‘স্পিকার মহোদয়, আমি বাংলায় বলতে চাই’

প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ২১, ২০২১; সময়: ৭:২২ pm |
খবর > মতামত

এম এ মোমেন : বাংলাদেশের স্বাধীনতার অর্ধশতবর্ষ উদযাপনের বছর প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের চারদিন আগে ‘আমার ভাষা’ সফটওয়্যারের উদ্বোধন করেছেন, এটি অবশ্যই স্বাগত সংবাদ।

উদ্বোধন অনুষ্ঠানে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী বলেছেন, ‘আমার ভাষা’ সফটওয়্যারের মাধ্যমে ইংরেজিতে প্রদত্ত আদালতের রায়গুলো সহজেই বাংলায় অনুবাদ করা যাবে। ফলে বিচারপ্রার্থী ও জনগণ আদালতের রায়গুলো আরও সহজে বুঝতে পারবেন। ইংরেজি ভাষায় লেখা রায় বাংলা ভাষায় ভাষান্তরিত করার প্রযুক্তি সহযোগিতা বিচারপ্রার্থীর একসেস টু জাস্টিস পেতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। প্রথম পর্যায়ে উচ্চ আদালতের রায়সমূহ বাংলায় অনুবাদ করার ক্ষেত্রে ‘আমার ভাষা’ সফটওয়্যার ব্যবহার করা হবে। এরপর পর্যায়ক্রমে নিম্ন আদালতের রায়ও বাংলায় অনুবাদ করার ক্ষেত্রে এই সফটওয়্যার ব্যবহার করা হবে।

সংবাদের এ অংশ পর্যন্ত পাঠ করে এটাই মনে হয়েছে, যে প্রজন্ম বাংলা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে, সম্ভবত ভুল করছে না। তাদের হাতে বাংলা অনুবাদের সফটওয়ার থাকলেই হলো।

মন্ত্রী অবশ্য আশার কথাও বলেছেন, আগামীতে আদালতে আর এ ধরনের অনুবাদ সফটওয়্যার প্রয়োজন হবে না। কারণ রাষ্ট্রের সকল ক্ষেত্রে বাংলা ভাষার প্রচলন করে একুশের চেতনাকে রাষ্ট্রের সকল ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে।

প্রায় সাত দশক আগে সঞ্চারিত সেই একুশে চেতনার একটি স্বাগত নজির নিশ্চয়ই অনুবাদের হাতিয়ার ‘আমার ভাষা’ সফটওয়্যার।

২০৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি একুশে চেতনার শতবর্ষ উদযাপনের দিন জাতি কোন সফটওয়ার উপহার পাবে, তা দেখার সুযোগ আমি পাব না, আমাদের পরের প্রজন্ম নিশ্চয়ই তা দেখবে।

সফটওয়ার মানে কী? বাংলা একাডেমির অভিধান বলছে ‘কম্পিউটারের কাজ করার জন্য ব্যবহৃত সাংকেতিক তথ্যপুঞ্জ, নির্দেশাবলী ইত্যাদি’। নয় শব্দের বদলে এক শব্দের কিছু আছে নাকি? আর একসেস টু জাস্টিস? ‘আমার ভাষা’ সফটওয়্যার নিশ্চয়ই এই কথাটিরও ভালো একটা অনুবাদ উপহার দিয়েছে।

২.
৭৪ বছর আগের কথা বলি। বঙ্গীয় আইনসভার সদস্য অমূল্যচন্দ্র অধিকারী ১০ মার্চ ১৯৪৭ ইংরেজি না বাংলায় বলবেন এই বিতর্কের একপর্যায়ে খোলামেলাই বললেন, ‘স্পিকার মহোদয়, আমি বাংলায় বলতে চাই।’
অপর সদস্য শামসুদ্দিন আহমেদ বাংলায় বলার একটি বাস্তব সমস্যা ইংরেজিতে তুলে ধরলেন। তিনি বললেন, বিতর্ক যারা লিপিদ্ধ করেন তাদের ইংরেজি শর্টহ্যান্ড জানা; কাজেই বাংলায় বললে তাদের অসুবিধা হবে এবং সব কথা তারা টুকে রাখতে পারবেন না।

স্পিকারও আইনের কথা বললেন। বঙ্গীয় আইনসভা পরিচালিত হয় ১৯৩৫-এর ভারত শাসন আইনে। সে আইনে স্পষ্টভাবেই বলা হয়েছে যাবতীয় সংসদীয় কার্যক্রম পবিচালিত হবে ইংরেজিতে। কাজেই ইংরেজি থেকে সরে যাওয়া আইনের স্পষ্ট লংঘন। যারা আইন প্রণয়ন করেন তারা কেমন করে আইন লংঘন করেন?

অমূল্যচন্দ্র অধিকারী বললেন, আমার ইংরেজি বলতে যথেষ্ট অসুবিধা হয়।

স্পিকার বললেন, উইল ইউ কাইন্ডলি স্পিক ইন ইংলিশ?

এবার এক সদস্য বললেন যে, ইংরেজিতে বলতে তার অনেক সমস্যা হচ্ছে। ‘ইংরেজিতে আমি আমার মনোভাব প্রকাশ করতে পারি না। কাজেই আমাকে বাংলায় বলার অনুমতি দেওয়া যায়।’ তিনি আবারও প্রত্যাখ্যাত হলে অপর সদস্য নীহারেন্দু দত্ত মজুমদার বাংলায় বললেন: ‘স্পিকার মহোদয়, আমার সামান্য একটা নিবেদন আছে। ১৯৪৮ সালের জুন মাসে ইংরেজরা ভারতবর্ষ থেকে চলে যাচ্ছে। আমার নিবেদনটা যদি শোনেন তাহলে বিশেষ কৃতজ্ঞ হই।’

স্পিকার তার নিবেদন শোনেননি। তিনি পুনরায় ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইনের দোহাই দিলেন।

১৭৭৬ সালে আমেরিকা যখন স্বাধীন হয়, সেখানকার অভিবাসী জার্মানদের মধ্য থেকে দাবি উঠে আসছিল, জার্মান হোক আমেরিকার সরকারি ভাষা। হাউজ অব রিপ্রেজেনটেটিভ-এ বিল পাশও হয়ে যেত, যদি না জার্মান বংশোদ্ভুত স্পিকার বাধা হয়ে দাঁড়াতেন।

যুক্তরাষ্ট্রের হাউজ অব রিপ্রেজেনটেটিভ-এর প্রথম স্পিকার হিসেবে ফ্রেডেরিক মুলেনবার্গকে বেছে নেওয়া হয়। তার বাবা হেনরি মুলেনবার্গের জন্ম জার্মানিতে। ফ্রেডেরিকও জার্মানিতে পড়াশোনা করেছেন। তিনি দু’দফা স্পিকার ছিলেন। তার বিরোধী ভূমিকার কারণেই জার্মানকে সরকারি ভাষা করার বিলটি শেষ পর্যন্ত উত্থাপিত হতে পারেনি। ১৭৯৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সকল ফেডারেল আইন জার্মান ভাষায় প্রকাশের একটি প্রস্তাব মাত্র এক ভোটের ব্যবধানে নাকচ হয়ে যায়।

জার্মান অভিবাসীদের ভাষাশিক্ষার ওপর অসন্তুষ্ট হয়ে ১৭৫৩ সালে বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন বলেছেন, জার্মান অভিবাসীরা ইংরেজি শিখছে না; জার্মানদের মধ্যে যারা হীনবুদ্ধির কেবল তারাই দেশ ছেড়ে আমেরিকায় আসছে। থিওডোর রুজভেল্ট আমেরিকার জন্য কেবলমাত্র ইংরেজি ভাষার কথা বলেন, ‘আমাদের একটি পতাকা ও একটি ভাষা।’

আমাদের বেলায় বাঙালি রাজনৈতিক এলিটরাই উর্দুকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন এবং এমনকি ১৯৪৭-উত্তর কেন্দ্রীয় সরকারের বাঙালি শিক্ষামন্ত্রী (সেই মন্ত্রী পরিষদে দুজন বাঙালি সদস্য ছিলেন, একজন ঢাকার, একজন বরিশালের) আরবি হরফে বাংলা লেখার উদ্যেগ নিতে চেয়েছেন।

একটি পাকিস্তানি প্রচারপত্রের অংশ: ‘পাকিস্তান সৃষ্টিতে স্মরণীয় অবদানের জন্য আমরা কায়েদ-ই-আজমের কাছে কৃতজ্ঞ। তবে এটা মানতে হবে, মানুষ হিসেবে তিনিও পুরোপুরি খাঁটি ছিলেন না। উর্দুকে পাকিস্তানের জাতীয় ভাষা ঘোষণা করে তিনি দীর্ঘমেয়াদে সবচেয়ে বড় ভুলটি করেছেন। পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দুকে মেনে নেওয়ার সমালোচনা করলে তা অনেক পাকিস্তানির মর্মবেদনার কারণ হবে। কিন্তু মিথ্যা এ মায়ার জাল বুনে এটাকে উপেক্ষা করলে সমস্যার জটিলতাই বাড়বে, পরিস্থিতির অবনতি ঘটবে। চলুন আমরা খোলামেলা আলাপ করে উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে চালু থাকার ব্যাপারটি বন্ধ করে দিই। একই সঙ্গে উর্দু ভাষাকে আমাদের সম্মানও করতে হবে এবং যারা লিখতে বা বলতে চায়, তাদের সেই সুযোগ ও স্বাধীনতা দিতে হবে। স্থানীয় ভাষাকে সেই প্রদেশ বা জেলায় দাপ্তরিক ভাষায় উন্নীত করাটাই শ্রেষ্ঠ সমাধান। ধীরে ধীরে নেটিভ ভাষাই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় ভাষা। তা হলেই আমাদের ভাষা ও সংস্কৃতির সংরক্ষণসহ বিভিন্ন ভাষাভাষীর মধ্যে সৌহার্দ্য রক্ষা করে ঐক্যবদ্ধ থাকা, বিভিন্ন জাতিসত্তার মর্যাদা ও স্বাতন্ত্র্য রক্ষা সম্ভব হবে। সুইজারল্যান্ডের মতো একটি বহু ভাষাভাষী দেশে যদি সফল বহুজাতিক সংস্কৃতি গড়ে উঠতে পারে, তাহলে পাকিস্তানেও পারে। বেশি দেরি হওয়ার আগে জাতির মঙ্গলের জন্য চলুন এই সিদ্ধান্তটি বদলে দিই।

‘পূর্ব পাকিস্তান বিচ্ছিন্ন হয়ে স্বাধীন বাংলাদেশ হয়ে গেছে। পাকিস্তানের সচেতন নাগরিক সমাজের প্রশ্ন- আমরা কি চাই পাকিস্তানের আরও এক বা একাধিক অংশ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাক? পাকিস্তানের বুদ্ধিজীবীদের অনেকেই মনে করেন, উর্দু ভাষার চাদরে ঢেকে পাকিস্তানের সংহতি রক্ষার চেষ্টা সফল হবে না। কারণ উর্দু চাপিয়ে দিয়েই বিভেদের বীজ বপন করা হয়েছে। ১৯৪৮ সাল থেকেই প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে, পাঞ্জাবিকে কেন রাষ্ট্রভাষা ঘোষণা করা হবে না? সিন্ধি কেন রাষ্ট্রভাষা হবে না? প্রধান যুক্তি, উর্দু পাকিস্তানের সাংস্কৃতিক মূলধারার সঙ্গে মিশে নেই, মূলত পাকিস্তানের প্রেক্ষাপটে উর্দু বহিরাগত মোহাজেরদের ভাষা।’

বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের এক বছর আগে ১৯৫১ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি ইসমাইলিয়া সম্প্রদায়ের প্রধান স্যার সুলতান মোহাম্মদ শাহ আগা খান করাচিতে প্রদত্ত ভাষণে প্রশ্ন রাখেন: Is it (Urdu) the language of Bengal where the majority of Muslins live? Is it what you hear in the streets of Dhaka of Chittagong? [উর্দু কি বাংলার ভাষা যেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ মুসলমান? ঢাকা কিংবা চট্টগ্রামের রাস্তায় আপনি কি উর্দু শুনতে পান?]

৩.
বিভিন্ন আঞ্চলিক ভাষা মিলিয়ে বর্তমান পৃথিবীতে কথ্যভাষার সংখ্যা ৪১ হাজার ৮০৬; এথনোলোগ: ল্যাঙ্গুয়েজ অব দ্য ওয়ার্ল্ডের হিসাবে (২০০৫ সালে প্রকাশিত) জীবিত ভাষার সংখ্যা: ৬ হাজার ৯১২। প্রায় বিলুপ্তির পথে এমন ভাষার সংখ্যা ৫১৬।

পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক মানুষের প্রধান ভাষা ম্যান্ডারিন চায়নিজ। এটি চীন, তাইওয়ান ও সিঙ্গাপুরের দাপ্তরিক ভাষা। ম্যান্ডরিন চায়নিজ ৮৭৩ মিলিয়ন মানুষের প্রথম ভাষা এবং ১৭৮ মিলিয়নের দ্বিতীয় ভাষা। মোট ভাষা ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১.০৫১ বিলিয়ন।

দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে হিন্দি। এটি ৩৭০ মিলিয়ন মানুষের প্রথম ভাষা এবং ১২০ মিলিয়নের দ্বিতীয় ভাষা। ভারত ও ফিজির দাপ্তরিক ভাষা হিন্দি।
তৃতীয় ভাষা হিসাবে সবচেয়ে ব্যবহৃত ভাষা ইংলিশ। এ ভাষাভাষির সংখ্যা ২৫০ থেকে ৩৫০ মিলিয়নের মধ্যে।

বাংলা ভাষা, আমাদের সৌভাগ্য ষষ্ঠ স্থানে। কিন্তু প্রযুক্তির ভাষা হিসেবে যদি বিবেচনা করা হয়, তা হলে প্রথম ৫০টিতেও বাংলা নেই।

‘আমার ভাষা’ সফটওয়্যার নিশ্চয়ই আমাদের অবস্থান ভালো করতে সহায়তা করবে।

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ২০২১ এর ইউনেস্কো নির্ধারিত থিম ‘Fostering multilingualism for inclusion in education and society’ শিক্ষায় এবং সমাজে অন্তর্ভুক্তির জন্য বহুভাষা চর্চা।

ফেব্রুয়ারিতে বাংলার জন্য মায়াকান্না বন্ধ রেখে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বাংলাকে প্রযুক্তির ভাষা, অর্থনীতির ভাষায় পরিণত করতে হবে। যতক্ষণ না বাংলা ভাষাকে অর্থকরী ভাষা বলতে পারব- ভাষার সঙ্কোচন ঠেকিয়ে রাখা কষ্টকর হবে।

লেখক: কথাসাহিত্যিক

সূত্র : দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড

  • 14
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
উপরে