ধর্ষণের প্রতিকার মৃত্যুদণ্ডে মিলবে কি?

প্রকাশিত: অক্টোবর ১০, ২০২০; সময়: ৮:৩২ pm |
খবর > মতামত

ফরিদা আখতার : নোয়াখালির বেগমগঞ্জে ধর্ষণের ঘটনা সম্প্রতি সংগঠিত অন্য সকল অপরাধের ঘটনাকে ছাপিয়ে গেছে। বিশেষভাবে ঘটেছে ফেসবুকে একটি ভিডিও ভাইরাল হবার পর। প্রায় ৩২ দিন পুরানো ঘটনা নতুন করে সামনে এসে দেশের মানুষকে হতবাক করে দিয়েছে।

এর আগে সিলেট, সাভারের ঘটনায় মানুষ ক্ষুব্ধ থাকলেও এই ভিডিওতে আক্রান্ত নারীর আর্তনাদ ‘বাবাগো আমারে ছাইড়া দে’ সবার বুকে এসে বিধেঁছে। খবরের শিরোনামে ‘বিবস্ত্র’ কথাটি চোখে পীড়াদায়ক।

পুরো ৩২ দিন এই ঘটনা সম্পর্কে থানার পুলিশও নাকি কিছু জানতে পারেনি, সারাদেশে প্রতিবাদের পর এখন প্রশাসনের উচ্চ পর্যায়ের সবাই ছুটে যাচ্ছেন। ডিআইজি, ইউএনওসহ সকলে রাস্তা খারাপ হলেও কষ্ট করে হেঁটে গেছেন। কিন্তু এখন এসব করে তো লাভ নেই। নারীর ওপর ধর্ষকরা এই নৃশংস ঘটনা ঘটাতে পেরেছে স্থানীয় প্রশাসন থেকে শুরু করে রাজনৈতিক নেতাদের গাফিলতি এবং ক্ষমতার প্রশ্রয় পেয়েই।

তাদের দুঃসাহসের মাত্রা দেখে বিস্মিত হতে হয়। তারা ভিডিও করেছে ফেসবুকে দিয়ে আরও ফায়দা লুটে নেবার জন্যে। কিন্তু সমাজে প্রতিক্রিয়া এভাবে বিস্ফোরিত হবে, সম্ভবত তারা সেটা বোঝেনি। তাদের ফায়দা তোলা হয়নি। কিন্তু তারা ক্ষমতার কুৎসিত চেহারাটা সবাইকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল।

ভাবুন, এই নারী বেঁচে আছেন। কিন্তু তার জীবন কি আর আগের মতো আছে? তার চেহারা দেখারও উপায় নেই, শুধু দুটি অপমানিত, আহত ও ক্ষুব্ধ বিচার প্রার্থী চোখ ছাড়া। তিনি কথা বলছেন। সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘অন্য কোনো মেয়ে হলে বিষ খেত বা গলায় দড়ি দিত। আমি শুধু ভাবছি, এ আর কী কষ্ট! আখেরাতে আরও বেশি কষ্ট, তাই আত্মহত্যা করিনি। ভাবছি, একদিন এর বিচার হবে। দেশবাসী প্রতিবাদ করেছে। আল্লাহর কাছে শোকর।’

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত (৯ মাসে) ৯৭৫ জন নারীকে ধর্ষণ, ৪৩ জন নারীকে ধর্ষণের পর হত্যা এবং ১৯৯২ জন নারীকে ধর্ষণ করার চেষ্টা হয়েছে। হ্যাঁ, এরা সবাই বিচার চায়। এরা ছাড়াও আরও আছে, তাদের কথা প্রচার মাধ্যমে আসছে না, তারাও মুখ লুকিয়ে থাকতে বাধ্য। সমাজের শাসনের মধ্যে ‘বেঁচে’ থাকার অধিক তারা কী আর করতে পারে? এই বেঁচে থাকা নিশ্চয়ই বাঁচা নয়। যারা প্রকাশ্যে আসতে চায় তারা বিচার চাইতে গিয়ে নিজেকে আরও ‘ধর্ষণের মুখোমুখি’ করতে চাইছে না।

ধর্ষণ যারা করছে, তারা যে কোনোভাবে ক্ষমতাপ্রাপ্ত। গৃহকর্মীকে মালিক বা তার ছেলেরা ধর্ষণ করে চুপ করিয়ে রাখতে পারে, কর্মক্ষেত্রে নারীকে ধর্ষণ করে চুপ রাখা যায়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক দ্বারা ধর্ষণ, বাড়িতে আত্মীয় স্বজনের মধ্যে যারা ধর্ষণ করে তারাও সম্পর্কের দিক থেকে ক্ষমতাবান। তবে সবচেয়ে মারাত্মক হচ্ছে রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতায় পুলিশ, রাজনৈতিক দলের ক্ষমতায় থাকায় ক্ষমতাবানরা, যাদের ব্যাপারে পুলিশ জানলেও কিছু করবে না, মামলা নেবে না। এটাই তাদের ক্ষমতা।

ধর্ষকের ক্ষমতা এত বেশি, সে জানে যে এটা অপরাধ, কিন্তু তারপরও ধর্ষণের পর ধর্ষিতাকে হুমকি দিয়ে বাড়াবাড়ি করতে পারে। এটাও তার ক্ষমতা প্রদর্শনের সাথে জড়িত। ধর্ষক ধর্ষণ করে প্রমাণ করতে পারে যে, এত জঘন্য অপরাধ করলেও তাকে কেউ কিছু করতে পারবে না। এখানেই রাষ্ট্রের ভূমিকা বোঝা যায়। এই নব্য ধর্ষক সরাসরি রাষ্ট্রের ক্ষমতার সাথে যুক্ত। তারা জানে তারা বেঁচে যেতে পারে।

রাষ্ট্রও ধর্ষকের কথাই সত্য প্রমাণ করছে। ধর্ষণের বিরুদ্ধে যেসব প্রতিবাদ হচ্ছে, সেখানে ক্ষোভের প্রকাশ শ্লোগানেই হচ্ছে, কোনো ভাংচুর বা মারামারি হচ্ছে না। লাঠি মিছিল হলেও কেউ লাঠি দিয়ে মারছে না। তবু দেখুন, পুলিশ কীভাবে তাদের মিছিল সমাবেশে লাঠিপেটা করছে, আহত করেছে অনেককেই। এরা তো ধর্ষকের শাস্তি চেয়েছে, এই ধর্ষকদের ক্ষমতার ব্যবহারে সরকারের ব্যর্থতার সমালোচনা করছে, আর তো কিছু নয়। তাহলে কেন মিছিল সমাবেশে পুলিশের আক্রমণ হচ্ছে? এভাবে রাষ্ট্র নিজেই নিজেকে ধর্ষণে জড়িয়ে ফেলছে।

এবার আসি ধর্ষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের দাবির প্রশ্নে। ‘লড়াই লড়াই চাই, লড়াই করে বাঁচতে চাই’, ‘ফাঁসি, ফাঁসি, ফাঁসি চাই’, ‘ধর্ষক জাতির শত্রু, সমাজের শত্রু’, ‘No mercy to Rapists’, ‘Rape is not apolitical, Raise your voice against rape’, ‘we want justice’, ‘আমার নিরাপত্তা কোথায়?’, ‘নারী কোনো ভোগ্য পণ্য নয়’, ‘এই নরপশুদের শাস্তি চাই’, ‘ধর্ষকের শাস্তির জন্য আলাদা ট্রাইবুনাল গঠন করো’ ইত্যাদি।

একটু খেয়াল করলে দেখা যায় যে, এর মধ্যে ফাঁসির দাবি আছে ক্ষোভের চূড়ান্ত প্রকাশ হিসেবে; কিন্তু মূল দাবিগুলো হচ্ছে নারীর নিজের মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিয়ে, ধর্ষকের পরিচয়ের সাথে রাজনৈতিক সম্পৃক্তি, সুষ্ঠু বিচার ব্যবস্থা করা এবং সর্বোপরি আন্দোলনের ডাক আছে। চুপ করে থাকা যাবে না। আওয়াজ তুলতে হবে। অথচ প্রচারমাধ্যমে শুধু ‘ফাঁসি চাই’ কথাটির ওপরই জোর দেওয়ার কারণে, অন্য দাবিগুলো আড়াল হয়ে যাচ্ছে।

এই পরিস্থিতিতে আমরা রাষ্ট্রের কাছে যে ন্যূনতম দায়িত্ব দেখতে চাই, সেটা প্রথমেই হচ্ছে জনগণকে আশ্বস্ত করা যে, এই দেশে নারীরা ঘরে-বাইরে নিরাপদে থাকতে পারবে। পুরুষরাও এমন অন্যায্য ক্ষমতার মধ্যে থাকবে না, যা তাকে বেপরোয়া করে তোলে। রাষ্ট্র সেখানে তার দায়িত্ব পালন করবে। কিন্তু সে রকম কোনো পদক্ষেপ এখনো চোখে পড়েনি। বরং দেখা যাচ্ছে, সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে আইন সংশোধন করে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রাখার।

আইনমন্ত্রী আনিসুল হক সংবাদমাধ্যমে জানিয়েছেন, ধর্ষণের শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড থেকে মৃত্যুদণ্ডে উন্নীত করার বিষয়টি সরকার বিবেচনা করছে। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ধারা ৯ (১) সংশোধনের খসড়া প্রস্তুত করার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ১২ অক্টোবর এটি মন্ত্রিসভার বৈঠকে পেশ করা হবে। অর্থাৎ খুব দ্রুত বিষয়টি নিস্পত্তি করা হবে, হয়তো দু’একটি ফাঁসির ঘোষণাও চলে আসতে পারে।

প্রশ্ন হচ্ছে, তাতে কি জনগণের ক্ষোভের প্রশমন হবে? আন্দোলন কি থেমে যাবে? ফাঁসির ঘোষণা দ্রুত পেলেও কার্যকর করার প্রক্রিয়া পালন করতেই হবে এবং সেটাও দু’একটির ক্ষেত্রে দ্রুত করাও যেতে পারে; কিন্তু নিয়ম মেনে করতে গেলে সময় লাগবে। অথচ অন্য শাস্তি দিলে সেটা কার্যকর করা যেতে পারে অনেক দ্রুত। এবং অনেকের ক্ষেত্রে কার্যকর করা সম্ভব।

ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড যে ধর্ষণ বন্ধের জন্যে আদৌ কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নয়, তা বুঝতে হলে ভারতের অভিজ্ঞতা দেখা যেতে পারে। ভারতে সবচেয়ে আলোচিত ধর্ষণ অপরাধের ঘটনা ঘটেছিল ২০১২ সালে। মেডিকেলের ছাত্রী ‘নির্ভয়া’ বাসে নৃশংস গণধর্ষণের শিকার হবার পর দিল্লী শহরসহ সারা ভারতে আকাশ-বাতাস ভেদ করে দাবি উঠেছিল মৃত্যুদণ্ডের। মেয়েটি বেশ কিছুদিন মৃত্যুর সাথে লড়াই করে শেষ পর্যন্ত মারা যায়। ঘটনাটির গুরুত্বের বিচারে ২০১৩ সালেই বিচারে মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করা হয়। কিন্তু মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয় ২০১৫ সালে।

নির্ভয়ার মা-বাবা এই রায়ে সন্তুষ্ট হয়েছিলেন এবং রায় কার্যকর যেন হয়, তার জন্যে উদ্গ্রীব ছিলেন। কিন্তু কেউ বলতে পারবে না ভারতে এরপর ধর্ষণের ঘটনা একটু হলেও কমেছে। ভারতে গড়ে প্রতিদিন ৮৮টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটে এবং বিচার হয় মাত্র ৩০% ঘটনার।

সম্প্রতি, সেপ্টেম্বর মাসে ভারতের উত্তর প্রদেশে এক দলিত তরুণীকে (১৯) চারজন উচ্চ বর্ণের হিন্দু পুরুষ ধর্ষণ করে। মেয়েটিকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ১৪ দিন পর মেয়েটি মারা যায়। নির্ভয়ার ঘটনার পর ভারতজুড়ে আবার নতুন করে প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে।

আইনে মৃত্যুদণ্ড থাকলে ধর্ষণ প্রতিরোধ হবে- এমন কোনো নজির বাংলাদেশ, ভারতসহ কোথাও পাওয়া যায়নি। ১৯৯৫ সালে ইয়াসমিন ধর্ষণ ও হত্যার প্রতিবাদে সারা দেশে যে আন্দোলন গড়ে উঠেছিল, তার পরিণতিতে তিন পুলিশের ফাঁসি হয়েছিল। কিন্তু ধর্ষণ থামেনি। তবে দেশব্যাপী যে আন্দোলন হয়েছিল, তার কারণে ধর্ষণের বিরুদ্ধে সর্বস্তরের জনগণ সচেতন হয়েছিল। একটি মাইলফলক হয়েছিল।

এখনো বাংলাদেশে ধর্ষণ মামলার বিচারে রায় পাওয়া যায় মাত্র ৩% ঘটনায়। ভারতে আইন নিয়ে কাজ করেন এমন নারীবাদীদের মধ্যে এই আলোচনা হচ্ছে যে, মৃত্যুদণ্ড আদৌ ধর্ষণ ঠেকাতে পারে কি না। ধর্ষণের সংখ্যা বৃদ্ধি দেখে বোঝা যায়, সেটা হয়নি। তারা মনে করে, মৃত্যুদণ্ড থাকলে ধর্ষণের পর নারীকে হত্যা করার প্রবণতা বেড়ে যেতে পারে; কারণ ধর্ষক প্রমাণ রাখতে চায় না। থানায় মামলা দিলে ধর্ষক ক্ষমতাবান হলে মামলাও নেওয়া হবে না। অন্যদিকে, বিচারকরাও সবাই রায় দেবার সময় এত কঠিন শাস্তি দিতে গিয়ে একমত হতে পারেন না। নিম্ন আদালতের রায় উচ্চ আদালতে গিয়ে টেকে না।

তাছাড়া এসব কিছুই নির্ভর করছে ধর্ষণের শিকার নারীর পক্ষে শক্তিশালী আইনজীবী আছেন কি না। অনেক ক্ষেত্রে নারী ও মানবাধিকার সংগঠন তার পক্ষে আইনি লড়াই করলেও এই সুযোগ সব বিচার প্রার্থী নারীরা পান না। ধর্ষকরা সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতাবান হলে তো কথাই নাই। তার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ড পাওয়া যায় না।

ধর্ষণকারীরা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পরিচিত মুখ। নারীরা এমনিতেই তাদের ভয় পায়, কিংবা ভয় দেখানো হয়। কাজেই তারা এমন ঘটনা ঘটার পর ভয়ে মুখ খোলে না। মৃত্যুদণ্ডের বিধান ধর্ষণের শিকার নারীর ওপর ধর্ষণ প্রমাণের বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে। সেটা ধর্ষণের পর বারে বারে আইনি ধর্ষণ হয়ে যায়। প্রমাণ দাখিল করার জন্যে মেডিকেল রিপোর্ট– সেটাও ধর্ষণের পর্যায়ে পড়ে যায়, আদালতে উকিলের জেরা– এসবই নারীর ওপর মানসিক ও সামাজিক চাপ সৃষ্টি করে, যা অধিকাংশ নারী সহ্য করতে পারেন না।

কাজেই ধর্ষণ বন্ধের জন্য নারী-পুরুষের মধ্যে ক্ষমতার যে ভেদ আছে, তা দূর করতে হবে। আর সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে যেসব পুরুষ রাজনৈতিক ক্ষমতা ব্যবহার করে নারী ধর্ষণ করে, তাদের সেই ক্ষমতার কাঠামো ভেঙ্গে দেওয়াই এক নম্বরের কাজ। নারী আন্দোলনের তরফে এই কথাটা জোরের সাথে বলা দরকার। এটা স্পষ্ট, এই ধর্ষণের চরিত্র একদমই আলাদা। এর গোড়া রাষ্ট্র ক্ষমতায়, ক্ষমতার চরিত্রে।

অতএব, আন্দোলনকে সেই গোড়ার জায়গায় মনোযোগ নিবদ্ধ করতে হবে।

লেখক: নির্বাহী পরিচালক, উবিনিগ; আহ্বায়ক, তামাক বিরোধী নারী জোট

সূত্র : দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড

  • 16
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আরও খবর

উপরে