জাহানারা জামান : অনুপ্রেরণার উৎস যে জীবন

প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ৬, ২০২১; সময়: ১:৩৭ pm |
খবর > মতামত

সাদিকুর রহমান : জাহানারা জামান (২৬ ডিসেম্বর ১৯৩৬ – ৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৭) জাতীয় চার নেতার অন্যতম শহীদ এএইচএম কামারুজ্জামানের (২৬ জুন ১৯২৩ – ৩ নভেম্বর ১৯৭৫) সহধর্মিণী । তাঁর ডাক নাম লাইলী । ১৯৫১ সালে তাদের দাম্পত্য জীবনের শুরু। জাহানারা জামান বগুড়ার দুপচাপিয়া থানার চামরুল গ্রামের তালুকদার পরিবারে মেয়ে। আর বৈবাহিক সূত্রে তিনি রাজশাহী শহরের রাজনৈতিক পরিবারে জন্ম নেয়া জাতীয় নেতা এএইচএম কামারুজ্জামানের স্ত্রী। আজ তাঁর মৃত্যুবার্ষিকী।

জাহানারা জামান ঐতিহাসিক কারণে একজন গুরুত্বপূর্ণ মানুষ। তাকে নিয়ে আলোচনা করা সমাজের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। তাই একটি মৌলিক প্রশ্ন হলো- “মানুষ কি” ? শাস্ত্রীয় জ্ঞান দিয়ে আমরা ‘সত্য ’ ‘ন্যায়’ ‘আদর্শ’ ‘অসত্য’ ‘অন্যায়’ ‘অনাদর্শ’ ইত্যাদি বিষয়গুলো নিয়ে তর্কে লিপ্ত হই। অথচ মানুষের চলমান জীবন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে কিংবা কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়েই এসব প্রত্যয়গুলোর চর্চা মানুষের জীবন বাস্তবতায় ঘটে থাকে প্রতিনিয়ত। আমরা যখন কোন বিষয় নিয়ে আলোচনা করি তখন একেকজন একেকভাবে বিষয়টিকে উত্থাপন করি। অথচ ন্যায্যতা ও যৌক্তিকতার বিচারে যেকোন বিষয়কে সামগ্রিকতায় পর্যালোচনা জরুরি। খণ্ডিতভাবে বিবেচনা বা মূল্যায়ন ঝুঁকিপূর্ণ। অন্তত সত্যের কাছাকাছি পৌঁছতে চাইলে সামগ্রিকতায় বিচার বিশ্লেষণ আবশ্যক।

আমরা যখন কোন ‘মানুষ’কে নিয়ে আলোচনা করি তখন তাঁর সামগ্রিকতাকে বেশিরভাগ সময় বিবেচনায় নিতে চাই না। আর সেই মানুষ যদি সমাজের কোন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হোন, তাহলেও তাঁকে নিয়ে খণ্ডিত মুল্যায়ন যথাযথ হতে পারে না। কারণ “মানুষ”কে দেখা দরকার সক্রিয় সম্পর্কের একটি প্রক্রিয়া হিসেবে যেখানে ব্যক্তিত্ব হয়তো জরুরি। কিন্তু কখনোই একমাত্র উপাদান হিসেবে গ্রাহ্য হতে পারে না। প্রত্যেক ব্যক্তির মধ্যে প্রকাশিত ‘মানুষ’ এর অনেক উপাদান। যার মধ্যে ‘ব্যক্তি নিজে’ , ‘অন্য ব্যক্তিরা’ এবং ‘পারিপার্শ্বিক জগত ও প্রকৃতি’। সুতরাং ‘মনুষ্য প্রকৃতি’ যে সামাজিক সম্পর্কের জটিল বিন্যাস এতে কোন সন্দেহ নেই। সেই বিচারে কোন মানুষ বা গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি যখন মৃত্যুবরণ করেন সামগ্রিক বিবেচনায় মুল্যায়ন আরো বেশি আবশ্যক হয়ে পড়ে। জাহানারা জামান সম্পর্কে আলোচনায় এই সামগ্রিকতার বিষয়টি অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।

স্বীকার করে নিতেই হচ্ছে যে, ২০১৭ সালে জাহানারা জামানের প্রয়ানের পরপর তাৎক্ষনিকভাবে তাঁর সম্পর্কে অনেকেই লিখেছেন। এই তাৎক্ষণিক লেখালেখি বা মূল্যায়ন বা স্মৃতিচারণ ইত্যাদি বিষয়গুলোও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অন্তত তাঁকে যখন আমরা সামগ্রিকতায় মূল্যায়ন করার প্রয়াস পাবো তখন এই তাৎক্ষনিক লেখালেখি বা মূল্যায়ন বা স্মৃতিচারণগুলোও সামগ্রিক পর্যালোচনার উপাদান হিসেবে সহায়ক হবে নিশ্চিত। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ যে প্রশ্নগুলো আমাদেরকে কিংবা ভবিষ্যৎ গবেষকদের কাছে বিবেচিত হবে তাহলো শহিদ জাতীয় নেতা এএইচএম কামারুজ্জামানের স্ত্রী প্রয়াত জাহানারা জামান তাঁর নিজ জবানীতে ‘তাঁর’ ঘটনাবহুল জীবন সম্পর্কে কোন কিছু লিপিবদ্ধ বা অন্যকোনোভাবে সংরক্ষিত করে রেখে গেছেন কিনা? যদি রেখে থাকেন তাহলে তা কেমন? অন্তত ধরন হিসেবে, যেমন নিজ হাতে লিখেছেন, কিংবা নিজে বলেছেন আর অন্য কেউ শ্রুতি লিখন করেছে অথবা তিনি বলেছেন আর তাঁর সেই কথাগুলো কোন মাধ্যমে কোন সম্পাদনা ছাড়াই রেকর্ড করা হয়েছে ইত্যাদি। এই মুহূর্তে আমাদের জানামতে কেউ এ সম্পর্কে কিছুই বলছেন না।

সেই সাথে যারা তাঁর সম্পর্কে জানেন, তাঁর সান্নিধ্য পেয়েছেন, বিভিন্ন কার্যক্রমে তাঁর সাথে অংশগ্রহন করেছেন, তাঁর কাছ থেকে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ঘটনার বর্ণনা শুনেছেন (পেশাদারিত্বের কারণে অথবা একান্ত ব্যক্তিগতভাবে), বিভিন্ন পরিস্থিতিতে তাঁর পাশে থেকেছেন, তাঁর আত্মীয় স্বজন, সন্তান-সন্ততি ও বন্ধু-বান্ধব তাদের পক্ষ থেকে তাঁর সম্পর্কে অন্তত কিছু লিপিবদ্ধ করে রেখে যাওয়া কিংবা প্রকাশ করার বিষয়টিও অত্যন্ত জরুরী। কেননা এসবের মাধ্যমেও আমরা ভবিষ্যতে তাঁর জীবন সংগ্রাম ও আদর্শবাদের পর্যালোচনার উপাদান পেতে পারি। আমাদের বিশেষ অনুরোধ থাকবে তাঁরা যেন এই কাজটি যথাযথভাবে এবং দ্রুততার সাথে করেন। অন্তত ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কথা বিবেচনায় রেখে। কারণ আমাদের দেশে ইতিহাসের অনেক ঘটনা ধামাচাপা পড়ে যায় অথবা বলতে গেলে আমাদের ইতিহাসের অনেক কিছু গুম হয়ে যায়। সেই সাথে আমরা ইতিহাস বিকৃতি হতেও দেখি। সেই কারণে সবার উচিত হবে যার কাছে জাহানারা জামান সম্পর্কে যা আছে তা প্রকাশ করা ।

অনেকেই বলতে পারেন জাহানারা জামানের জীবন সংগ্রাম ও আদর্শবাদের মুল্যায়নের কিংবা পর্যালোচনার কী এমন গুরুত্ব? প্রশ্নটা করা অত্যন্ত স্বাভাবিক। কেননা তিনি অত্যন্ত নিভৃতচারী ছিলেন। তাঁকে প্রকাশ্যে খুব কমই দেখা যেতো । কিন্তু ভিন্ন প্রেক্ষিত থেকে বিবেচনায় নিলে তার গুরুত্ব অপরিসীম । বাংলাদেশের জাতীয় জীবনে ও জাতীয় মুক্তিসংগ্রামে তাঁর স্বামী ছিলেন অগ্রগণ্য নেতা এবং মুক্তিযুদ্ধের হাইকমান্ডের অন্যতম সদস্য। এরকম একজন মানুষের স্ত্রী হিসেবে তাঁর জীবন সংগ্রাম ও আদর্শ জাতীয় ইতিহাসের অনেক সত্যকে উত্থাপন করতে সহায়ক হতে পারে। স্বামীর রাজনৈতিক জীবনের সাথে প্রকাশ্যে জড়িয়ে না পড়লেও কীভাবে তিনি তাঁর স্বামীর রাজনৈতিক আদর্শের দ্বারা জীবনের শেষদিন পর্যন্ত আদর্শবাদী থেকেছিলেন। বাঙালীর জাতি গঠন প্রক্রিয়ায় তাঁর স্বামীর শুধুমাত্র কি তিনি সহধর্মিনী ছিলেন না কি তাঁর ঊর্ধ্বে একজন নিভৃত সহযোদ্ধাও হয়ে উঠেছিলেন ? ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিসংগ্রাম সংগঠনের প্রক্রিয়ায় তিনি একজন চাক্ষুস সাক্ষী। অত্যন্ত কাছ থেকে মুক্তিযুদ্ধ সংগঠনের প্রক্রিয়া প্রত্যক্ষ করেছিলেন এবং দেশ কিভাবে শত্রুমুক্ত হচ্ছিল তিনি তাও প্রত্যক্ষ করেছেন । বাংলাদেশ শত্রুমুক্ত হওয়ার পর স্বাধীন বাংলাদেশ পুনর্গঠনের প্রক্রিয়ায়ও তাঁর স্বামী অগ্রগণ্য নেতা ছিলেন। আবার প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির উত্থান এবং ৭৫’র নির্মম হত্যাকাণ্ডের ( স্বপরিবারে বঙ্গবন্ধু ও জেলা অভ্যন্তরে জাতীয় চার নেতার হত্যাকাণ্ডসহ) তিনি সাক্ষী ও ভিকটিম। ৭৫’র হত্যাকাণ্ডের পর তাঁর জীবনের অন্যরকম যে সংগ্রাম তৎকালীন প্রতিক্রিয়াশীলদের আধিপত্যের সমাজ বাস্তবতায় শুরু হয়েছিল তার গুরুত্বও কি কোনো অংশে কম।

সুতরাং জাতীয় চার নেতার অন্যতম শহীদ এএইচএম কামারুজ্জামান এর সহধর্মিণী হিসেবেই শুধু নয় জাহানারা জামানের জীবন সংগ্রাম ও আদর্শবাদের সামগ্রিক মুল্যায়ন ও পর্যালোচনা বাংলাদেশের জাতীয় ইতিহাসের জন্যই প্রয়োজনীয়। কেননা তাঁর জীবন সংগ্রাম ও আদর্শবাদের সামগ্রিক মূল্যায়নের মাধ্যমে আমরা শুধুমাত্র ব্যক্তি জাহানারা জামানকেই পাবো না; বরং সমকালীন সামাজিক সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক পরিমণ্ডলের চিত্র এবং সেই পরিমণ্ডলের মধ্যে এই মহান নারীর হয়ে ওঠার ইতিহাসও পেতে পারি। যা আমাদরে জন্য অনেক কিছু শিক্ষার ও অনুপ্রেরণার উৎস হবে নিশ্চিত। আর এভাবেই আমরা সংগ্রামী এই নারীর প্রতি যথার্থ সম্মান দেখাতে পারি। আজ তাঁর বার্ষিকীতে শ্রদ্ধা ও ভালবাসায় স্বরণ করছি।

সাদিকুর রহমান : লেখক ও গবেষক

  • 16
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
উপরে