ইসি-সিইসি বাহাস, বার্তা কী?

প্রকাশিত: মার্চ ১২, ২০২১; সময়: ৪:৫৮ pm |
খবর > মতামত

আমীন আল রশীদ : ‘স্থানীয় নির্বাচনে হানাহানি, মারামারি, কেন্দ্র দখল, ইভিএম ভাঙচুর ইত্যাদি মিলে এখন অনিয়মের একটা মডেল তৈরি হয়েছে।’ স্বয়ং একজন নির্বাচন কমিশনার যখন এই মন্তব্য করেন, সেটি খুব স্বাভাবিক ঘটনা নয়। আবার প্রধান নির্বাচন কমিশনার যখন এই বক্তব্যের ভেতরে ‘ব্যক্তিগত স্বার্থ’ ও ‘উদ্দেশ্য’ খোঁজেন—সেটিও কোনও ভালো বার্তা দেয় না। বরং একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ দুই কর্তার এ ধরনের বাহাস নির্বাচন কমিশনের প্রতি জনগণের অনাস্থা বাড়াতে ভূমিকা রাখে—বিগত কয়েকটি নির্বাচন ইস্যুতে যে প্রতিষ্ঠানটি ভাবমূর্তির সংকটে পড়েছে।

গত ২ মার্চ ‘জাতীয় ভোটার দিবসের’ অনুষ্ঠানে নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার বলেন, ‘বহুদলীয় গণতন্ত্রের জন্য নির্বাচনের যে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড ও ভারসাম্য রক্ষিত হওয়ার প্রয়োজন ছিল, তা হচ্ছে না। এককেন্দ্রীয় নির্বাচনে স্থানীয় নির্বাচনের তেমন গুরুত্ব নেই, নির্বাচনে মনোনয়ন লাভই এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। স্থানীয় নির্বাচনেও হানাহানি, মারামারি, কেন্দ্র দখল, ইভিএম ভাঙচুর ইত্যাদি মিলে এখন একটা অনিয়মের মডেল তৈরি হয়েছে।’

তবে একই মঞ্চে বসে তার এই বক্তব্যে ক্ষোভ প্রকাশ করে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নূরুল হুদা সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘মাহবুব তালুকদার কমিশনকে হেয়, অপদস্থ ও নিচে নামানোর জন্য যা করা দরকার সবই করে চলেছেন। তিনি ব্যক্তিগত স্বার্থে ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কমিশনকে হেয় করছেন।’

সংবিধান অনুযায়ী বর্তমান নির্বাচন কমিশনের সদস্য সংখ্যা পাঁচ। এরমধ্যে একজন প্রধান। কিন্তু বাকি চারজনের সঙ্গে কমিশনার মাহবুব তালুকদারের পার্থক্যটি শুরু থেকেই স্পষ্ট। বিশেষ করে নির্বাচনের অনিয়ম ইস্যুতে তার স্পষ্ট বক্তব্যের কারণে। যে কারণে বিভিন্ন সময়ে তাকে ‘দলছুট’ এমনকি নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের আগে সার্চ কমিটিতে বিএনপি তার নাম দিয়েছিল বলে তিনি বিএনপির ‘পারপাস সার্ভ করছেন’—এমন বক্তব্যও ক্ষমতাসীন দলের তরফে এসেছে।

স্মরণ করা যেতে পারে, এর আগেও তিনি বিভিন্ন বিষয়ে একাধিকবার ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দিয়েছেন। সিটি নির্বাচনে এমপিদের প্রচারণা, জাতীয় নির্বাচনে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন বা ইভিএম ব্যবহারে আপত্তি জানিয়েছিলেন। এমনকি কমিশন বৈঠক থেকে বেরিয়েও গেছেন। সম্প্রতি দ্বিতীয় ধাপের নির্বাচনের দিন ঢাকার সাভার পৌরসভার তিনটি কেন্দ্র পরিদর্শন শেষে নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের দেওয়া লিখিত বক্তব্যে তিনি বলেন, পৌরসভা নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হয়নি। সাভার পৌর এলাকায় বিরোধীদলীয় প্রার্থীর কোনও পোস্টার দেখতে পাননি উল্লেখ করে কমিশনার বলেন, এই নির্বাচনকে অংশগ্রহণমূলক বলা যায় না।’

ফলে এসব আলোচনায় যে প্রশ্নটি বারবার সামনে আসে তা হলো, ভালো নির্বাচন বলতে কী বুঝায়, ভালো নির্বাচনের অন্তরায়সমূহ কী কী এবং সেই অন্তরায় দূর করতে বর্তমান নির্বাচন কমিশন কোনও উদ্যোগ নিয়েছে নাকি নতুন নতুন অন্তরায় তৈরি করেছে এবং সর্বোপরি কমিশনের বাকি চার সদস্যের সঙ্গে কমিশনার মাহবুব তালুকদারের ‘বিরোধ’ বা মতানৈক্যের কারণ কী?

গ্লাসের অর্ধেক পূর্ণ তত্ত্বের আলোকে কমিশনার মাহবুব তালুকদারের এই নোট অব ডিসেন্ট বা নির্বাচনি ব্যবস্থা নিয়ে ক্ষোভ ও অসন্তোষকে ভিন্নমত হিসেবেও দেখা যেতে পারে—যে ভিন্নমতই হচ্ছে গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। কিন্তু এটি যে শুধু ভিন্নমত পোষণের মধ্য দিয়ে গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা এগিয়ে নেওয়ার বিষয় নয়, সেটি সিইসির বক্তব্যে স্পষ্ট। কারণ, তিনি অভিযোগ করেছেন, ‘মাহবুব তালুকদার ব্যক্তিগত স্বার্থে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কমিশনকে হেয় করছেন।’ সিইসি এও বলেন যে, ‘মাহবুব তালুকদার সাহেব অভ্যাসগতভাবে আমাদের এ নির্বাচন কমিশনে যোগ দেওয়ার পরদিন থেকে যা কিছু ইসির নেগেটিভ দিক তা পকেট থেকে একটা কাগজ বের করে পাঠ করতেন। আজকেও এর ব্যতিক্রম হয়নি।’ অর্থাৎ কমিশনের পাঁচ সদস্যের মধ্যে একজন যে আলাদা হয়ে গেছেন, সেটি পরিষ্কার। প্রশ্ন হলো, সিইসি যে ‘ব্যক্তিগত স্বার্থে’র কথা বলছেন, সেটি কী? মাহবুব তালুকদার নির্বাচনি ব্যবস্থা নিয়ে যেসব অনিয়মের কথা বলছেন, সেখানে তার ব্যক্তিগত স্বার্থের বিষয়গুলো কী?

সম্প্রতি দেশের ৪২ জন বিশিষ্ট নাগরিক নির্বাচন কমিশনের নানা রকমের আর্থিক অনিয়ম, যেমন প্রশিক্ষণ না দিয়ে প্রশিক্ষণ ভাতা তুলে নেওয়া, নির্বাচন কমিশনারদের প্রটোকলের বাইরে গিয়ে একাধিক গাড়ি ব্যবহার করা, বিভিন্ন সময় ক্ষমতার অপব্যবহার, নির্বাচনে কারচুপি ও অনিয়মের অভিযোগ তুলে এর তদন্তের জন্য সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল গঠনের দাবি জানিয়ে রাষ্ট্রপতিকে একটি চিঠি দিয়েছেন। সুতরাং, নির্বাচনে অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার অভিযোগ যে কেবল একজন কমিশনারই করছেন তা নয়, বরং এ নিয়ে দেশের বিশিষ্ট নাগরিকদের একটি অংশ এবং জনগণেরও একটি বিরাট অংশের প্রশ্ন আছে।

সিইসি বা কমিশনের অন্য সদস্যদের আপত্তি কি তাহলে এই যে, কমিশনার মাহবুব তালুকদারের বক্তব্য বিশিষ্ট নাগরিক, রাজনৈতিক দল এবং জনগণের একটি অংশের সাথে মিলে যাচ্ছে? বিশেষ করে বর্তমান ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের প্রধান প্রতিপক্ষ বিএনপি নির্বাচন নিয়ে বরাবরই যেসব অভিযোগ করছে, কমিশনার মাহবুব তালুকদারের বক্তব্য তার সাথে মিলে যাচ্ছে এবং এ কারণে কমিশনের অন্য সদস্যরা কি মনে করছেন যে তিনি বিএনপির স্বার্থ রক্ষা করছেন?

কমিশনার মাহবুব তালুকদার প্রতিটি নির্বাচনের পরেই ‘যাত্রাপালা’র বিবেকের মতো কঠিন সব সত্য উচ্চারণ করেন দেখে অনেকের মনে এমন প্রশ্নও আছে যে, তিনি কেন নির্বাচন কমিশনার হিসেবে বসে আছেন। কেন তিনি পদত্যাগ করছেন না? আবার অনেকে মনে করেন, সিস্টেমের ভেতরে থেকেই সিস্টেম বদলানোর জন্য তিনি চেষ্টা করছেন। প্রশ্ন হলো, তার এই ভূমিকায় সিস্টেম কি আদৌ বদলাচ্ছে নাকি ইসি ও নির্বাচনি ব্যবস্থা সম্পর্কে মানুষের ধারণা আরও খারাপ হচ্ছে?

সংবিধানের ১১৮(৪) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, নির্বাচন কমিশন দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে স্বাধীন এবং কেবল সংবিধান ও আইনের অধীন। কিন্তু তাদের আর্থিক স্বাধীনতা নিশ্চিত হলেও এখন পর্যন্ত নির্বাচন কমিশন সম্পর্কে সাধারণ মানুষের ধারণা এরকম যে, নির্বাচন কমিশন সরকারের অধীন এবং সরকার ও সরকারি দল যা চায় তার বাইরে গিয়ে কিছু করা কমিশনের পক্ষে অসম্ভব। এর একটি বড় কারণ নির্বাচন কমিশনের মতো সাংবিধানিক পদে যাদের নিয়োগ দেওয়া হয়, অনেক সময়ই সেখানে রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রাধান্য পায়। তাদের যোগ্যতা কী হবে এবং কোন প্রক্রিয়ায় নিয়োগ করা হবে, সে সম্পর্কে এখনও কোনও আইন প্রণয়ন করা সম্ভব হয়নি।

মাহবুব তালুকদারের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত স্বার্থের যে অভিযোগ করছেন স্বয়ং সিইসি, সেটি খুব ভয়ংকর এ কারণে যে, সাংবিধানিক পদে থেকে কেউ যেমন ক্ষমতাসীন দলের স্বার্থ রক্ষা করতে পারেন না, তেমনি বিরোধী দলেরও না। তারা দেশের স্বার্থ রক্ষা করার শপথ নিয়ে চেয়ারে বসেন। ফলে প্রশ্ন হলো, বর্তমান নির্বাচন কমিশন কতখানি দেশের স্বার্থ রক্ষা করতে পারছে আর কতখানি দলের?

আবার দল, সরকার ও রাষ্ট্রের মধ্যে যে কিছু সুস্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে, তা অনেক সময়ই রাজনীতিবিদরা ভুলে যান। তারা এই তিনটি বিষয়কে এক করে ফেলেন এবং যে কারণে নাগরিকদের কোনও অংশ যদি সরকারের কোনও আইন, নীতি ও কাজেরও সমালোচনা করে, সেটিকেও অনেক সময় রাষ্ট্রদ্রোহিতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। অথচ সরকারের নীতি ও কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করার অধিকার প্রতিটি নাগরিকেরই রয়েছে এবং এসব সমালোচনার ভেতর দিয়েই সরকার তার ভুলগুলো জানতে পারে। কিন্তু ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়া তো দূরে থাক, আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতায় গেলে এটা স্বীকারই করতে চায় না যে, তারা কোনও ভুল করেছে বা ভুল করে। যে কারণে খোদ সাংবিধানিক পদে থেকেও কোনও একজন দায়িত্ববান ব্যক্তি যখন প্রচলিত ব্যবস্থা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন বা ভিন্নমত পোষণ করেন, সেখানেও তার দলীয় ও ব্যক্তিগত স্বার্থের গন্ধ খোঁজা হয়। এসবের মধ্য দিয়ে মূলত পুরো জাতিই দ্বিধাবিভক্ত হয় এবং বিভক্তির এই যন্ত্রণা এড়াতে মানুষ পারতপক্ষে আর কোনও কিছু নিয়ে কথা বলতে আগ্রহী হয় না।

খেয়াল করলে দেখা যাবে, রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় এবং অ্যাক্টিভিস্টের বাইরে দল-মতের ঊর্ধ্বে উঠে সাধারণ মানুষ আর রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ বা স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে কথা বলতে চায় না। কারণ সমালোচনা করলেই সেটিকে সরকার-বিরোধিতা এবং সরকার-বিরোধিতা মানেই রাষ্ট্রদ্রোহিতা হিসেবে চিহ্নিত করে তাকে কোনও একটি দল বা গোষ্ঠীবদ্ধ করে দেওয়ার সম্মিলিত প্রয়াস চলে। ফলে কথা না বলা মানুষের সংখ্যা ধীরে ধীরে কমছে। তারপর মাথার ওপরে যখন ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের খড়্গ ঝুলিয়ে রাখা হয়, তখন মানুষ আরও বেশি ভীত, আরও বেশি আত্মকেন্দ্রিক হয়ে যেতে বাধ্য হয়। কেউই আর নিজের ভালো থাকার বাইরে গিয়ে সমাজ ও দেশ নিয়ে ভাবতে আগ্রহবোধ করেন না।

লেখক: সাংবাদিক।

সূত্র : বাংলাট্রিবিউন

  • 9
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
উপরে