ম্যাজিস্ট্রেট সারওয়ার, ‘সুলতানা সরোবর’ আর স্বাধীন বিচার বিভাগ

প্রকাশিত: নভেম্বর ১৬, ২০২০; সময়: ৬:৩৭ pm |
খবর > মতামত

রুমিন ফারহানা : সুলতানা সরোবর’-এর কথা মনে আছে আমাদের? কাবিখার টাকায় পুকুর সংস্কার করে সেটার নতুন নাম নিজের নামে নামকরণ করার সব ব্যবস্থা চূড়ান্ত করেছিলেন কুড়িগ্রামের তৎকালীন জেলা প্রশাসক সুলতানা পারভীন। একজন জেলা প্রশাসক অতীতেও খুব গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা ছিলেন, কিন্তু এখন তাদের প্রতাপ আগের যেকোনও সময়ের চাইতে বহুগুণ বেশি। তাই তারা ভাবেন তাদের নামে রাষ্ট্রের কোনও কিছুর নামকরণ করতে চাইতে পারেন তারা।

সেই চেষ্টায় বাদ সেধেছিলেন বাংলা ট্রিবিউনের জেলা প্রতিনিধি আরিফুল ইসলাম রিগান। এটা নিয়ে রিপোর্ট করেন তিনি। এই ‘অপরাধে’ জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা তাকে জেলা প্রশাসনের কার্যালয়ে নিয়ে ‘বিবস্ত্র’ করে নির্যাতন করে। সবশেষে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে আধা বোতল মদ ও দেড়শ’ গ্রাম গাঁজা পাওয়ার কথিত স্বীকারোক্তিতে এক বছরের কারাদণ্ড এবং ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।

মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারওয়ার আলম জনপ্রিয় মানুষ। এর আগে একই কারণে যেমন জনপ্রিয় ছিলেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রোকন উদ দৌলা‌। রোকন উদ দৌলা‌ কিছুটা ‘দুর্ভাগা’। কারণ, তার সময়ে সামাজিক মাধ্যমের এত বাড়বাড়ন্ত ছিল না। কিন্তু জনাব সারোয়ার আলম ‘সৌভাগ্যবান’। তার সময়ে এই মাধ্যমটির কল্যাণে তিনি দেখতে পেয়েছেন, আমরাও দেখছি কত মানুষ তাকে সমর্থন করছেন।

বাংলাদেশের আইনে শিশুদের বিচার একমাত্র শিশু আদালতেই সম্ভব। কিন্তু গত কয়েক বছরে ভ্রাম্যমাণ আদালত একের পর এক শিশুকে দণ্ড দিচ্ছিল। ২০১৯ সালের শেষ নাগাদ টঙ্গী শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে ১২১ শিশু ছিল, যারা মোবাইল কোর্টে দণ্ডিত হয়েছিল। হাইকোর্ট পরে এদের সবার সাজা অবৈধ বলে ঘোষণা করেন। জনাব সারওয়ার আলমও এমন দণ্ড দিয়েছিলেন এবং তার বিচারিক ক্ষমতা কেড়ে নেওয়ার জন্য রিট হয়েছিল হাইকোর্টে। তখন জনাব সারওয়ার ফেসবুকে আবেগঘন স্ট্যাটাস দিয়েছিলেন এবং মানুষ তার পক্ষে দাঁড়িয়েছিল।

উপরের দুটি ঘটনার মতো মোবাইল কোর্টের অপব্যবহারের ভূরি ভূরি ঘটনা মিডিয়ায় এসেছে। খুব বেশি উল্লেখ করতে চাই না। তবে একটা ঘটনা আলাদা গুরুত্ব পাবার দাবি রাখে। ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে লক্ষ্মীপুরের তখনকার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (এডিসি) শেখ মুর্শিদুল ইসলাম সাবেক সিভিল সার্জন ডা. সালাহ উদ্দিনের সঙ্গে কথা কাটাকাটির জের ধরে মোবাইল কোর্ট বসিয়ে তাকে তিন মাসের কারাদণ্ড দেন।

সাম্প্রতিক খবর হচ্ছে, র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের দায়িত্ব ছয় বছর পালনের পর জনাব সারওয়ারকে বদলি করা হয়েছে। এই বদলি যখন করা হলো তখনও নেটিজেনরা ভীষণ শক্ত প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন। সরকারের সমালোচনা করেছেন। কারণ, তার এই বদলি একটা অতি উল্লেখযোগ্য ঘটনার কিছু দিন পরেই ঘটলো। বাংলা ট্রিবিউন এ ব্যাপারে তাদের রিপোর্টে লিখেছে, ‘সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের দাবি, ২৭তম বিসিএসে প্রশাসন ক্যাডার সার্ভিসে যোগদান করা এই কর্মকর্তা সর্বশেষ পুরনো ঢাকায় হাজি সেলিমের বাড়িতে অভিযান ও মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করেন। বলা হচ্ছে এই জন্য তাকে বদলি করা হয়েছে। একজন এমপির বাড়িতে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করতে পারেন কিনা তা নিয়ে সরকারের উচ্চপর্যায়ে আলোচনা হয়। এরপরই তাকে গোপনীয়তার মধ্যে বদলি করা হলো।’

জনাব সারওয়ারের বদলির ঘটনার কারণ যদি সত্যি হয় তাহলে সেটা সরকারের বিবেচনায় ‘ভুল’ হলেও জনগণ এটাকে সাধুবাদ জানায়। কিন্তু এই লেখার শুরুর অংশে যে তিনটি ঘটনার উল্লেখ করা হয়েছে যেগুলো জনগণের কাছেও মোবাইল কোর্টের চরম অপব্যবহার বলেই নিশ্চিত হবে।

তর্কের খাতিরে ধরে নিই, মোবাইল কোর্ট চলার সময় আজ পর্যন্ত খুব বড় অপব্যবহারের ঘটনা ঘটেনি। প্রত্যেকটি ক্ষেত্রেই নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা কম-বেশি ঠিকঠাক বিচার করেছেন এবং ভবিষ্যতেও করবেন। তাহলেও কি আমরা এই তথাকথিত বিচার ব্যবস্থা মেনে নেবো? আমি জানি এই প্রশ্নের যদি একটা গণভোট আয়োজন করা হয় তাহলে ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত হবে। তবু এই জনপ্রিয় বিষয়টির বিরুদ্ধেই লিখছি। কারণ, একজন ম্যাজিস্ট্রেটের বদলি জনিত ডামাডোলে একেবারেই হারিয়ে গেছে অতি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা।

একটা আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত ধারণা হচ্ছে ‘সেপারেশন অব পাওয়ার’। একটা রাষ্ট্রে আইন প্রণয়ন করার ক্ষমতা, আইন প্রয়োগ করার ক্ষমতা এবং বিচার করার ক্ষমতা একেবারে স্বতন্ত্র তিনটি আলাদা সত্তার কাছে থাকবে। তিনটি সত্তা পরস্পরের প্রভাবমুক্ত হয়ে স্বাধীনভাবে কাজ করবে। এটাই আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের একেবারে মৌলিক ধারণা।

আমরা কাগজে-কলমে অন্তত স্বাধীন বিচার বিভাগের প্রাথমিক স্বীকৃতি দিয়েছিলাম। বাংলাদেশ সংবিধানের ২২ অনুচ্ছেদ বলে– ‘রাষ্ট্রের নির্বাহী অঙ্গসমূহ হইতে বিচার বিভাগের পৃথকীকরণ রাষ্ট্র নিশ্চিত করিবেন’। এই আলোচনার সঙ্গে প্রাসঙ্গিক না হলেও আর একটি বাক্য এখানে যুক্ত করে রাখছি। আমাদের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১১৫ ও ১১৬ এই ২২ অনুচ্ছেদের সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক।
সংবিধানের ২২ অনুচ্ছেদ সংবিধানের দ্বিতীয় ভাগ অর্থাৎ ‘রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি’ অধ্যায়ের অংশ। এটা যদি রাষ্ট্রের মূলনীতি হয়ে থাকে তাহলে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট কোনোভাবেই বিচারকার্য পরিচালনা করতে পারেন না। এটা সুস্পষ্টভাবে অসাংবিধানিক। এটা আদালতেরও বক্তব্য।

নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের দিয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করাকে চ্যালেঞ্জ করে দায়ের করা রিটের রায় ২০১৭ সালের ১১ মে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দিয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার ২০০৯ সালের আইনের ১১টি ধারা ও উপধারা অবৈধ ঘোষণা করে রায় দেন হাইকোর্ট। একইসঙ্গে, এই আইনে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দিয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা অবৈধ ঘোষণা করেন আদালত। রায়ে বলা হয়, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেটদের বিচারিক ক্ষমতা দেওয়া সংবিধানের লঙ্ঘন এবং তা বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ওপর আঘাত। এটি ক্ষমতার পৃথককরণ নীতিরও পরিপন্থী। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেটসহ কর্ম-কমিশনের সব সদস্যরা প্রশাসনিক নির্বাহী। একজন নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে তারা প্রজাতন্ত্রের সার্বভৌম বিচারিক ক্ষমতা চর্চা করতে পারেন না।

এই রায়ের পর সরকার আপিল করে এবং আপিল বিভাগ স্থগিতাদেশ দেয় রায়ের ওপরে। সেই স্থগিতাদেশের বলেই এখনও এই আদালতগুলো চলতে পারছে। এতে খুব গুরুত্বপূর্ণ দুটো প্রশ্ন আছে। প্রথমটি হলো দেশের হাইকোর্টের এরকম সুস্পষ্ট রায়ের বিরুদ্ধে সরকার কেন আপিল করলো? বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কথা কি সরকার জানে না?

দ্বিতীয় প্রশ্ন হচ্ছে আপিল করার পর সাড়ে তিন বছর পেরিয়ে যাওয়ার পর‌ও এই আপিলের শুনানি এখনও কেন শুরু হয়নি? এই শুরু না হওয়াটা কি প্রমাণ করে না স্থগিতাদেশ অনন্তকাল ঝুলিয়ে রাখার চেষ্টা করবে সরকার এবং সেটা দিয়েই এই নির্বাহী বিভাগের পরিচালনায় মোবাইল কোর্ট চলতেই থাকবে?

কী করা উচিত তাহলে? মোবাইল কোর্ট বাতিল করা উচিত। রাষ্ট্রকে বুঝতে হবে মোবাইল কোর্ট প্রচলিত বিচার ব্যবস্থার অপ্রতুলতা এবং অদক্ষতার প্রমাণ দেয়। যেভাবে মানুষকে চাপ দিয়ে স্বীকৃতি আদায় করে বিচার করে ফেলা হয় সেটা ন্যায়বিচারেরও পরিপন্থী।

তারপরও কোনও কোনও ক্ষেত্রে যদি মোবাইল কোর্ট রাখার প্রয়োজন জরুরি বলে মনে হয় সেক্ষেত্রে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করবেন বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেটরা। এর কোনও রকম ব্যত্যয় হতে পারে না। বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেটের সংখ্যা যদি অপ্রতুল হয়ে থাকে তাহলে জরুরি ভিত্তিতে অনেক বেশি সংখ্যক বিচারক ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ দেওয়া হোক। জরুরি প্রয়োজনে সরকারকে একসঙ্গে অনেক বেশি সংখ্যক চিকিৎসক নিয়োগ দিতে আমরা কিছু দিন আগেও দেখলাম। তাহলে সেটা বিচারক ম্যাজিস্ট্রেটের ক্ষেত্রে কেন করা যাবে না?

র‌্যাবে নতুন একজন ম্যাজিস্ট্রেট যোগ দিয়েছেন এমন খবর পত্রিকায় এসেছে। তিনিও যদি তার পূর্বসূরির মতো একের পর এক অভিযান পরিচালনা করতে থাকেন ক্যাসিনো, ভেজাল দেওয়ার প্রতিষ্ঠান, মানহীন হাসপাতাল কিংবা আরও বহু দুর্নীতিবাজ এমপির বাড়িতে, সেটা দেখে মানুষ খুশি হবে নিশ্চিত। কিন্তু রাষ্ট্রের নির্বাহী বিভাগ যখন বিচার করে বেড়ায় তখন সেটাকে আর রাষ্ট্র বলে মনে হয় না, এটা হয় মধ্যযুগীয় রাজ্য।

লেখক: আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট। জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত আসনে বিএনপির দলীয় সংসদ সদস্য

সূত্র : বাংলাট্রিবিউন

  • 24
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আরও খবর

  • দেশ যখন করোনার আরেকটি ঢেউয়ের মুখোমুখি!
  • পরমাণু বিজ্ঞানীর হত্যাই কি ট্রাম্পের ইরানের সাথে যুদ্ধ শুরুর পূর্বাভাস?
  • নারী নির্যাতন, কোভিড-১৯ ও মানবাধিকার
  • টিকা শুধু কেনা নয়, উৎপাদনেরও উদ্যোগ চাই
  • বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য: কেন ঔদ্ধত্যপূর্ণ বক্তব্যের জবাব দেয়নি কেউ?
  • ‘রাষ্ট্র মানেই কাঠগড়া গরাদের খোপ’
  • কিশোর গ্যাং কেন বাড়বে না?
  • জগতে মানুষ বড় জটিল, তবুও অনুশোচনা নয়
  • লাল মওলানার উত্তরাধিকার
  • ম্যাজিস্ট্রেট সারওয়ার, ‘সুলতানা সরোবর’ আর স্বাধীন বিচার বিভাগ
  • ভ্যাকসিন জাতীয়তাবাদ ও মানবাধিকার
  • আর কতো কাল?
  • ফাইজারের ভ্যাকসিন বিশ্বের জন্য সুসংবাদ, বাংলাদেশের জন্য নয়
  • যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন শেষ হইয়াও হইল না!
  • শিক্ষার্থীদের থেকে সবচেয়ে ভালোটা যেভাবে পেতে পারি
  • উপরে