ধর্ষণ: পুরাণ থেকে বর্তমানে

প্রকাশিত: অক্টোবর ১৫, ২০২০; সময়: ৪:৩১ pm |
খবর > মতামত

অদিতি ফাল্গুনী : পৃথিবীতে নাকি একটা সময় চির বসন্ত ছিল। কিন্তু বেশি দিন এই সুখ সইল না। সইল যে না, তার পেছনে ছিল এক মর্মন্তুদ ধর্ষণের কাহিনি।

হ্যাঁ, গ্রেকো-রোমক পুরাণ অনুযায়ী, ধরিত্রী দেবী দিমিতারের ছিলেন পরমা সুন্দরী কন্যা প্রসার্পিনা। তার প্রতি নজর পড়ল পাতালরাজ প্লুটোর। একদিন মা দিমিতারের অনুপস্থিতিতে জোর করে প্রসার্পিনাকে ঘাড়ে তুলে পাতালে নিয়ে গিয়ে বন্দি করলেন নরকরাজ প্লুটো। প্রসার্পিনার কান্নায় ভারি হয়ে উঠল পাতাল।

ওদিকে পৃথিবীতে মা দিমিতারও কাঁদছেন। মা-মেয়ের অনেক কান্নাকাটি ও অনুনয়ের পর পাতালরাজ প্লুটো সম্মত হলেন, প্রতি বছর একটি নির্দিষ্ট সময় প্রসার্পিনা তার মাকে দেখতে পাতালের ওপর, তথা পৃথিবীতে যেতে পারবেন।

প্রসার্পিনা যখন প্রতি বছর মায়ের সঙ্গে থাকতে পৃথিবীতে আসেন, সেই হাসি-খুশি, সুন্দর আর ঝলমলে সময়টাই হলো বসন্তকাল। আর যখন মাকে ছেড়ে তাকে পাতালের অন্ধকারে ততধিক নিষ্ঠুর পাতালরাজের সঙ্গে থাকতে হয়, তখনই আমাদের পৃথিবীতে নামে হাড় কনকনে, কঠোর শীতকাল।

হ্যাঁ, প্রাচীন গ্রিক ও রোমক পুরাণের সূত্র ধরেই জানা যাচ্ছে, খ্রিষ্টপূর্ব ৯০০ অব্দ থেকেই পৃথিবীতে ‘ধর্ষণ সংস্কৃতি’ চালু। গ্রিক পুরাণে খোদ দেবরাজ জিউস একাধিক নারীকে ধর্ষণ করছেন- যাদের ভেতর ছিলেন অন্তিয়োপ, ইউরোপা, হেরা, লেডা এবং আরও কয়েকজন নারী। সমুদ্র দেবতা পসেইদন ধর্ষণ করেন মেডুসাকে।

রোমক সমাজে আবার ‘দ্য রেপ অব স্যাবাইন ওমেন’ বা স্যাবাইন নারীকে ধর্ষণ করার প্রথাটি ছিল রোমক পুরুষের জন্য আইনসঙ্গত ও বিধিসম্মত। অনেকটা হিটলারের ‘ইউজেনিকস’ তত্ত্ব বা হালের সার্ব পুরুষ কর্তৃক বসনীয় নারী ধর্ষণের মাধ্যমে পিতৃ জিন বা বংশগতি দিয়ে মাতৃ জিন বা বংশগতিকে ‘বদলে’ ফেলে নতুন বর্ণ শংকর সৃষ্টির উদ্দেশ্যেই স্যাবাইন নারীদের ধর্ষণ করা হতো।

টার্ক্যুইনিয়াসের ‘দ্য রেপ অব লুক্রেশিয়া’য় ধর্ষিতা লুক্রেশিয়া আত্মহত্যা করেও রেহাই পাননি। কতিপয় পণ্ডিত তাকে ‘ইচ্ছার বিরুদ্ধে হলেও যৌন আনন্দ ভোগ করার পাপে পাপী’ বলে অভিযুক্ত করেছেন। ঠিক যেভাবে স্বয়ং আকিরা কুরোসাওয়ার ‘রশোমন’ চলচ্চিত্রে বনের ভেতর ডাকাত সর্দার যখন সামুরাই পুরুষটিকে গাছের সঙ্গে বেঁধে তার বউকে ধর্ষণ শুরু করে, মেয়েটি শুরুতে প্রতিরোধ করার চেষ্টা করলেও একসময় তার প্রতিরোধ শিথিল হতে দেখা যায় এবং সে ‘বিষয়টি উপভোগ করা’ শুরু করে- এমন দৃশ্য দেখানো হয়েছে।

সত্যি বলতে, বেগমগঞ্জের ঘটনার পর গোটা বাংলাদেশে মেয়েরা যখন তীব্র বিক্ষোভে রাস্তায় নামছে, পৃথিবীর সেরা সাহিত্যিক বা চলচ্চিত্রকার পুরুষদের নানা নির্মাণ বা সৃজনকর্ম নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন মাথায় ধাক্কা দিচ্ছে। ‘রশোমন’-এ কি তবে মিসোজিনি প্রবল? যদিও সিনেমাটি কুরোসাওয়া বানিয়েছিলেন একটি জাপানি উপন্যাস অবলম্বনে। অথবা, ধর্ষণ প্রসঙ্গে কত অবলীলায় না কৌতুক করেন জর্জ বার্নার্ড শ, ‘যখন ধর্ষণ এড়ানো সম্ভব নয়, তখন বরং উপভোগ করুন।’ নারীর জন্য এই বাক্যবন্ধ কতটা নিষ্ঠুর, সেটা কি ভাবা যায়?

অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, মধ্যযুগের ইংল্যান্ডে ‘রেপ্টাস ল’র আওতায় ‘অপহরণ’ ও ‘ধর্ষণে’র জন্য সমপরিমাণ শাস্তি বরাদ্দ ছিল। ল্যাটিন ভাষায় ‘রেপ্টাস’ শব্দের আক্ষরিক অর্থ ছিল ‘জোর করে দখলকৃত।’ মূল যে শব্দ বা ধাতু ‘রেপেরে’ থেকে ‘রেপ্টাস’-এর উদ্ভব, তার অর্থও ছিল ‘দখল করা’। রোমক আইনে ‘সম্পত্তি’ বিষয়ক অপরাধকর্মের তালিকায় এই শব্দ ব্যবহৃত হতো। আর সেই যুগে নারীকে আক্ষরিক অর্থেই পুরুষের ‘সম্পত্তি’ হিসেবে বিবেচনা করা হতো।

রোমক সম্রাট কনস্ট্যান্টিন প্রথম ‘ধর্ষণ’কে ব্যক্তিগত অন্যায়ের বদলে ‘জনপরিসরে সংঘটিত অপরাধ’ হিসেবে পুনর্সংজ্ঞায়িত করলেও, ‘সম্মতি’ দানের অপরাধে ঘটনার শিকার নারীকে প্রায়ই ঘটনার হোতা পুরুষটির সঙ্গে আগুনে পুড়িয়ে মারা হতো। সম্মতি প্রমাণিত না হলেও নারীটিকে ‘দুষ্কর্মের সহযোগী’ হিসেবে দণ্ড দেওয়া হতো। সেই ঐতিহ্য আজও চলছে।

ভারতীয় পুরাণ-বা কম কীসে? স্বয়ং দেবরাজ ইন্দ্র গৌতম মুনীর স্ত্রী অহল্যার প্রেমে মোহিত হয়ে গৌতম যখন বাসায় অনুপস্থিত, তখন ইন্দ্রজালে গৌতমের ছদ্মবেশে উপস্থিত হয়ে অহল্যার সঙ্গে দৈহিক মিলন করেন। পরে গৌতম নিজেই উপস্থিত হলে ইন্দ্রের ছলনা ধরা পড়ে। গোটা ঘটনায় অহল্যার কোনো দোষ না থাকলেও গৌতমের অভিশাপ থেকে রেহাই পান না তিনি। দীর্ঘ-দীর্ঘ বছর একটি পাথর হয়ে থাকতে হয় অহল্যাকে। পরে তাকে মুক্ত করেন অবতার রাম।

আবার, দানব জলধর মায়াবলে যে কোনো নারীর কাছে তার স্বামীর চেহারা ধরে উপস্থিত হতে পারত এবং পরিচয় লুকিয়ে সেই মেয়েদের সঙ্গে দৈহিক সম্পর্কে লিপ্ত হতো। জলধরের এত অন্যায়ের পরও তার স্ত্রী বৃন্দা ছিল স্বামীর প্রতি প্রচণ্ড অনুগত। ‘সতী নারীর পতি’ হিসেবে সে ছিল অবধ্য। একটা পর্যায়ে উপায়ন্তর না দেখে স্বয়ং নারায়ণ তখন বৃন্দার কাছে জলধরের রূপ ধরে বৃন্দার সঙ্গে মিলিত হন। বৃন্দার পবিত্রতা ধ্বংস হয় এবং জলধর আর অবধ্য থাকে না। জলধরকে হত্যা করা সম্ভব হয়। সাশ্রু নয়নে বৃন্দা চিতায় ঝাঁপ দেয় এবং পরজন্মে ‘তুলসী’ গাছ বা পবিত্রতার প্রতীক হিসেবে জন্ম নেয়।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘প্রাগৈতিহাসিক’ গল্পের ভিখু কেন দুঃসময়ে তার প্রাণ, আশ্রয় ও আরোগ্যদাতা পেহ্লাদ বাগদির স্ত্রীকেই ঘরে পেহ্লাদের অনুপস্থিতির সময়ে ধর্ষণের চেষ্টা চালায়, যদিও সে চেষ্টা সফলকাম হয় না? বঙ্কিমচন্দ্রের ‘দুর্গেশনন্দিনী’তে ব্রাহ্মণ পিতা ও শুদ্র মায়ের কন্যা বিমলার রূপে-গুণে মুগ্ধ হলেও তাকে বিয়ে করতে চায়নি রাজকন্যা তিলোত্তমার পিতা বা গড় মান্দারণের অধিপতি রাজা। নেহাত বাধ্য হয়ে এক পরিস্থিতিতে রাজা বিমলাকে বহু আগে লুকিয়ে বিয়ে করলেও রাজ প্রাসাদে পরিচারিকার পরিচয়েই ছিল বিমলা। তবু রাজার প্রতি বা রাজার প্রয়াত, বৈধ স্ত্রীর কন্যা তিলোত্তমার প্রতি ভক্তি-স্নেহ-আনুগত্য আজীবন রক্ষা করে চলে বিমলা।

ফিওদর দস্তয়েভস্কির ‘ব্রাদার্স কারামাজভস’-এ তিন বৈধ পুত্র দিমিত্রি-ইভান-আলিওশা ছাড়াও এক পাগলিকে ধর্ষণ করেছিল পিতা কারামাজভ। পাগলিটি এক তুষার ঝড়ের রাতে যে অবৈধ পুত্রের জন্ম দিয়ে মারা যায়, সেই অবৈধ পুত্রই তিন কারামাজভ ভাইয়ের সঙ্গে তাদের বাসাতেই ভৃত্য হিসেবে বড় হয়ে ওঠে। সে আসলে চতুর্থ কারামাজভ ভাই।

পুরাণ বা সাহিত্যে ধর্ষণের প্রসঙ্গ বলতে গেলে ফুরোবে না। জীবজগতেও আমরা দেখি, পুরুষ ডলফিন অনেক সময়ই নারী ডলফিনের দল থেকে হুট করে কাউকে অপহরণ করে তুলে নিয়ে যায় নিজের আস্তানায় এবং বলপ্রয়োগ করে। একই ধরনের ঘটনা ঘটায় পুরুষ শিম্পাঞ্জিও। কেন ঘটে এমনসব ঘটনা?

ধর্ষণ যখন বর্ণবাদ, যুদ্ধ-গৃহযুদ্ধ, দাঙ্গা ও জাতিগত বিদ্বেষের হাতিয়ার
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বিকাশমান তুলা চাষের জন্য যখন আফ্রিকা থেকে ধরে আনা হতো প্রচুর কালো নর-নারী, তখন কালো ক্রিতদাসীর ওপর সাদা দাস মালিকের বৈধ অধিকার স্বীকৃতই ছিল। একে তো সেই সময়ের পিউরিটান, সাদা মধ্যবিত্ত নারী অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ছিল যৌন শীতল, তাতে সাদা প্রভুর হাতে মিসিসিপির স্রোতের মতো আছড়ে পড়ছে কালো নারীর ঢল, যাদের ত্বক কালো হলেও দৈহিক আকৃতি খুবই সুগঠিত, সুন্দর। শ্বেতকায় পুরুষ বিশ্বাসই করত, কালো নারী প্রকৃতিগতভাবেই ‘কামুক’। অধিকাংশ ক্ষেত্রে অবিবাহিতা, কালো নারীই বেশি যৌন নিগ্রহের শিকার হলেও ক্ষেত্রবিশেষে সুন্দরী, বিবাহিতা কালো নারীও রেহাই পেত না। দাস স্বামীর কোন অধিকারই ছিল না স্ত্রীকে রক্ষা করার (https://www.thirteen.org/wnet/slavery/experience/gender/history2.html)।

অ্যালেক্স হেলির ‘রুটস’-এ কুন্টা কিন্টে দাস হয়ে আমেরিকা আসার পরে তার তৃতীয় প্রজন্মের কাহিনিটি এক কালো মেয়ের, যাকে অবিবাহিতা অবস্থায় ধর্ষণ করে সাদা মালিক। মেয়েটির আর বিয়ে করা হয় না; তবে সে জন্ম দেয় এক মিশ্র শিশুর। ‘ম্যুলাটো’ শব্দটির অর্থই তো সাদা-কালোর মিশ্রণে জন্ম নেওয়া বর্ণশংকর শিশু; আর এই শংকরায়ণ শুধুই প্রেম থেকে নয়, জাতিগত অত্যাচারের ফলাফল হিসেবেও ঘটেছে।

বলকান গৃহযুদ্ধে সার্ব-ক্রোয়াট-বসনীয় তিন পক্ষের পুরুষেরাই যুদ্ধ ও পারষ্পরিক দাঙ্গা-হত্যা-ধর্ষণে জড়ালেও সবচেয়ে বেশি ধর্ষণ করেছে সার্ব পুরুষেরাই এবং সেটা ঘটেছে বসনীয় মুসলিম নারীদের প্রতি। আনুমানিক দশ থেকে পঞ্চাশ হাজার নারী ধর্ষিত হয় বলকান যুদ্ধে (https://en.wikipedia.org/wiki/Rape_during_the_Bosnian_War)।

বাংলাদেশেও একাত্তরে দুই থেকে চার লক্ষ নারীকে ধর্ষণ করা হয়েছিল ‘জাতিগত শুদ্ধি অভিযানে’র অংশ হিসেবেই (https://en.wikipedia.org/wiki/Rape_during_the_Bangladesh_Liberation_War)।
আবার ‘উই উইল টিচ ইউ আ লেসন: সেক্সুয়াল ভায়োলেন্স অ্যাগেইনস্ট তামিলস বাই শ্রীলঙ্কান সিকিউরিটি ফোর্সেস’ শিরোনামে এক ১৪১ পাতার প্রতিবেদনে ২০০৬-১২ নাগাদ শ্রীলংকার বিভিন্ন কারাগার বা ডিটেনশন সেন্টারে বিদ্রোহী তামিল নারী এবং ক্ষেত্রবিশেষে পুরুষদেরও কীভাবে ধর্ষণ করেছে শ্রীলংকার পুলিশ, সামরিক বাহিনী অথবা প্যারা মিলিশিয়া বাহিনী, তার একটি বিবরণ মেলে। ‘হিউম্যান রাইটস ওয়াচ’ এই বিষয়ে আলো ফেলেছে (https://www.hrw.org/news/2013/02/26/sri-lanka-rape-tamil-detainees)।

সহস্রাব্দ আগে রচিত গ্রিক নাট্যকার ইউরিদিসের ‘ট্রোজান ওমেন’ বিজয়ী গ্রিক সৈন্যদের হাতে ট্রয়ের রাজা প্রিয়ামের স্ত্রী হিক্যুবা, কন্যা ক্যাসান্দ্রা বা পুত্রবধূ অ্যান্ড্রোমেকে থেকে সাধারণ নারীদের সম্ভ্রমহানির বিবরণ।

সব দেখে-শুনে মনে হয়, সুসান ব্রাউনমিলার তার ‘অ্যাগেইনস্ট আওয়ার উইল: মেন, ওমেন অ্যান্ড রেপ’-এই চূড়ান্ততম সত্য কথাটি বলেছেন, ‘নারীকে এক চিরন্তন ভয়ের কারাগারে রাখতেই পুরুষ ধর্ষণ করে।’

১৯৭৩ সালে ভারতের এক হাসপাতালের ২৭ বছর বয়সী সেবিকা অরুণা শনবাগ, যিনি কি না ওই হাসপাতালের এক তরুণ ডাক্তারের বাগদত্তাও ছিলেন, হাসপাতালেরই এক পরিচ্ছন্নতাকারী সোহনলাল বাল্মিকীকে হাসপাতালের করিডোর ভালোভাবে পরিচ্ছন্ন না রাখায় বকেছিলেন। সোহনলাল এর শোধ নিতে এক রাতে বাড়ি ফেরার সময় অরুণা যখন সেবিকার পোশাক বদলে বাসায় যাবার পোশাক পরে নিচ্ছিলেন, তখনই হুট করে পোশাক বদলানোর কক্ষে ঢুকে পড়ে এবং অরুণাকে শারীরিক নির্যাতন করার পর ডগ চেইন দিয়ে তার মাথায় এমন আঘাত করে যে, জীবনের পরের বত্রিশটি বছর অরুণাকে কোমায় থাকতে হয়েছে। ২০১৫ সালে অরুণার অন্তিম দেহাবসান হয়।

কেন এমন করেছিল সোহনলাল? কেন ভারতে বা বাংলাদেশে চলন্ত বাসে নারী নিগ্রহ ঘটছে? কেনই-বা মঠ-চার্চ-মাদ্রাসায় প্রতিনিয়ত মেয়ে ও ছেলে শিশু নিগৃহীত হয়? কেন পিতৃব্য আক্রমণ করে ভাইয়ের মেয়েকে? কেনই-বা বেগমগঞ্জে আঠার থেকে বিশের একদল ছেলে বত্রিশের এক নারীর নির্যাতনের সেই ভয়ানক ভিডিও ছড়াল ফেসবুকে? এর ব্যখ্যা কী?

আবার, নারীর প্রতি সব সহিংসতার ঘটনায় আমাদের প্রতিক্রিয়া কি একই মাপের?

না, ভারতে যেমন দলিত বা মুসলিম নারীর তুলনায় অনেক ধর্ষণের ঘটনার চেয়েও একজন নাগরিক-মধ্যবিত্ত-উচ্চবর্ণ নারীর প্রতি সহিংস যৌন নিগ্রহ সংঘটিত হলে বিক্ষোভ বেশি হয়, বাংলাদেশেও দেখা গেছে যে দরিদ্র বা নৃ-তাত্ত্বিক কি ধর্মীয় সংখ্যালঘু নারীর প্রতি অনেকগুলো ধর্ষণের ঘটনার চেয়েও মধ্যবিত্ত ও ধর্মীয় এবং নৃ-তাত্ত্বিকভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠ নারীর প্রতি একটি ধর্ষণের ঘটনাতেও শুধু পুরুষ নয়, নারীদের ভেতরেও বিক্ষোভের সাড়াটি অনেক বেশি মেলে। তবু এই বিক্ষোভ ইতিবাচক। কিছু প্রতিবাদ তো অন্তত হোক।

ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড: শাসক শ্রেণি কি দেয়াল লিখন পড়বেন?
বেগমগঞ্জের ঘটনার পর গোটা বাংলাদেশে মেয়েরা যখন পথে নেমে এসেছে, তখন হয়তো বিপুল জনবিক্ষোভকে প্রশমিত করতেই সরকার দ্রুততার সঙ্গে ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে অধ্যাদেশ জারি করেছে। কিন্তু এতেই কি সব সমস্যার সমাধান হবে? এই ঔপনিবেশিক আইনি কাঠামোয় যেখানে রেপ ভিকটিমকে হাসপাতাল থেকে আদালতে প্রতি পদে অবমানিত হতে হয়, হতে হয় দীর্ঘসূত্রিতার শিকার, তখন কি লাভ এমন আইন প্রণয়নে?

হ্যাঁ, নিকট অতীতে একমাত্র এসিড নিক্ষেপের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা এবং কয়েকটি ক্ষেত্রে দ্রুততার সঙ্গে এই আইন কার্যকর করার পর এসিড সন্ত্রাস সত্যিই শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। ঠিক এই মাত্রার সততা, সদিচ্ছা ও সংকল্প দেখিয়ে ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ড যদি কয়েকটি ক্ষেত্রেও কার্যকর করা যায়, তাহলে একটি কথা থাকে। তবে ঘর পোড়া গরু আমরা, সিঁদুরে মেঘ দেখলে ভয় পাই! সংবিধান থেকে নানা আইনের ভানো কথাগুলো যে হিমাগারেই ধুঁকে মরে!

তর্ক-বিতর্ক, জল্পনা-কল্পনা যাই হোক, বেগমগঞ্জের নারকীয় ঘটনার পর যে অসংখ্য মেয়ে সারা দেশে দৃপ্ত সাহসে পথে নেমে এসেছেন, ঢাকার রাজপথে যখন রাতের অন্ধকার ভেঙ্গে অনেক অনেক আলোর অপরাজিতারা মিছিল করছেন, আজ তাদের নতমস্তক অভিবাদন জানিয়ে এই লেখা এখানেই শেষ করতে চাচ্ছি।

লেখক: কথাসাহিত্যিক

সূত্র : দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড

  • 23
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আরও খবর

  • ধর্ষণকে ‘সামাজিক ব্যাধি’ বলা মারাত্মক ভুল
  • ধর্ষণ পীড়ন
  • ধর্ষণ: পুরাণ থেকে বর্তমানে
  • উপমহাদেশে ধর্মনিরপেক্ষতার ব্যাখ্যা দিয়ে ধর্মীয় জাতীয়তাবাদীরা শক্তি সঞ্চার করছে
  • বঙ্গরত্ন শেখ হাসিনা ও বঙ্গবন্ধু পরিষদ ॥ প্রাসঙ্গিক ভাবনা
  • মানসিক স্বাস্থ্য বলে আদৌ কিছু আছে, না সব পাগলামি?
  • ধর্ষণের প্রতিকার মৃত্যুদণ্ডে মিলবে কি?
  • সজীব ওয়াজেদ জয় ও ডিজিটাল বাংলাদেশ
  • পত্রিকা পড়ার গল্প
  • এইচএসসি পরীক্ষা: আর কোনো বিকল্প ছিল না?
  • বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনায় ’৭৩-এর অধ্যাদেশ পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নে কি আমরা অক্ষম?
  • আমার সখের পেশা
  • অপরাধ এবং অপরাধের মাত্রা
  • কন্যা সন্তানকে অবহেলা কেন?
  • ছাত্রলীগের কপালে কেন কলঙ্কের তিলক?
  • উপরে