জানেন এই টাকা তারা ফেরত দেবেন না। সে কারণেই খেলাপি ঋণ সরকারের লুটপাটের সাক্ষী। তাই সরকার নানাভাবে চেষ্টা করে খেলাপি ঋণকে যতটা সম্ভব কমিয়ে দেখাতে। খেলাপি ঋণ নিয়ে আমি জনগণকে বিভ্রান্ত করিনি, আন্তর্জাতিক সংস্থা, দেশীয় প্রতিষ্ঠিত অর্থনীতিবিদদের কথাকে পাশ কাটিয়ে নানা রকম কায়দা-কসরত করে সরকারই বরং খেলাপি ঋণ নিয়ে জনগণকে বিভ্রান্ত করছে।

লেখক: আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট। জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত আসনে বিএনপির দলীয় সংসদ সদস্য

সূত্র : বাংলাট্রিবিউন

  • 11
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
উপরে