ট্রাম্প আরও কী করবেন, তা নিয়ে দুশ্চিন্তা আছে

প্রকাশিত: জানুয়ারি ৭, ২০২১; সময়: ৫:০২ pm |
খবর > মতামত

আলী রীয়াজ : যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ফল সত্যায়নের জন্য কংগ্রেসের উভয় কক্ষের যৌথ অধিবেশনের সময় কংগ্রেস ভবনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমর্থকদের হামলা, ভাঙচুর ও নৈরাজ্য সৃষ্টির ঘটনা কেবল অভূতপূর্বই নয়, যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক ইতিহাসের সবচেয়ে কলঙ্কজনক অধ্যায় বলেই চিহ্নিত হবে। এই হামলার ফলে যুক্তরাষ্ট্রে শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তরের ঐতিহ্য কালিমাময় হয়েছে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে নির্বাচনের আগে থেকে যে ধরনের সহিংসতার আশঙ্কা করা হয়েছিল, তা শেষ পর্যন্ত সত্যি হয়েছে। ট্রাম্প–সমর্থকদের এই আচরণকে সন্ত্রাসী তৎপরতা ছাড়া আর কিছুই বলার নেই। কেননা, রাজনৈতিক আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে ক্ষমতা দখলে রাখার জন্য পরিকল্পিতভাবে এই হামলা চালানো হয়েছিল। সন্ত্রাসবাদের লক্ষণগুলোর প্রায় সবই এই হামলার মধ্যে উপস্থিত ছিল। ৩ নভেম্বর মার্কিন নাগরিকেরা সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে যে রায় দিয়েছেন, তা পাল্টে দিয়ে ক্ষমতায় থাকতে চান ট্রাম্প। তাঁর সমর্থকেরা সেই ইচ্ছা পূরণের জন্যই এই হামলা চালিয়েছেন, সাংবিধানিকভাবে জনপ্রতিনিধিদের ওপরে অর্পিত দায়িত্ব পালনে বাধা দিয়েছেন, তাঁদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করেছেন। সেই কারণেই গণতন্ত্রের প্রতি আস্থাশীল লোকজন একে বিদ্রোহ এবং অভ্যুত্থান প্রচেষ্টা বলে বর্ণনা করছেন। এই বর্ণনা যথোপযুক্ত।

বুধবার সমাবেশ ডেকে ট্রাম্প তাঁর সমর্থকদের উসকানি দিয়েছেন। যখন তাঁর সমর্থকেরা কংগ্রেস ভবনে সন্ত্রাসী তৎপরতা চালাচ্ছেন, সেই সময়ে তিনি নীরব থেকেছেন। যখন নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন তাঁকে আহ্বান জানান এখনই তাঁর সমর্থকদের শান্ত করতে এবং এমনকি রিপাবলিকান পার্টির ভেতর থেকে নিন্দার ঝড় ওঠে, তখন তিনি একটি ভিডিও বার্তা দেন। কিন্তু তাতেও তিনি হামলাকারীদের নিন্দা না করে তাঁদের দেশপ্রেমিক বলে বর্ণনা করেন এবং তাঁদের প্রতি ‘ভালোবাসার’ কথা বলেন। পরে টুইট করে একই ধরনের সমর্থনই ব্যক্ত করেছেন। এই ঘটনাপ্রবাহ যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্রের ওপর একটি বড় আঘাত। যুক্তরাষ্ট্রে গণতন্ত্র গৃহযুদ্ধের পর এতটা প্রত্যক্ষভাবে হামলার শিকার হয়নি। আর সেই হামলা যে ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট নিজেই তৈরি করেছেন, সেটাই আরও বেশি উদ্বেগের।

হামলা ও সন্ত্রাসের এই ঘটনা আপাতদৃষ্টে অভাবনীয় মনে হলেও এটি একার্থে মোটেই বিস্ময়কর নয়। চার বছরের বেশি সময় ধরে ট্রাম্প যেভাবে এক উগ্র সমর্থক গোষ্ঠী তৈরি করেছেন, রিপাবলিকান পার্টিকে তাঁর করায়ত্ত করেছেন, স্বৈরাচারী আচরণ করেছেন, সংবিধানকে অবজ্ঞা করেছেন এবং দেশকে বিভক্ত করেছেন, তাতে এই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হওয়া কোনো অস্বাভাবিক বিষয় ছিল না। গত গ্রীষ্মকাল থেকে তিনি নির্বাচনের বৈধতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার যেসব আয়োজন করেছেন এবং নির্বাচনের পর থেকে জালিয়াতি হয়েছে বলে মিথ্যাচার করেছেন, এই পরিস্থিতি তারই পরিণতি। তাঁর কট্টর সমর্থকদের তিনি তাতিয়ে তুলেছেন নির্বাচনী ব্যবস্থার বিরুদ্ধে, যেকোনো স্বৈরাচার নেতা যেভাবে তা করেন, ট্রাম্প তা থেকে ভিন্ন আচরণ করেননি। তাঁর সমর্থকদের এখন কার্যত লেলিয়ে দেওয়া হয়েছে গণতন্ত্রকেই ধ্বংস করতে।

কিন্তু এই পরিস্থিতির দায় একা ট্রাম্পের নয়। রিপাবলিকান পার্টির যেসব নেতা গত চার বছর তাঁকে এই আচরণ করতে সাহায্য করেছেন, তাঁকে দায়মুক্তি দিয়েছেন, এই অবস্থার দায় তাঁদেরও। বুধবার যা হওয়ার কথা ছিল, সত্যায়নের আনুষ্ঠানিকতা মাত্র। রিপাবলিকান পার্টির যেসব কংগ্রেস সদস্য ব্যক্তিগত রাজনৈতিক অভিলাষের কারণে একে ট্রাম্পের ক্ষমতা রক্ষার উপায়ে পরিণত করেছেন, এর দায় তাঁদের। যাঁরা এই মিথ্যাচার অব্যাহতভাবে প্রচার করেছেন যে নির্বাচনে জালিয়াতি হয়েছে, এমনকি আদালতে ৬০টি মামলা খারিজের পরও তা থেকে বিরত হননি, এই পরিস্থিতি তৈরির দায় থেকে তাঁরা মুক্ত থাকতে পারেন না। এই হামলার পর যেসব কংগ্রেস সদস্য ট্রাম্পের হয়ে কংগ্রেসে ফল সত্যায়নে আপত্তি জানিয়ে ভোট দিয়েছেন, তাঁদের এই আচরণও এখন গণতন্ত্রের জন্য হুমকি বলেই বিবেচিত হওয়া দরকার।

প্রশ্ন হচ্ছে, এরপর কী হবে? এই সন্ত্রাসী ঘটনাই কি শেষ ঘটনা? দুর্ভাগ্যজনক হচ্ছে, এখানেই তার শেষ হবে, এমন মনে করার কারণ নেই। ট্রাম্পের সমর্থক এবং রিপাবলিকান পার্টির একাংশ এই ধরনের তৎপরতা অব্যাহত রাখবে, যদিও দলের একাংশের মধ্যে এখন সামান্য হলেও বোধোদয় হয়েছে। আশা করা যায় যে যাঁরা এত দিন ট্রাম্পকে ‘শান্তিবাদী’ বলে মনে করতেন—দেশে এবং দেশের বাইরে—তাঁরা বুঝতে পারছেন যে তিনি এবং তাঁর সমর্থকেরা শান্তি নয়, আইনের শাসন নয়, চান যেকোনো মূল্যে ক্ষমতায় টিকে থাকতে। এই উদ্বেগের মধ্যেও সান্ত্বনার বিষয় হচ্ছে, ট্রাম্পকে যুক্তরাষ্ট্রের সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিক প্রত্যাখ্যান করেছেন ২০১৬ সালে এবং ২০২০ সালে আরও বড় আকারে। ট্রাম্প মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের একাংশকে প্রতিনিধিত্ব করেন, কিন্তু ট্রাম্পকেই যুক্তরাষ্ট্র মনে করার কারণ নেই। নাগরিকদের মধ্যে তাঁর আবেদনের যে সীমা আছে, সেটা বিবেচনায় না রাখলে মার্কিন রাজনীতির ভবিষ্যৎ বোঝা যাবে না।

এই হামলার পর কংগ্রেসের যুক্ত অধিবেশন আবার বসেছে সাংবিধানিকভাবে, যে দায়িত্ব কংগ্রেসের ওপর দেওয়া আছে, সদস্যরা তা পালন করেছেন—এটা যুক্তরাষ্ট্রের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর, শাসনকাঠামোর শক্তির প্রমাণ দিচ্ছে। ৩ নভেম্বরের পর রাজ্য সরকারগুলোর কাঠামোগত শক্তি, আদালতের স্বাধীনতার অসংখ্য উদাহরণ তৈরি হয়েছে। কংগ্রেসের অধিবেশন অব্যাহত রাখা এবং জো বাইডেনের বিজয়ের সত্যায়নের প্রক্রিয়ায় জনগণের ভোটের প্রতিফলন ঘটেছে। এই বিষয়েও সন্দেহের কারণ নেই, ২০ জানুয়ারি জো বাইডেন প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেবেন। ট্রাম্প চান অথবা না চান, তাঁর সমর্থকেরা আরও সন্ত্রাসী তৎপরতা চালালেও এই প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে। গত কয়েক বছরে যুক্তরাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর দুর্বলতা প্রকাশিত হয়েছে, তার ভঙ্গুরতা স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে। বুধবারের ঘটনাপ্রবাহ আবার তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিবিদেরা সেই বিষয়ে কী করবেন, সেটাই এখন প্রশ্ন।

এই প্রশ্নও উঠেছে যে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আগামী দুই সপ্তাহ কী ধরনের আচরণ করবেন, গণতন্ত্রের ওপরে সহিংস হামলার যে পথ তিনি উন্মুক্ত করেছেন, তাকে কোথায় নিয়ে যাবেন। কেননা, ক্ষমতায় থাকার সব ধরনের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তিনি এখন বেপরোয়া। নির্বাহী ক্ষমতার ব্যবহার ঘটিয়ে তিনি আবার এই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি করবেন না বা রাষ্ট্রীয় বাহিনী ব্যবহার করে অভ্যুত্থানের চেষ্টা তিনি করবেন না, তার নিশ্চয়তা কোথায়। তাঁর এবং তাঁর সমর্থকদের আচরণ যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্যই হুমকি হয়ে উঠেছে। এই প্রসঙ্গে কংগ্রেস ভবনের নিরাপত্তা বিধানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ব্যর্থতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। গ্রীষ্মকালে ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার বলে গড়ে ওঠা নাগরিক আন্দোলন মোকাবিলা নির্বিচার শক্তি প্রয়োগে দ্বিধা দেখা যায়নি, কিন্তু একটি সমাবেশের কথা জানার পরও কোনো রাজধানীতে নিরাপত্তা জোরদার ছিল না, সেটা অবশ্যই প্রশ্নের উদ্রেক করে।

ভবিষ্যতে ট্রাম্প কী করবেন এবং নিরাপত্তার প্রশ্ন কীভাবে মোকাবিলা করা হবে, সেই নিয়ে দুশ্চিন্তার কারণ আছে। সে কারণেই যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এখন সময় উদ্বেগ এবং অনিশ্চয়তার।

আলী রীয়াজ : যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও সরকার বিভাগের ডিস্টিংগুইশড প্রফেসর, আটলান্টিক কাউন্সিলের অনাবাসিক সিনিয়র ফেলো এবং আমেরিকান ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ স্টাডিজের প্রেসিডেন্ট

 

সূত্র : প্রথম আলো

  • 11
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
উপরে