নিরপেক্ষতার সংকটে নির্বাচন কমিশন

প্রকাশিত: মার্চ ৪, ২০২১; সময়: ২:২১ pm |
খবর > মতামত

শাখাওয়াত লিটন : মহামারির মত সময়েও দুই মাসের বেশি সময় ধরে পৌরসভা নির্বাচন পরিচালনা আসছে নির্বাচন কমিশন। নিশ্চিতভাবেই, বিষয়টি নির্বাচন কমিশনের আইনি বাধ্যবাধকতা অনুযায়ী সময়মতো দায়িত্ব পালনে নিয়মানুবর্তিতারই নিদর্শন।

সময়মাফিক নির্বাচন পরিচালনার মাধ্যমে আইনি বাধ্যবাধকতা থেকে সরে না আসায় প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নুরুল হুদা এবং তার চার সহকর্মী প্রশ্নাতীতভাবে প্রশংসার দাবিদার।

কিন্তু, ব্যালট যুদ্ধে ব্যাপক নির্বাচনী অসঙ্গতি থাকা সত্ত্বেও নির্বিকার আচরণের মাধ্যমে সুষ্ঠু এবং নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করার সাংবিধানিক দায়িত্ব থেকে তারা বিচ্যুত হয়েছেন।

লক্ষ্য রাখুন, নির্বাচন এমন একটি প্রক্রিয়া যেখানে সাধারণ মানুষ প্রাতিষ্ঠানিক পদে দায়িত্ব পালনের জন্য কোনো ব্যক্তি বা সংগঠিত ব্যক্তিবর্গকে ভোটের মাধ্যমে বাছাই করে থাকেন।

নির্বাচন কমিশনের আনুষ্ঠানিক সাংবিধানিক দায়িত্ব হল ‘ক্ষুদ্র মানুষ’-দের অনুকূলে বাধাহীন এবং নিরপেক্ষ নির্বাচনী পরিবেশ নিশ্চিত করা। ‘ক্ষুদ্র’ এই মানুষেরা যেন স্বাধীনভাবে ভোটকেন্দ্রে প্রবেশ করে কোনো ভীতি ছাড়াই তাদের ভোটাধিকার চর্চা করতে পারেন তার নিশ্চয়তা প্রদানও কমিশনের দায়িত্ব।

সংবিধান বিশেষজ্ঞ এবং সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল মাহমুদুল ইসলাম তার ‘বাংলাদেশের সাংবিধানিক আইন’ বইটিতে নির্বাচন কমিশনের কার্যক্রমের গুরুত্বের কথা উল্লেখ করেন।

“সংবিধান স্বাধীন এবং নিরপেক্ষ নির্বাচন ব্যতীত অন্যকিছু কল্পনা করতে পারে না। স্বাধীন ও নিরপেক্ষ ভোট নিশ্চিতে নির্বাচন কমিশনের হাতকে আবদ্ধ করে ফেলে এমন কোনও আইন প্রণয়ন সাংবিধানিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়।”

সুপ্রীমকোর্টও কয়েকটি রায়ে নির্বাচন পরিচালনায় নির্বাচন কমিশনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার দিকে আলোকপাত করেন।

নূর হোসেন বনাম মো. নজরুল ইসলাম মামলা পর্যবেক্ষণপূর্বক সুপ্রীম কোর্টের আপিল বিভাগ বলেন, ‘আমরা এ কথা পুনর্ব্যক্ত না করে পারি না যে, নির্বাচন চলাকালে গোলযোগের, ব্যালট পেপার কারচুপির বা নির্বাচন সঠিক, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে সম্পন্ন হয়নি বলে রিপোর্ট বা অভিযোগ উত্থাপিত হলে, উক্ত রিপোর্ট বা অভিযোগের সত্যতা যাচাইপূর্বক কমিশনের ফলাফল বাতিল ও পুনর্নির্বাচনের নির্দেশ দেওয়ার সিদ্ধান্ত সঠিক।’

সাংবিধানিক ধারার আলোকে সিইসি নুরুল হুদা এবং তার সহকর্মীরা যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষেত্রে নিষ্ক্রিয় ছিলেন। উচ্চতর যে প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বে তারা আসীন, সংবিধানের আলোকে তার মর্যাদা তারা রক্ষা করতে পারেননি।

এর পরিবর্তে, ব্যাপক নির্বাচনী অসঙ্গতির কারণে ভোটের নিরপেক্ষতা অস্বচ্ছ হয়ে উঠলেও তারা নির্বাচনী পরিস্থিতি নিয়ে সন্তুষ্ট।

তবে সত্যি বলতে, এখানে নতুন কিছু নেই।

সাম্প্রতিক ইতিহাস অনুযায়ী, পূর্ববর্তী প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী রকিবউদ্দীন আহমদের মেয়াদকাল থেকেই নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়। সাবেক সরকারি কর্মকর্তা রকিবউদ্দীন আহমেদ এবং তার সহকর্মীরা ২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচনের তত্ত্বাবধানে নিয়োজিত ছিলেন।

প্রধান বিরোধী দল বিএনপিসহ বেশ কিছু রাজনৈতিক দলের বয়কটের মধ্য দিয়েই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দীহীন আসনের নজিরবিহীন রেকর্ড সৃষ্টি হয়। ৩০০ সাংসদের মধ্যে ১৫৩ জনই বিনা প্রতিদ্বন্দিতায় কোনো ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হওয়া ছাড়াই নির্বাচিত হন।

স্থানীয় সরকার পর্যায়ের পরবর্তী নির্বাচনগুলোতেও বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচন প্রক্রিয়া রেকর্ডসংখ্যক হারে বৃদ্ধি পায়।

জেলা পরিষদ নির্বাচনের কথাই ধরা যাক। ২০১৬ সালে অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে ৬১ জন চেয়ারম্যানের মধ্যে ২২ জনই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। একই বছর অনুষ্ঠিত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনেও বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ২২০ জন প্রার্থী চেয়ারম্যান পদে মনোনীত হন।

বর্তমান ইসির তত্ত্বাবধানে ২০১৮ সালে অনুষ্ঠিত সর্বশেষ জাতীয় নির্বাচনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপিসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ করায় কোনও আসনেই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। তবে, ব্যালট বাক্স ভরা থেকে শুরু করে নানা অনিয়মের অভিযোগ ওঠে।

নির্বাচনে কমিশনের পক্ষ থেকে তেমন কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ায় গত জানুয়ারিতে চট্টগ্রামে অনুষ্ঠিত নির্বাচনসহ এর আগের কয়েকটি সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনেও অনিয়মের ঘটনা ঘটে। এখানে, লক্ষণীয় যে, বিএনপি সবগুলো সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনেই অংশ নিয়েছিল।

বিশদভাবে বললে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নির্বাচনী গণতন্ত্রে কেবল মাত্র দুটি পন্থা তৈরি হয়েছে: হয়, বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচনের সংখ্যা বৃদ্ধি, নয়তো জয় নিশ্চিত করতে নির্দিষ্ট দলের ভোট নিয়ন্ত্রণ।

বিরোধী দলগুলোর রাজনৈতিক অবস্থানের ভিত্তিতেই এই পন্থা বাছাই করা হত।

প্রধান প্রতিপক্ষ অংশগ্রহণ না করলে, জাতীয় থেকে স্থানীয় পর্যায়ে বিভিন্ন নির্বাচনী এলাকায় বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জনপ্রতিনিধিরা নির্বাচিত হন। তবে, নির্বাচনী লড়াইয়ের ময়দানে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীর উপস্থিতি থাকলে পরিস্থিতি বদলে যেত।

নির্বাচনে দুটি অনাকাঙ্খিত পদ্ধতি পরিচিতির মাধ্যমে নির্বাচন প্রক্রিয়া সহজ করায় কে এম নুরুল হুদা পরিচালিত নির্বাচন কমিশন আবারও প্রশংসার দাবি রাখে। তবে, কমিশনের ভাবমূর্তি এখন আকর্ষণহীন। এমনকি, দায়িত্ব পালনেও তারা পরিপূর্ণ নয়।

তবে, নির্বাচন কমিশনের ভাবমূর্তি এখন যাই হোক না কেন, মঙ্গলবার রাজধানীর নির্বাচন ভবনে প্রতিষ্ঠানটি সময় মতোই জাতীয় ভোটার দিবস উপলক্ষে অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। সেখানে, প্রধান কমিশনার হুদা মানুষকে নির্বাচনী রোলে নিবন্ধন ও ভোট প্রদানের আহ্বান জানান।

লেখক: উপ-নির্বাহী সম্পাদক, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড

সূত্র : দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড

  • 12
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
উপরে