আমি পেশাদার পুলিশ

প্রকাশিত: জানুয়ারি ১৭, ২০২১; সময়: ১১:৪৯ am |
খবর > মতামত

একরামুল হক : ২০১৩ সালের জানুয়ারি মাসের ১৫ তারিখে ৩১তম বিসিএস এর মাধ্যমে বাংলাদেশ পুলিশে যোগদান করি। সে হিসেবে এবছরের ১৫ তারিখে পুলিশি পেশায় আমার নবম বছরে পদার্পণ।

আমি কোন কিছু গুছিয়ে লিখতে পারিনা, তাই কিছু একটা লিখতে গেলে একদিনে লেখা সম্ভব হয়না। পুলিশে আসা না আসার কারণটা অনেক দিন লিখতে চেয়েও পারিনি।আজ বাধ্য হয়েই লিখতে হচ্ছে। প্রথমে বলি পুলিশে আসার কারণটা, একেবারে একমাত্র ইচ্ছেতে নয় আবার একেবারে অনিচ্ছাতেও নয়। নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের ছোট ছেলে (৪ ভাইয়ের মধ্যে ৪র্থ আর দুই বোনের মাঝখানে) হিসেবে জীবনের বেশীরভাগ সময় অভাব অনটনের মধ্যেই কেটেছিল। দুইবার পড়া ছেড়ে দিয়েছিলাম। অভাবে নয়, আমার পড়তে কখনও ভালো লাগতোনা। সত্যি বলতে এখনো কোনদিন পড়তে ভালো লাগেনি, একদিনের জন্যও নয়। যতটুকু পড়াশোনা করেছি প্রয়োজনের তাগিদে জোর করে। তবে পরিবারের সবার ইচ্ছে ছিল, আমি যেন পড়াশোনা চালিয়ে যাই। স্কুল জীবনের শেষের দিকে ভদ্রমহিলার (মোটেও সে আমার সাথে ভদ্র ব্যবহার করে না, লোকে বলে ভদ্রমহিলা, আমার ছেলের মা বলে ঝগড়া করতে পারিনা!) সাথে জড়িয়ে যাই। পরিবার, শিক্ষক, বন্ধু, অন্যান্যদের পাশাপাশি আজ আমার এ অবস্থানে আসার পেছনে তার অবদান কোন অংশে কম নয়।

আজ লেখার মূল উদ্দেশ্যটা পরিষ্কার করি আগে। একটা পরিবারের মধ্যবিত্ত থেকে নিম্নবিত্ত, আবার তা থেকে মধ্যবিত্তে আসার গল্পটাই বলতে চাচ্ছি আসলে। আমি আমার জীবনের ভাল মন্দ অনুভূতি শেয়ার করে হাল্কা হতে চাই। আপনারা যারা এটা পড়বেন তাদের সময় নষ্ট করা আমার উদ্দেশ্য ছিল না। মাফ করবেন…

১৯৯৩ সাল, তখন আমার বয়স ৯ বছর; তৃতীয় শ্রেনীর ছাত্র। একদিন দুপুরের খাবারের পর বাইরে খেলছিলাম। হঠাৎ কি যেন নিতে বাড়ির ভিতর ছোট ভাবির রুমের নিকট গিয়ে জানালা দিয়ে তাকাতেই তাকে গলায় রশি দিয়ে তীরের সাথে ঝুলতে দেখে দাদি দাদি বলে জোরে চিৎকার দেই। মুহুর্তেই দাদি, বড়ভাই- ভাবি, পাশের বাড়ির লোকজন, কাঠুরে নীলচাঁদ এসে দরজা ভেঙে ভাবির রশিকেটে নামিয়ে মাথায় পানি, হাঁটাহাঁটির চেষ্টা, কত কিছুই না করা হলো কিন্তু শেষ রক্ষা হলো না। আমার ৮ মাসের ভাতিজা তখনও বুঝতে পারেনি, সে মা হারা হয়ে গেছে। মেজভাই মাকে আমার ২ মাসের ছোটবোনটাকেসহ খালার বাড়িতে গরুর গাড়িতে করে রেখে আসতে যায়। এর মধ্যে তার বউ এ ঘটনা ঘটায়। খবর পাওয়ার সাথে সাথেই সে জ্ঞান হারায়। আমি ভাতিজাকে কোলে নিয়ে সেদিন যত কেঁদেছিলাম আর কখনো বোধহয় এমন কাঁদিনি। মেঝভাবি কেন এমনটি করেছিলেন তা আজও পুরোপুরি পরিষ্কার নয়।

সন্ধ্যার দিকে পুলিশ আসে, দুইজন কন্সটেবল ও একজন এস আই এসেছিল সম্ভবত। পরে ওসি সাহেবও এসেছিলেন। চেয়ারম্যান, মেম্বার, পাড়া প্রতিবেশী কে ছিল না? ভাবির বাবা অভিযোগ করেন, তার মেয়ে গলায় দড়ি দিতে পারে না।পুলিশ এবার লাশ থানায় নিয়ে যায় পোস্টমর্টেমের জন্য, সাথে কোমরে রশি বেঁধে বড় ভাইকেও নিয়ে যায়। বড় ভাইয়ের চেয়ে সহজ সরল মানুষ আমি আর জীবনে কখনও দেখিনি, তাকে যারা চেনেন সবাই অন্তত এক কথায় এটা বিশ্বাস করবেন। বাবা আর মেজভাই সবার পরামর্শে পাশের বাসায় ছিল। পরে বাবা-মা, মেজ ভাইকে আসামি করে থানায় হত্যা মামলা দায়ের করা হয়। বড় ভাইয়ের আসামির খাতায় নাম না থাকায় ৩০ হাজার টাকায় পরেরদিন সকালে মুক্তি মেলে। তখন ৩০ হাজার টাকার জন্য ১ বিঘা জমি বিক্রি করতে হয়েছিল। যার বর্তমান মুল্য ১২/১৫ লাখের কম নয়।

প্রথমে ময়নাতদন্তের রিপোর্ট Suicide আসে, কিন্তু তখন জামাত নেতা আব্দুল মাবুদের সাথে মেয়ের বাবার ব্যাবসায়িক সম্পর্ক ছিল, আবদুল মাবুদের সৎ ভাই, এ্যাড. আবু ইউসুফ মো. খলিলুর রহমান জয়পুরহাট ২ আসনের এমপির পরামর্শে বোর্ড বসিয়ে পুনরায় ময়নাতদন্তের রিপোর্ট হত্যা আসে। পুলিশ এবার আরও চড়াও হয়। আমি আর দাদি ছাড়া কেউ বাড়িতে ঘুমাতে পারেনি প্রায় ৩ বছর। তখন আবদুল মাবুদ আমাদের আপোষের প্রস্তাব দেয়। তিন বিঘা জমি দিয়ে আপোষ হয়। পুলিশ চার্জশিট দেয় কিন্তু বাবা- মার নাম কাটাতে পুলিশও এক বিঘা জমি অন্য একজনের নামে লিখে নেয়। এসপি সাহেব ২ দিন আমাদের বাসায় গিয়েছিলেন। প্রতিবেশীরা যে কিভাবে সত্যের জন্য লড়ে তা নিজেদের ক্ষেত্রে না দেখলে কখনো বুঝতাম না। প্রায় ২ বছর তারা আমাদের খাবার দিয়ে, আশ্রয় দিয়ে, সাহস দিয়ে সাহায্য করেছেন। সে কথা কখনও ভোলার নয়। ৩ বছর মামলা শেষে আমার মেজভাই মামলা থেকে খালাস পান। কিন্তু জমি, সার- বীজের দোকান, হালের গরু, জমানো টাকা সব হারিয়ে নিস্ব হয় পরিবারটি। এটা ছিল একটা পরিবারের মধ্যবিত্ত থেকে নিম্নবিত্তে রুপান্তরের গল্প।

এরপর স্কুল, কলেজ শেষ করে বাড়ি থেকে ভর্তি প্ররীক্ষা দিয়ে একটা বিষয়ে (মনোবিজ্ঞান) ওয়েটিং থেকে চান্স পাই রাজশাহী বিশ্বাবিদ্যালয়ে ২০০৩-২০০৪ সেশনে। স্কুলে স্টার মার্ক নিয়ে কম খরচের আশায় একটা বেসরকারি কলেজে ভর্তি হই। বিজ্ঞান বিভাগে সম্ভবত ১৯৬ জনের মধ্যে আমি একাই পাশ করি। বিশ্বাবিদ্যালয়ে ৩ বার ননকলিজিয়েট আর একবার ডিস কলিজিয়েট (২৩%) ছেলেটা কখনো ইচ্ছে করে নন/ ডিস কলিজিয়েট হয় নি। নিরবে কান্নার সবচেয়ে বড় সাক্ষী ছিল আয়ানের মা। অনার্স পাশের পর চাকরি যুদ্ধে বার বার পরাজিত হয়েছি। ৩০তম বিসিএস ভাইভাতে ফেল করবো আগেই জানতাম, তাই খুব বেশি কষ্ট পাইনি। কিন্তু জনতা ব্যাংকের অফিসার ক্যাশের রেজাল্টের পর ধরেই নিয়েছিলাম সরকারি চাকুরী আমার কপালে নেই হয়তো। জায়নামাজে সেদিন দুইজনে কতো যে কেঁদেছিলাম অন্তরীক্ষে অন্তর্যামী ছাড়া কেউ অবলোকন করে নি। অবশেষে ২৭টি ভাইভা দেওয়ার পর বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে অফিসার ক্যাশ পদে প্রথম চাকরি পাই। তারপর অগ্রনী, পূবালী, ডাচ বাংলা, বাংলাদেশ ব্যাংকের চাকরি হয় তিন মাসের মধ্যে। ৩১তম বিসিএসের ভাইভাটা ভাল হওয়ায় মনে ক্ষীণ আশা ছিল। বিকেলে ৪ টার পর ব্যাংক থেকে নিচে নেমে নাশতা করতাম, সম্ভবত রিমি ফোন করে বলে আজ বিসিএসের রেজাল্ট দিয়েছে তুই পুলিশ ক্যাডার পেয়েছিস। আমি প্রথমে বিশ্বাস করতে পারিনি, এই কথা নিজে রেজাল্ট দেখার আগে কারোকাছে শেয়ার করিনি। কনফার্ম হতে প্রায় রাত ৮ টা বেজেছিল। নিজের সাথে ৫/৬ জন বলার পর বিশ্বাস হয়েছিল। পুলিশ আমার ২য় চয়েস ছিল। বউ এবং পরিবারের সবাই খুব খুশি হয়েছিল কিন্তু আমার মা পুলিশের কথা শুনে খুশি হননি। মা বলেছিল, তোর অগ্রনী ব্যাংকের চাকরিটাই ভাল, পুলিশ খুব খারাপ তুই পুলিশে যাস না। আমি মাকে কথা দিয়েছিলাম Ôমা পুলিশের জন্য আমাদের পরিবার আজ পথে বসেছিল, আমি চাকরি জীবনে কোন পরিবারকে পথে বসতে দিবনা এবং একটা পরিবারকে হলেও সেভ করবো” | ইনশাআল্লাহ আজ নয় বছর জেনেশুনে কোন অন্যায় করিনি, যে আমার কাছে এসেছে খালি হাতে ফেরাই নি, মায়ের কাছে দেয়া ওয়াদা পূরণ করেছি শতভাগ। জীবনে দুইবার সম্মুখ যুদ্ধে মৃত্যুকে দেখেছি খুব কাছ থেকে। ভবিষ্যতে এই সততা ও পেশাদারিত্ব বজায় রাখার জন্য দোয়া চাই। কাউকে কখনো কষ্ট দিয়ে থাকলে ক্ষমা প্রার্থী। এটাই একটা পরিবারের আবার নিম্নবিত্ত থেকে মধ্যবিত্তে রূপান্তরের গল্প।

(ফেসবুক থেকে সংগৃহিত। ঈষৎ পরিমার্জিত)

লেখক : একরামুল হক, অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার, মতিহার জোন, রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশ

  • 41
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
উপরে