ভারতের ভ্যাকসিন জাতীয়তাবাদ বিশ্বের জন্যে হুমকি

প্রকাশিত: জানুয়ারি ৪, ২০২১; সময়: ৭:৪৮ pm |
খবর > মতামত

অ্যান্ডি মুখার্জি : আজকের ভারতের আর দশটা বিষয়ের মতোই নিজেই নিজের বুক চাপড়ে বাহাদুরি দাবি করার মতো উদ্ভট জাতীয়তাবাদী রাজনীতির অংশ হয়েছে টিকা অনুমোদন।

গত রোববার অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও অ্যাস্ট্রাজেনেকার তৈরি কোভিশিল্ড টিকাকে অনুমোদন দেয় ভারত। একইসঙ্গে, আবার তৃতীয় ট্রায়ালের তথ্য এখনও পাওয়াই যায়নি এমন একটি স্থানীয় সংস্থার তৈরি প্রার্থী টিকার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এই অনুমোদন বৈজ্ঞানিক বিচারে প্রশ্নবিদ্ধ।

চটজলদি এভাবে স্বীকৃতি পাওয়া ভারত বায়োটেক ইন্টারন্যাশনাল লি.- এর কোভাক্সিন টিকা গবেষণায় দুটি সরকারি সংস্থা; ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অব মেডিক্যাল রিসার্চ এবং ন্যাশনাল ইনস্টিটিউড অব ভাইরোলজি জড়িত ছিল। কিন্তু, তারপরও অপ্রমাণিত টিকার জরুরি অনুমোদনে বিস্ময়ে ভ্রু কুঁচকেছে বিজ্ঞানী এবং চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ মহলে।

এভাবে মানুষকে অনিরাপদ টিকার হুমকিতে ফেলার সরকারি পদক্ষেপে তারা উদ্বিগ্ন বলেই জানিয়েছে ভারতীয় এনজিওদের একটি নেটওয়ার্ক।

পদক্ষেপটি সত্যিই দুর্ভাগ্যজনক। এক কোটির বেশি মানুষ করোনাভাইরাসে সংক্রমিত হয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের পর ভারতই বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ প্রভাবিত দেশ। তাই বৈশ্বিক অতিমারী অবসানে নেওয়া নয়াদিল্লির সকল পদক্ষেপ বিশ্বস্তরেও গুরুত্বপূর্ণ। ১৩০ কোটির বেশি জনতাকে টিকার আওতায় আনার এই পদক্ষেপের নানা দিকের উপর নির্ভর করবে, বিশ্বে ভাইরাসের ক্ষয়ক্ষতি কমানোর বিষয়টি।

মহামারীর অভিঘাতে তীব্র চাপে রয়েছে দেশটির অর্থনীতি। আবার স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় পড়েছে সাধ্যের অতীত চাপ। সেখান থেকেও মুক্তি কামনা করছেন সংশ্লিষ্ট সকলেই। এই অবস্থায় রাজনৈতিক আদর্শকে টিকাদানের সমীকরণে অন্তর্ভুক্ত করা মারাত্মক বিপজ্জনক। এ পদক্ষেপ সরকারি পর্যায়ে দেওয়া প্রতিষেধকের ব্যাপারে জনমানুষের আস্থাও কমাবে। স্বভাবতই তারা প্রশ্ন তুলবেন; কিসের ভিত্তিতে বা কেন তারা বিশ্বাস রাখবেন!

অথচ, কোভাক্সিন অনুমোদনের সময় করা হয় সেই কাজটাই। অনুমোদনপত্রে নিয়ামক সংস্থা বলেছে আরও আশ্চর্য কথা। ফাঁকাবুলির মতোই শোনায় সংস্থার বিবৃতি। সেখানে বলা হয়েছে, ‘জনস্বাস্থ্যের সুরক্ষা বিবেচনায় নিয়ে শুধু সীমিত আকারে ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের অংশ হিসেবে এটির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে, করোনার অভিযোজিত নতুন জীবাণুর বিরুদ্ধে এটি সফল হয় কিনা- সেটাও পরীক্ষা করে দেখা এ সিদ্ধান্তের কারণ।’

এই বক্তব্যের সারমর্ম কী- তৃণমুলের জনগণ তা জানে না। যেমন তারা জানেন না; কারা পাবেন কোভিশিল্ড আর কাদের নিতে হবে কোভাক্সিন? তার চেয়েও বড় কথা, কে নেবে এসব সিদ্ধান্ত? যে দেশে আয়, সম্পদ আর সামাজিক মর্যাদার ভিত্তিতে ব্যাপক বৈষম্য বিদ্যমান সেখানে এসব প্রশ্ন অবান্তর নয়।

বিরোধী দলীয় নেতারা টিকা নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুললে, ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তাদের আপত্তিকে দেশের সেনানীদের বীরত্বকে প্রশ্ন করার মতো দুঃসাহসের সঙ্গে তুলনা করেন।

টিকা জাতীয়তাবাদে অবশ্য ভারত প্রথম সারির দেশ নয়। সেই স্থান অনেক আগেই পূরণ করেছে চীন ও রাশিয়া। তবে সহকর্মী ক্লারা ফেরেইরা মার্কুইজ বৈশ্বিক মনোভাব তুলে ধরে বলেছেন, টিকা গবেষণার তথ্য নিয়ে স্বচ্ছতার অভাব থাকায় বিশ্বব্যাপী খুব বেশি গ্রহণযোগ্যতা পাবে না- দেশদুটি করোনা ভ্যাকসিন।

বিশ্বের ৬০ শতাংশ প্রতিষেধক উৎপাদক ভারতকে যেকোনো উপায়ে এমন দুর্নাম অর্জনের পথ থেকে সরে দাঁড়াতে হবে।

গণমাধ্যমের সংবাদ অনুসারে হায়দেরাবাদ ভিত্তিক ভারত বায়োটেক তৃতীয় পর্যায়ের ট্রায়ালের জন্য ২৩ হাজার স্বেচ্ছাসেবী সংগ্রহের কাজ শেষ করেছে। সংবাদটি আগের চাইতে বেশ আশাব্যঞ্জক। কারণ, এর আগে প্রকাশিত সংবাদে নয়াদিল্লি ভিত্তিক একটি গবেষণা হাসপাতাল জানায়, তারা এই চূড়ান্ত ধাপের গবেষণার জন্য যথেষ্ট পরিমাণ লোকজন খুঁজে পাচ্ছে না। বোঝাই যাচ্ছে মানুষের আস্থা কোন পর্যায়ে ছিল বা আছে সরকারি গবেষণার উপর। আর কেনইবা জরুরি অনুমোদন দিয়ে টিকাদানের নামে ট্রায়ালের পদক্ষেপ নেওয়া হলো।

সফল হলে ওষুধটি আরও কিছুদিন পর অনুমোদন দেওয়ার উদ্যোগ নিলে ক্ষতিবৃদ্ধি কিছু হতো না। কিন্তু, চূড়ান্ত ট্রায়ালের তথ্য-উপাত্ত ছাড়া কোভাক্সিনকে বিকল্প টিকা হিসেবে ঘোষণা করার অনেক কারণ থাকতে পারে। যেমন; এর মাধ্যমে অক্সফোর্ড/ অ্যাস্ট্রাজেনেকা কর্তৃপক্ষকে চাপ দিয়ে কোভিশিল্ডের পাইকারি উৎপাদনে কম মূল্য গ্রহণের চাপ দেওয়ার উদ্দেশ্য থাকতে পারে। এটা বাণিজ্যিক এক কৌশলও বটে।

তবে পুঁজিবাজার মধ্যস্বত্বভোগী প্রতিষ্ঠান জেফ্রিজ বলছে, ওষুধের দরদাম নির্ধারণে এভাবে বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়াকে পাশ কাটানো কোনো সঠিক কৌশল হতে পারে না।

ভারতে রুশ টিকা স্পুতনিক-ভি নিয়েও পরীক্ষা চলছে। স্থানীয় ওষুধ কোম্পানি ডা. রেড্ডি’স ল্যাবরেটরিজ লি. এর সঙ্গে এর ট্রায়াল পরিচালনার চুক্তি রয়েছে। আহমেদাবাদ ভিত্তিক ক্যাডিলা হেলথকেয়ার লি. নামের আরেক সংস্থাও স্থানীয়ভাবে একটি টিকা তৈরির দৌড়ে যোগ দিয়েছে।

ভারতের এসব স্থানীয় উৎপাদক নিজ বাজারের বড় অংশ শেষ পর্যন্ত ধরতে পারবে কিনা- তা নিয়ে ভাবার সময় ন এখন। বিশেষ করে, যখন বিশ্বের বৃহত্তম টিকা উৎপাদক সেরা ইনস্টিটিউড ইতোমধ্যেই কোভিশিল্ডের ৭ কোটি ডোজ উৎপাদন করে ফেলেছে। আর বিশ্বের স্বল্প আয়ের দেশের বড় অংশই ভারতীয় উৎপাদকদের উৎপাদন সক্ষমতার উপর নির্ভর করবে। কত দ্রুততার সঙ্গে এবং সস্তা দরে তারা টিকাটি সরবরাহ করতে পারেন- তার উপর নির্ভর করবে বহু দেশের মহামারীর লাগাম টেনে ধরার লড়াই।

জাতীয়তাবাদ এক বিপজ্জনক খেলা। এই খেলার অন্তসারশূন্য স্লোগানে আর অযৌক্তিক লক্ষ্য অর্জনের চেষ্টায় টিকা উৎপাদন নিয়ে জলঘোলা হতেই পারে। এজন্যেই ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অব মেডিক্যাল রিসার্চ চাপ দিচ্ছিল যাতে ভারত বায়োটেক গত ১৫ আগস্ট স্বাধীনতা দিবসে তাদের কোভাক্সিন টিকার অনুমোদন চায়। সুখবর হলো; চাপ সত্ত্বেও ওই দিন-তারিখে ঘোষণার বিপত্তিটা ঘটেনি। কিন্তু, তখন যে অধৈর্য দেখা গিয়েছিল, তা যেন আবারও মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে। অথচ, ভারতের উচিৎ ছিল টিকা নিয়ে বিশ্বকে আশ্বস্ত করা। কার্যত, করা হচ্ছে তার উল্টোটাই।

মনে রাখা উচিৎ, কিছু জিনিষের কোনো বিকল্প নেই। সঠিক পরিকল্পনা এবং কার্যকর পদ্ধতির পরীক্ষা, ফলাফলের স্বচ্ছতা এবং ত্রুটি-বিচ্যুতি নিয়ে সৎ স্বীকারোক্তি বিশ্বকে আশ্বস্ত করবে। কিন্তু, বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ায় ফাঁকি দেওয়ার চেষ্টা করলে বিশ্ব আস্থা হারাবে। তাই মোদির উচিৎ আপাতত সৈনিকদের শান্তিতে রেখে, বিজ্ঞানকে তার নিজস্ব গতিতে চলতে দেওয়া।

সূত্র: ব্লুমবার্গ
লেখক: অ্যান্ডি মুখার্জি ব্লুমবার্গে শিল্প প্রতিষ্ঠান এবং আর্থিকসেবা খাত নিয়ে নিয়মিত কলাম লেখক। ইতোপূর্বে, তিনি রয়টার্সের ব্রেকিংভিউজেও লিখতেন।

সূত্র : দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড

  • 10
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
উপরে